রিয়াদ- আয় বৈষম্য বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি দাভোসে অনুষ্ঠিত এবারের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। এটা জানা কথা যে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি গত তিন দশকে যথেষ্ট উন্নতি করেছে। কিন্তু সেখানে মধ্যবিত্ত পরিবারের আয় তেমন বাড়েনি। অধিকাংশ সম্পদ ১ শতাংশ মানুষের (আসলে উচ্চবিত্ত ০.১ শতাংশ) হাতে। তবে সমাজের মানুষ এই অবস্থা আর বেশিদিন সহ্য করবে না।

অনেকে এটাকে একটা বৈশ্বিক অবস্থা ভেবে উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে, সর্বত্র এটি একই কারণে ঘটছে। এটিই থমাস পিকেটির জনপ্রিয় বই “ক্যাপিটাল ইন টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি”র প্রধান দাবি । কিন্তু এই প্রস্তাব মারাত্নক বিভ্রান্তিকর হতে পারে।

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে উৎপাদনশীলতায় অসমতা আর একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে আয় বন্টনে অসমতা, এদুটোর পার্থক্য নির্ণয় করা খুবই জরুরি। শ্রম আর পুঁজির গতানুগতিক লড়াইটি মূলত দ্বিতীয়টি কেন্দ্রিক অর্থাৎ শ্রমিক আর মালিকের প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ভাগাভাগির লড়াই । কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদনশীলতায় এখনো গভীর অসমতা রয়ে গেছে। তার মানে সম্পদের পরিমাণ বিবেচনায় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ব্যাপক তারতম্য রয়েছে । এটা বিশেষ করে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রে সত্য। সেখানকার প্রদেশ বা রাজ্যগুলোতে একটি উপকরণের উৎপাদনশীলতার মধ্যে পার্থক্য খুঁজে পাওয়া খুবই স্বাভাবিক, পৌর এলাকাগুলোতে এই পার্থক্য অনেক বেশি হয়।

অসমতার সম্পূর্ণ ভিন্ন এই দুটো উৎসকে প্রায়ই এক করে ফেলা হয়। ফলে একটিকে বোঝার ক্ষেত্রে আরেকটি প্রতিবন্ধক হয়ে উঠে । অবশ্য বিষয় দুটি আধুনিক উৎপাদনব্যবস্থার কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্যের সাথে সম্পর্কিত। তা হল উৎপাদনব্যবস্থায় অনেকগুলো সম্পূরক উপকরণ দরকার হয়। এর মধ্যে যে শুধু স্থানান্তরযোগ্য কাঁচামাল আর মেশিন থাকে তা নয়। কিছু বিশেষায়িত দক্ষতা, অবকাঠামো এবং নিয়ম-কানুনও প্রয়োজন হয়। সেগুলো খুব সহজে স্থানান্তর যায় না এবং সেজন্য সেগুলোকে একটু অন্যভাবে সংস্থাপন করতে হয়। এসব উপকরণের যেকোন একটির অভাব উৎপাদনব্যবস্থায় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

আধুনিক উৎপাদনব্যবস্থার এই সম্পূরক চরিত্র অনেক উন্নয়নশীল দেশকে এর জন্য অনুপযুক্ত করে ফেলে। কারণ কিছু প্রধান উপকরণ সেখানে অনুপস্থিত। এমনকি শহরের অভ্যন্তরে অনুন্নত অঞ্চলগুলো অনেক বেশি বিচ্ছিন্ন এবং সেখানকার সুযোগ-সুবিধা অপর্যাপ্ত থাকার কারণে উৎপাদনক্ষমতা বিপর্যস্ত হয়। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দক্ষতায় বিশাল অসমতা বিরাজ করে এবং এর ফলে আয়বন্টনের ক্ষেত্রেও অসমতা দেখা যায়।

উৎপাদনশীলতায় এই সীমাবদ্ধতা রেখে পুনর্বণ্টনে সাময়িক সমাধান হবে কিন্তু সমস্যার প্রতিকার হবে না। সমস্যা সমাধানে প্রয়োজন অন্তর্ভুক্তিতে বিনিয়োগ করা, মানুষকে দক্ষ করে তোলা এবং তাদেরকে উপকরণ ও নেটওয়ার্কের সাথে সম্পৃক্ত করা যা তাদেরকে উৎপাদনশীল করে তুলবে ।

সঙ্কটের মূল জায়গাটি হলো দরিদ্র দেশগুলো উৎপাদনের সকল উপকরণকে সর্বত্র পর্যাপ্ত পরিমাণে রাখতে পারে না । তারা দুটি বিকল্পের যেকোনো একটি গ্রহণ করতে পারে। হয়ত তারা অল্প জায়গায় সবগুলো উপকরণ ব্যবহার করছে এবং সেখানে অনেক বেশি উৎপাদন করছে। অথবা অল্প কিছু উপকরণকে সর্বত্র ব্যবহার করছে এবং সব জায়গায় খুবই অল্প পরিমাণে উৎপাদন করতে পারছে। একারণেই উন্নয়ন অসম হয় ।

আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থার আরেকটি সমস্যা হচ্ছে, উৎপাদনের সবগুলো উপকরণের মাধ্যমে অর্জিত আয় বন্টন করা। বর্তমানে উৎপাদন প্রক্রিয়া শুধু ব্যক্তির দ্বারা সম্পন্ন হয়না, এমকি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের একটি দল দ্বারাও নয় বরং সম্মিলিতভাবে অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান বা পুরো ভ্যালু চেইনের দ্বারা সম্পন্ন হয়। সমসাময়িক কোন সিনেমার শেষে তার কৃতিত্ব তালিকার দিকে তাকালেই এটা বোঝা যায়। সম্পূরকতা এভাবে এক ধরণের বরাদ্দের সমস্যা তৈরি করে । একটি পরিপূর্ণ পণ্যের জন্য কাকে কতটা কিভাবে স্বীকৃতি দেয়া উচিত?

অর্থনীতিবিদদের প্রচলিত বিশ্বাস যে , দলের প্রত্যেক সদস্যকে তার সুযোগ ব্যয়ের সমান মজুরি দেয়া হয়। এর অর্থ হলো যদি তাকে দল থেকে বের করে দেয়া হত তবেই তিনি তার সর্বোচ্চ আয় করতেন। বাজার যদি প্রতিযোগিতাপূর্ণ (পারফেক্ট কম্পিটিশন) হয় , তাতে যদি সকল উপকরণের সুযোগ ব্যয় পরিশোধ করা হয়, তাহলে বন্টন করার জন্য আর কিছু বাকি থাকে না । কিন্তু বাস্তবে দল সম্মিলিতভাবে অনেক বেশি মূল্য ধারন করে- একটি দলের সদস্যদের সুযোগ ব্যয়ের চেয়ে অনেক বেশি।

এই ‘দলগত উদ্ধৃত্ত’ কার পকেটে যাচ্ছে? প্রথাগতভাবে এটা ধরে নেয়া হয় যে, শেয়ারহোল্ডাররা এর ভাগ পাচ্ছেন। কিন্তু পিকেটি এবং অন্যান্যরা এটা দেখিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রে সিইওদের বেতন ও কর্তৃত্ব অত্যাধিক বেড়ে গিয়েছে। যদি তারা এই উদ্বৃত্তের ভাগ না পান তাদের দক্ষতা দল ভাঙার ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হতে পারে। সর্বোপরি, চাকরিচ্যুত সিইওদের আয়ের ধারায় আকষ্মিক পতন এটাই নির্দেশ করে যে , তাদেরকে তাদের সুযোগ ব্যয়ের চেয়েও অনেক বেশি মূল্য দেয়া হয়।

সফল স্টার্টআপগুলোর ক্ষেত্রে, এগুলোকে যখন কেউ কিনে নেয় অথবা স্টার্টআপগুলো যখন পাবলিক লি: কোম্পানিতে পরিণত হয় তখন এর থেকে প্রাপ্ত অর্থ সাধারণত উদ্যোক্তার হস্তগত হয়। গতানুগতিক ভ্যালু চেইনে বাজারে যার ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি উদ্বৃত্ত তার কাছেই যায় । বিজনেস স্কুলগুলো তাদের শিক্ষার্থীদের সেই সব উপকরণগুলোতে পারদর্শিতা অর্জন করতে শেখায় যা অন্যদের জন্য সরবরাহ করা কঠিন। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদেরকে ভ্যালু চেইনের সর্বোচ্চ উদ্বৃত্ত হস্তগত করতে শেখায়। অন্যান্য উপকরণগুলো যাতে কমোডিটাইজড হয় এবং সেগুলো তাদের সুযোগ ব্যয়ের বেশি হস্তগত করতে না পারে তা নিশ্চিত করতেও শেখায় ।

সম্পদ যার প্রাপ্য তিনি পাচ্ছেন না। পিকেটি দেখিয়েছেন, ফ্রান্স ও অন্যান্য দেশগুলোতে ‘পুঁজি’র উত্থান হয়েছে প্রধানত ভূমি এবং স্থাবর সম্পত্তির দাম বাড়ার ফলেই , শুধু নেটওয়ার্ক ভিত্তিক অর্থনীতিতে ভাল জায়গাগুলো অনেক মূল্যবান হয়ে উঠেছে বলে । ভূমির মত, বর্তমানে মেধাস্বত্ব অধিকারের আমলে পুরনো আইডিয়ার ব্যাপারে অতি-সংরক্ষণবাদী হলে সেগুলো বাজার ক্ষমতা পেতে পারে। পুরনো আইডিয়ার এই বাজার ক্ষমতা বৈষম্যকে শুধু বাড়াবেনা বরং উদ্ভাবনী শক্তিরও ক্ষতি করবে।

এর মানে হচ্ছে সমতা নিশ্চিত করতে যে উপকরণগুলো দলগত উদ্বৃত্ত হস্তগত করে সেগুলোকে নিজের অধীনে রেখে বা সেগুলোর উপর কর বসাতে হবে। এই বিষয়টি মাথায় রেখেই সমতা নিশ্চিত করার নীতি গ্রহণ করতে হবে। স্বল্প কর ব্যবস্থা সত্ত্বেও সিঙ্গাপুরে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী একটি সরকার রয়েছে। এর একটি কারণ হচ্ছে সরকারের সফল নীতি গ্রহণ, যা ভূমি ও স্থাবর সম্পত্তির মূল্য বাড়িয়েছে এবং সরকার তার অধীন সম্পত্তিগুলো থেকে বড় রকমের রাজস্ব আয় করেছে।

একইভাবে কলাম্বিয়ার সিটি অব মেডেলিন তাদের নিজস্ব ইউটিলিটি কোম্পানির লাভ থেকে অর্থসংস্থান করে। এটি এখন একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে। অর্থনীতিবিদ দানি রডরিক সম্প্রতি পরামর্শ দিয়েছেন যে, সরকারের উচিত পাবলিক ভেঞ্চার ফান্ডগুলোতে বিনিয়োগ করা এবং এর লাভ থেকে নিজেদের খরচ চালানো। এতে করে উদ্ভাবন থেকে প্রাপ্ত আয়ের সামাজিকীকরণ ঘটবে।

অনেকেই বলেন, হস্তগত এই উদ্বৃত্ত আয়ের পুনর্বণ্টনে সাহায্য করে। অন্তর্ভূক্তিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে এর চেয়ে অনেক বেশি এবং স্থায়ী সফলতা অর্জন সম্ভব। পরিশেষে, এই অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন সমৃদ্ধ এবং সমতাভিত্তিক সমাজ নির্মাণ করতে পারে। অন্যদিকে পুনর্বণ্টন অন্তর্ভূক্তি বা প্রবৃদ্ধি দুটি ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হতে পারে।

অননূদিত প্রবন্ধটি পড়তে ক্লিক করুন : www.project-syndicate.org/commentary/income-inequality-opportunity-costs-by-ricardo-hausmann-2015-01

Published by Ricardo Hausmann

Director of the Center for International Development at Harvard University and Professor of the Practice of Economic Development at Harvard’s Kennedy School of Government. Also George A. Cowan Professor of the Santa Fe Institute. Ricardo Hausmann’s research includes issues of growth, structural transformation, macroeconomic volatility, international finance, gender gaps and aid coordination. He has served as Minister of Planning of Venezuela (1992-1993) and as a member of the Board of the Central Bank of Venezuela. He also served as Chair of the IMF-World Bank Development Committee.