সামাজিক অগ্রগতি যে কারণে জরুরি

ক্যামব্রিজ- গত পঞ্চাশ বছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে কোটি কোটি মানুষের দারিদ্র্য দূরীভূত হয়েছে এবং জীবনমান উন্নত হয়েছে। তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ভিত্তিক মানব উন্নয়নের মডেলটি যে অসম্পূর্ণ তা দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে। যে সমাজ মানুষের মৌলিক প্রয়োজনগুলো মেটাতে , নাগরিকদের জীবনমান উন্নয়নে, পরিবেশ রক্ষায় এবং নাগরিকদের উন্নয়নের সুযোগ প্রদান করতে ব্যর্থ – সেই সমাজকে সফল সমাজ বলা যায় না। অন্তর্ভূক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি করতে অর্থনৈতিক এবং সামাজিক দুই ধরণের অগ্রগতিই সাধন করতে হয়।

শুধু জিডিপির উপর গুরুত্ব দেয়া যে ভূল তা স্পষ্ট হয়েছে এ বছর ৯ এপ্রিলে চালু হওয়া ‘২০১৫ সোস্যাল প্রগ্রেস ইন্ডেক্স(এসপিআই)’-এ। এমআইটির স্কট স্টার্ন এবং অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ‘সোস্যাল প্রগ্রেস ইনডেক্স’ এর যৌথ উদ্যোগে তৈরি করা হয়েছে এই এসপিআই। এসপিআই বিভিন্ন সামাজিক এবং পরিবেশগত বিষয়ে ১৩৩ টি দেশের অর্জনগুলোকে পরিমাপ করে। এটি সামাজিক অগ্রগতি পরিমাপ করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট ফ্রেমওয়ার্ক বা কাঠামো । এটিই প্রথম ফ্রেমওয়ার্ক যা জিডিপি ছাড়াই সামাজিক অগ্রগতি পরিমাপ করতে সক্ষম।

 

এসপিআই-এ একটি দেশের সামাজিক অর্জনগুলো ৫২ টি সূচকের বিপরীতে বিচার করা হয়। এসপিআই সরকার এবং ব্যবসায়ী নেতাদের জন্য একটি সহজ এবং বাস্তবসম্মত পদ্ধতি সামনে এনেছে। এর মাধ্যমে তারা তাদের দেশের অর্জনগুলোকে পরিমাপ করতে পারবেন এবং যে জায়গাগুলোতে সামাজিক উন্নয়ন বেশি জরুরি সেগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সাজাতে পারবেন। এসপিআই এভাবে অন্তর্ভূক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনের কৌশল প্রণয়নে পদ্ধতিগত এবং গবেষণামূলক দিক-নির্দেশনা দিয়ে থাকে।

আমাদের গবেষণা দেখাচ্ছে সামাজিক অগ্রগতির অনেক দিকই আয় বৃদ্ধি পাবার সাথে সাথে বেড়ে যায়। সমৃদ্ধ দেশগুলো যেমন নরওয়ে (এবছর এসপিআই-এ সর্বোচ্চ স্থান অধিকারী), নিম্নতর আয়ের দেশগুলোর চেয়ে সামাজিক অগ্রগতি অর্জনে এগিয়ে আছে।

কিন্তু আমাদের গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে যে জিডিপিই সামাজিক অগ্রগতির একমাত্র নির্ধারক নয়। উদাহরণস্বরূপ,কোস্টারিকার মাথাপিছু জিডিপি ইতালির তিনভাগের একভাগ। কিন্তু দেশটি ইতালির চেয়ে অধিক হারে সামাজিক অগ্রগতি অর্জনে সক্ষম হয়েছে।

এবং কোস্টারিকা কোনো বিচ্ছিন্ন উদাহরণ নয়। ধনী থেকে দরিদ্র সবধরণের দেশেই আমরা এই উদাহরণগুলো দেখেছি । যেমন নিউজিল্যান্ড এবং সেনেগাল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সামাজিক অগ্রগতিতে রুপান্তর করতে যুক্তরাষ্ট্র ও নাইজেরিয়ার চেয়ে বেশি সফল হয়েছে। চীন এবং ভারতের মতো উচ্চপ্রবৃদ্ধিসম্পন্ন দেশগুলোর ক্ষেত্রেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যতটা সামাজিক অগ্রগতিতে অবদান রাখার কথা ততটা রাখছে না।

যেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সামাজিক অগ্রগতির মধ্যে অসামঞ্জস্য থাকে সেখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় যেমন হয়েছে রাশিয়ায় এবং মিশরে। সামাজিক অগ্রগতিতে পিছিয়ে থাকা এইসব দেশে অর্থনৈতিক উন্নয়নও বিঘ্নিত হয়। আসলে যেসব দেশ এর নাগরিকদের মানবিক প্রয়োজনগুলো মেটাতে, সমাজে পারস্পরিক আস্থা এবং এর নাগরিকদের জন্য সমৃদ্ধির যথেষ্ট সুযোগ সৃষ্টিতে ব্যর্থ হয় সেসব দেশে অর্থনৈতিক উন্নয়নও বিঘ্নিত হয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যথাযথ ভিত্তি তৈরিতে দেশগুলোর শুধু অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নয়, সামাজিক অগ্রগতিতেও বিনিয়োগ করতে হবে।

আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতায় দেখেছি রুয়ান্ডা অর্থনৈতিক উন্নয়নের কৌশলের সাথে সামাজিক অগ্রগতি খাত যেমন লৈঙ্গিক সমতা, শিশুমৃত্যু, প্রাথমিক খাতেও বিনিয়োগ করেছে। এর ফলে এক দশকের মধ্যে শিশু মৃত্যুর হার কমেছে ৬১ শতাংশ, প্রাথমিক শিক্ষার হার বেড়ে হয়েছে ৯৫% । সামাজিক উন্নয়নের এই দিকগুলোতে অগ্রগতি না হলে রুয়ান্ডার যে ইতিবাচক অর্থনৈতিক অর্জন তা সম্ভব হতো না।

সামাজিক অগ্রগতির দিকে এভাবে জোর দিলে দেশের উন্নয়ন কৌশল আরও বিকশিত হয় এবং উন্নয়নের স্বার্থে অনেক বিতর্কিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে রাজনৈতিক সমর্থনও পাওয়া যায়। তাই চিরাচরিত অর্থনৈতিক সূচকগুলোর পাশাপাশি সামাজিক উন্নয়নের সূচকও পরিমাপ করা জরুরি। যাতে একটি ইতিবাচক চক্র সৃষ্টি হবে এবং এর ফলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি সামাজিক এবং পরিবেশগত উন্নয়ন সাধন করবে। আবার সেই সামাজিক ও পরিবেশগত উন্নয়ন অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে। জিডিপি এবং আয়বৈষম্যর মতো সংকীর্ণ বিতর্ক এড়িয়ে এসপিআই এই চক্রটি সৃষ্টি করতে ভূমিকা রাখে।

২০১৩ সালে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হওয়ার পর থেকে এসপিআই এর উপর মানুষের আগ্রহ জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। এর মাধ্যমে পাওয়া নতুন তথ্যগুলো পৃথিবী ব্যাপী লক্ষ লক্ষ নাগরিক একে অপরের কাছে শেয়ার করছে। এটি নাগরিকদের কাছে তাদের নেতাদেরকে জবাবদিহি করানোর ক্ষেত্রে একটি হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

অধিকন্তু, ৪০ টিরও বেশি দেশে সামাজিক অগ্রগতি খাতে উন্নতি সাধনে কৌশলগত উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যেমন প্যারাগুয়ে তার ‘অন্তর্ভূক্তিমূলক জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা ২০৩০’ প্রণয়নে এসপিআই ব্যবহার করেছে। এসপিআই শুধু জাতীয়ভা্বে নয় আঞ্চলিক পর্যায়ে যেমন পৌরসভা কর্তৃপক্ষও এসপিআই ব্যবহার করছে। উন্নয়নে সফলতার একটি পরিমাপক হিসেবে ব্রাজিলের রাজ্য প্যারা, ল্যাটিন আমেরিকার বোগোতা এবং রিওডি জেনিরোতে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস রাজ্যের সামারভিল এসপিআই ব্যবহার করছে।

এবছর ইউরোপীয়ান কমিশন সারা ইউরোপে অঞ্চলভিত্তিক এসপিআই ব্যবহার করবে। কোকাকোলা এবং ন্যাচারা-র মতো কোম্পানিগুলো তাদের সামাজিক খাতে বিনিয়োগের কৌশল নির্ধারণের জন্য এসপিআই ব্যবহার করছে এবং এ লক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে পার্টনারশিপ করছে।

অর্ধ শতকেরও বেশি সময় ধরে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে জিডিপিই ছিল সবচেয়ে উৎকৃষ্ট পরিমাপক। এসপিআই জাতীয় অর্জনের একটি মূল পরিমাপক হিসেবে জিডিপির পরিপূরক (স্থলাভিসিক্ত নয়)হতে চায়। দেশ কিভাবে উন্নয়ন করছে তার পূর্ণচিত্র পেতে নাগরিকদের সাহায্য করবে এসপিআই। সমাজকে সাহায্য করবে আরও উৎকৃষ্ট বিকল্প বাছাই করতে, শক্তিশালী কমিউনিটি তৈরি করতে এবং নাগরিকদেরকে সহায়তা করবে একটি সম্পন্ন জীবনযাপন করতে।

অননূদিত প্রবন্ধটি পড়তে ক্লিক করুন : http://www.project-syndicate.org/commentary/economic-development-social-progress-index-by-michael-porter-2015-04

Published by Michael Porter

Michael Porter is an economist, researcher, author, advisor, speaker and teacher. His extensive research is widely recognized in governments, corporations, NGOs, and academic circles around the globe. His research has received numerous awards, and he is the most cited scholar today in economics and business. While Dr. Porter is, at the core, a scholar, his work has also achieved remarkable acceptance by practitioners across multiple fields. Michael Porter is the founder of the modern strategy field and one of the world’s most influential thinkers on management and competitiveness. The author of 19 books and over 125 articles, he is the Bishop William Lawrence University Professor at Harvard Business School and the director of the school’s Institute for Strategy and Competitiveness, which was founded in 2001 to further his work and research.