উন্নয়নের জন্য তথ্য

নিউইয়র্ক- তথ্য বিপ্লব সমাজের প্রতিটি অঙ্গকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে । সারাবিশ্বে বায়োমেট্রিক্স এর মাধ্যমে নির্বাচন সংগঠিত করা হচ্ছে, স্যাটেলাইট ইমেজারির মাধ্যমে বন-জঙ্গলগুলো দেখভাল করা হচ্ছে, ব্যাংকিং ব্রাঞ্চ অফিস থেকে ঢুকে গেছে স্মার্টফোন-এ এবং মেডিকেল এক্সরে পরীক্ষা করা যাচ্ছে দূর থেকে। ইউএন সাসটেইনেবল ডেভলপমেন্ট সল্যুশনস নেটওয়ার্ক (এসডিএসএন) কর্তৃক প্রকাশিত ‘ডেটা ফর ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক একটি রিপোর্টে দেখানো হয়েছে যে, কিছুটা দূরদর্শিতা এবং বিনিয়োগ নিশ্চিত করা হলে তথ্য বিপ্লব বিশ্বের টেকসই উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে পারবে। একই সাথে ভূমিকা রাখবে দারিদ্র্য বিমোচনে অগ্রগতি আনতে সামাজিক অন্তর্ভূক্তি এবং পরিবেশকে রক্ষা করতে।

সারা বিশ্বের সরকারগুলো আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের একটি বিশেষ সম্মেলনে ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য’ বা সাসটেইনেবল ডেভলপমেন্ট গোল(এসডিজি) গ্রহণ করবে। এই সম্মেলন বিশ্ব নেতৃবৃন্দের অংশগ্রহণে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সম্মেলনগুলোর একটি। কারণ এখানে ১৭০টি দেশের সরকারপ্রধান এবং নেতৃবৃন্দ সবার জন্য প্রযোজ্য এমন কিছু লক্ষ্য নির্ধারণ করবেন যা আগামী ২০৩০ পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী উন্নয়নকে দিক-নির্দেশনা দেবে। আমরা জানি, লক্ষ্য অর্জন করার চেয়ে লক্ষ্য নির্ধারণ করা সহজ।২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি বাস্তবায়নে আমাদের কিছু নতুন হাতিয়ার যেমন নতুন তথ্য ব্যবস্থা প্রয়োজন হবে। নতুন এই তথ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান এবং সিভিল সোসাইটিগুলোকে ৪ টি স্বতন্ত্র উদ্দেশ্যকে মাথায় রাখতে হবে।

প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণটি হলো সেবা প্রদানের জন্য তথ্য। তথ্য বিপ্লব সরকার এবং ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সেবা প্রদানে, দুর্নীতি দমনে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে, দুর্গম এলাকাগুলোতে গমনের নতুন এবং উন্নততর উপায় বাৎলে দিয়েছে। তথ্য প্রযুক্তি ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য সেবা, শিক্ষা, সুশাসন, অবকাঠামো (যেমন – প্রিপেইড বিদ্যুৎ), ব্যাংকিং সেবা, জরুরি সেবা ইত্যাদি প্রদানে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে।

দ্বিতীয় লক্ষ্য হলো পাবলিক ম্যানেজমেন্টের জন্য তথ্য। সরকারি কর্মকর্তারা এখন রিয়েল-টাইম ড্যাশবোর্ড ব্যবহার করছেন যা তাদেরকে সরকারি বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা, পরিবহন নেটওয়ার্ক, জরুরি ত্রাণ কার্যক্রম, জনস্বাস্থ্য জরিপ এবং অপরাধমূলক কার্যক্রমগুলো সম্পর্কে অবহিত রাখছে। নাগরিকদের কাছ থেকে মতামত নেয়ার মাধ্যমে এই ম্যানেজমেন্ট প্রক্রিয়াকে শানিত করা যায়। যেমন গাড়িচালকদের কাছ থেকে ক্রাউডসোর্সের মাধ্যমে ট্রাফিক-সম্পর্কিত তথ্য নেয়া যায়। জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম (জিআইএস)এর মাধ্যমে রিয়েলটাইমে দূরবর্তী অঞ্চলের স্থানীয় সরকার এবং জেলা প্রশাসনের কার্যক্রম দেখভাল করা যায়।

তৃতীয় উদ্দেশ্য হলো সরকার এবং ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে তথ্য। সরকারি আমলাতন্ত্র সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে অনেকসময় নামমাত্র সেবা দেয়, ফাঁকি দেয়, অর্জনগুলোকে বড় করে দেখায়, সবচেয়ে খারাপ যে বিষয়টি তা হলো তারা যদি সুযোগ পান তবে চুরিও করেন। ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলোও অনেক সময় এমন করে। তথ্য বিপ্লব সরকার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে সেবাপ্রত্যাশীদের এবং সাধারণ নাগরিকদের যাচাইযোগ্য তথ্য পাওয়া নিশ্চিত করতে পারে।   যখন সেবা সময়মত পাওয়া যাবে না (সেবা তৈরি প্রক্রিয়ায় দূর্বলতা বা সাপ্লাই চেইনে দুর্নীতির কারণে হতে পারে), তথ্য ব্যবস্থা তখন জনসাধারণকে সমস্যা নির্দিষ্ট করতে এবং সরকার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহি করাতে সহায়তা করবে ।

চতুর্থ ও শেষ উদ্দেশ্যটি হলো, বৈশ্বিক উন্নয়ন লক্ষ্যগুলো সঠিকভাবে অর্জিত হচ্ছে কিনা তা জনগনকে জানাবে এই তথ্য ব্যবস্থা। ২০০০ সালে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (মিলিনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল) ২০১৫ সালে অর্জন করতে হবে এমন কিছু সংখ্যাগত লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। আমরা আজ এমডিজির শেষবর্ষে উপনীত হয়েছি। কিন্তু উচ্চমানসম্পন্ন এবং সময়ানুগ তথ্যের অভাবে আমরা এখনো জানি না এমডিজির লক্ষ্যগুলো সঠিকভাবে অর্জিত হয়েছে কিনা। এমডিজির কিছু গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য অর্জন সম্পর্কে বেশ কয়েক বছর ধরে কোনো রিপোর্ট প্রকাশ করা হচ্ছে না। যেমন: বিশ্বব্যাংক ২০১০ এর পর এখনো দারিদ্র্য পরিস্থিতির উপর বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করে নি।

তথ্য বিপ্লব এই বিলম্বের অবসান করতে পারে এবং তথ্যের মানে নাটকীয়ভাবে উন্নতি সাধন করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, মৃত্যুহার হিসাব করতে কয়েকবছর পরপর খানাভিত্তিক জরিপের (হাউজহোল্ড সারভে) উপর নির্ভর না করে সিভিল রেজিস্ট্রেশন এবং ভাইটাল স্ট্যাটিসটিক্স ( জন্ম, মৃত্যু, স্বাস্থ্য, রোগ এবং বিয়ে সম্পর্কিত পরিসংখ্যান) এর মাধ্যমে রিয়েলটাইমে মৃত্যুহার বিষয়ক তথ্য পাওয়া সম্ভব। এর সাথে মৃত্যুর কারণও জানা যাবে।

অনুরূপভাবে, জরিপের ক্ষেত্রে কাগজ এর পরিবর্তে স্মার্টফোন ব্যবহার করে আজকের চেয়ে অনেক কম খরচে ঘন ঘন দারিদ্র্য সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ করা যাবে। বিশ্লেষকগন জানিয়েছেন, পূর্ব আফ্রিকার কিছু দেশে দশ বছরের মধ্যে মোবাইল ফোন ব্যবহারের মাধ্যমে জরিপের খরচ ৬০ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব। তথ্য সংগ্রহের গতিকে ত্বরান্বিত করতে গ্যালপ ইন্টারন্যাশনাল এর মত বেসরকারি কোম্পানিগুলো প্রথাগত সরকারি পরিসংখ্যান সংস্থার সাথে কাজ করতে পারে।

তথ্য বিপ্লব সেবা প্রদান, সেবা ব্যবস্থাপনা, সেবা প্রদানকারীদের জবাবদিহিতা এবং বৈধতা নিশ্চিত করতে অভূতপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি করেছে।প্রযুক্তির এই নিবিড় ইকোসিস্টেমকে ধন্যবাদ। কারণ এই ইকোসিস্টেম রিমোট সেন্সিং এবং স্যাটালাইট ইমেজারি, বায়োমেট্রিক ডেটা, জিআইএস ট্র্যাকিং, ফ্যাসিলিটি-ভিত্তিক ডেটা, হাউজহোল্ড সারভে, সোস্যাল মিডিয়া, ক্রাউড সোর্সিং এবং অন্যান্য চ্যানেলের মত বহুমাত্রিক উপায়ে তথ্য সংগ্রহ করতে পারে।

এসডিজি বাস্তবায়নে সহায়তা করতে এই তথ্যগুলো সবদেশের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া উচিত।মূল লক্ষ্য সংক্রান্ত তথ্যগুলো অন্তত একবছর পরপর প্রকাশ উচিত। এবং যে খাতগুলো অতীব গুরুত্বপূর্ণ,(স্বাস্থ্য, শিক্ষা) সেগুলোর জন্য থাকবে রিয়েল টাইম তথ্য। এই ডেটা ইকোসিস্টেমে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যেমন মোবাইল কোম্পানি, সোস্যাল মার্কেটিং কোম্পানি, সিস্টেম ডিজাইনার, জরিপকারী প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সকলকে একীভূত করা উচিত।

নতুন রিপোর্টটি প্রস্তুতকালে, এসডিএসএন এসডিজি’র জন্য কিভাবে তথ্য বিপ্লব প্রক্রিয়া শুরু করা যায় তার ‘প্রয়োজনীয়তা যাচাই’ করতে কয়েকটি পার্টনার প্রতিষ্ঠানের সাথে কাজ করেছে । রিপোর্টটি যে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে সেখানে জাতীয় পরিসংখ্যান প্রতিষ্ঠানের সাথে ব্যক্তিখাত এবং বেসরকারি খাতের তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের পার্টনারশিপ করার কথা বলা হয়েছে। রিপোর্টটি গুরুত্বের সাথে জানিয়েছে যে, নতুন তথ্য ব্যবস্থা সৃষ্টি করতে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোর আর্থিক সাহায্য প্রয়োজন হবে।

নতুন গবেষেণাটির প্রাথমিক হিসাবে দেখা গেছে প্রযুক্তি উদ্ভাবনের এই যুগে ৭৭ টি নিম্ন আয়ের দেশের সবগুলোতে এসডিজি বাস্তবায়নের জন্য যথাযথ তথ্য ব্যবস্থা নির্মাণ করতে বছরে ন্যূণতম ১০০ কোটি ডলার প্রয়োজন হবে। এই অর্থের অর্ধেক অফিসিয়াল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসিসটেন্স হিসেবে যাওয়া উচিত। এর মানে বর্তমানে যে পরিমাণ অর্থ সাহায্য দেয়া হচ্ছে প্রতিবছর তার চেয়ে ২ কোটি ডলার করে বর্ধিত সাহায্য দিতে হবে।

এখন সময় এসেছে এই অতিরিক্ত অর্থ সাহায্য প্রদানের অঙ্গীকার করার।জুলাইয়ে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাইনান্স ফর ডেভলপমেন্ট কনফারেন্স-এ যোগ দিতে আদ্দিস আবাবায় একত্রিত হবেন। এর কয়েক সপ্তাহ পর সেপটেম্বর এর শেষ দিকে এসডিজি গ্রহণ করতে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে একত্রিত হবেন। এই দুই সম্মেলনের পূর্বে বিশ্ব এসডিজি বাস্তবায়নের জন্য তথ্য ব্যবস্থা চালু করার প্রস্তুতি নেবেন।

অননূদিত প্রবন্ধটি পড়তে ক্লিক করুন : www.project-syndicate.org/commentary/sustainable-development-data-by-jeffrey-d-sachs-2015-05

Published by Jeffrey Sachs

Professor Sachs serves as the Director of The Earth Institute, Quetelet Professor of Sustainable Development, and Professor of Health Policy and Management at Columbia University. He is Director of the UN Sustainable Development Solutions Network. He is co-founder and Chief Strategist of Millennium Promise Alliance, and is director of the Millennium Villages Project. Sachs is also one of the Secretary-General’s MDG Advocates, and a Commissioner of the ITU/UNESCO Broadband Commission for Development. The Economist Magazine ranks Professor Sachs as among the world’s three most influential living economists of the past decade. He is co-recipient of the 2015 Blue Planet Prize, the leading global prize for the environment.