ভর্তুকির ফাঁদ

রাজনৈতিক বিবেচনায় গৃহীত কোন ভাল নীতিও একটি শক্তিশালী অর্থনীতিকে সরাসরি বিপাকে ফেলতে পারে। যেমন- খাদ্য ও এনার্জি খাতে ভর্তুকি। সাধ্যাতীত এই ভর্তুকির প্রশ্নই বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নতুন তিনজন রাষ্ট্রনায়ক- মিশরের রাষ্ট্রপতি আবদুল ফাত্তাহ আল সিসি, ইন্দোনেশিয়ার নির্বাচিত-রাষ্ট্রপতি জকো ‘জকভি’ উইদদো ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্য প্রধান মাথাব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পূর্বানুমান মিথ্যে প্রমাণিত করে সিসি ভর্তুকি কমানোর কাজটা ভালভাবেই করছেন। মোদিই বরং প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি।   তিনি এমনকি দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত বিশ্ব বানিজ্য সংস্থার (ডব্লিওটিও) একটি চুক্তিও বাতিল করে দিচ্ছেন। জকোভির ব্যপারে এখনো কোন মন্তব্য করার সময় আসেনি।

উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ কিছু রাষ্ট্রের নীতি অনুসরণ করে গত জুলাই মাসে সিসি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা তেলের উপর ভর্তুকি কমিয়ে দিয়েছেন, যার ফলে তেলের দাম ৪১ থেকে ৭৮% পর্যন্ত বেড়ে গিয়েছে। তবে অবাক করার মত বিষয় হল, এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোন জোরালো প্রতিবাদ গড়ে উঠেনি।

মিশরের পাঁচ বিলিয়ন ইউএস ডলারেরও বেশি বাজেটের ফুড সাবসিডি প্রোগ্রামের সংস্কারও এখন আশু প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। খ্যাদ্যে ভর্তুকি দিয়ে রুটির দাম এত কম রাখা হয়েছিল যে তা প্রায়ই পশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হত। উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোতে এরকম সংস্কারের ফলে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে, এমনকি কোন দেশে সরকারের পতন পর্যন্ত হয়েছে। কিন্তু সিসির সরকার এই চ্যালেঞ্জ বেশ সাফল্যের সাথে মোকাবেলা করেছে বলে মনে হচ্ছে। তারা রুটিতে ভর্তুকির পরিমাণও ১৩% কমিয়ে দিয়েছে।

সিসির সামনে এর কোন বিকল্পও ছিল না। ভর্তুকি কমানোর পরেও আগামি অর্থবছরে বর্তমান সরকার জিডিপির ১০% (ভর্তুকি না কমালে হত ১৪%) ঘাটতি নিয়ে বাজেট পরিকল্পনা করছে। তারপরও খুব কম লোকই আশা করছেন, ভঙ্গুর রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ক্ষমতা গ্রহণকারী সিসি আমূল অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রত্যাশার মধ্যে বিপুল গণতান্ত্রিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসা মোদির চেয়ে দ্রুত উন্নয়ন করতে পারবেন।

অক্টোবরে জকভি যখন ইন্দনেশিয়ার ক্ষমতা গ্রহন করেছেন, তাঁর পেছনে ছিল তেলে ভর্তুকি দেয়ার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। বার্ষিক ২১ বিলিয়ন ইউএস ডলার তেল ভর্তুকির ভার (কখনো তা সরকারি ব্যায়ের ২০%) দেশটি আর বহন করতে পারছে না। বিদায়ী রাষ্ট্রপতি সুশীলো বামবাং ইয়ধুনো এক বছর আগে তেলের দাম বাড়িয়ে প্রথম সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। জকভির উপদেষ্টাগণ বাকি ভর্তুকি কমানোর পক্ষে মত দিয়েছেন। তিনি অবশ্য চার বছর মেয়াদে ক্রমান্বয়ে তা কমানোর ঘোষণা দিয়ে দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন।

অর্থনীতিবিদগণ পণ্যে ভর্তুকি দেয়ার বিরোধিতা করতে দ্বিধাবোধ করেন না। কারণ বিশাল সংখ্যক ভোক্তার চাহিদা ও যোগানদাতার যোগান-সমৃদ্ধ বাজারকেই উৎকৃষ্ট প্রতিযোগিতার আদর্শ ধরা হয়। যেখানে প্রতিযোগিতা উৎকৃষ্ট নয়, সেখানে বৃহৎ প্রাইভেট মনোপলিসমূহ নয়, সরকারকেই তার কারণ বলে বিবেচনা করা হয়।

অদৃশ্য হাতের সমালোচকদের যুক্তি হল, বেসরকারি বাজারকে অনিয়ন্ত্রিত রাখলে বিভিন্ন কারনে তা ব্যর্থ হতে পারে। যেমন, সরকারি হস্তক্ষেপের পক্ষে সবচেয়ে বিখ্যাত দুটি যুক্তি হল আয় বৈষম্য ও পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতি।

সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যপার হল, পরিবেশ ও ন্যায্যতার (ইকুইটি) দোহাই দিয়ে খাদ্য ও জীবাশ্ম-জ্বালানীতে ভর্তুকির পক্ষাবলম্বন করা হয়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই লক্ষ্য অর্জিত হয় না, বরং কখনো কখনো তার ফলাফল হয় বিপরীত। মিশরের খাদ্য ভর্তুকির ২০% এরও কম দরিদ্র জনগণের উপকারে আসে। অধিকাংশ দেশে গ্যাসোলিনে ভর্তুকির ফলে লাভবান হয় মধ্যবিত্ত শ্রেণি। দরিদ্ররা বরং হেঁটে যাতায়াত করেন কিংবা গনপরিবহন ব্যবহার করেন। তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের ক্ষেত্রে ভারতের গ্রামীণ ভর্তুকির ০.০১% এরও কম চরম দরিদ্রদের ভাগে পড়ে, যেখানে সম্পদশালীদের ভাগে পড়ে ৫২.৬%। পৃথিবীব্যাপি জীবাশ্ম-তেল খাতে দেয়া ভর্তুকির ২০% এরও অনেক কম পরিমাণ সারা পৃথিবীর দরিদ্রতম ২০% মানুষের উপকারে আসে।

খাদ্য ও জ্বালানী খাতে ভর্তুকিও জননীতিকে পথভ্রষ্ট করতে পারে। ভারতের কৃষি ভর্তুকি বাঁচিয়ে রাখতে মোদি সরকারের গৃহীত নীতির ক্ষেত্রে তাই হয়েছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার দেয়া আপোষমূলক প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভেটো দিয়ে ভারত গত দশ বছরের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বহুপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির অগ্রগতিকে ব্যাহত করেছে।

কৃষি ভর্তুকি দরিদ্র দেশে কখনো কখনো উৎপাদনকারীর ক্ষতির বিনিময়ে ভোক্তার উপকারে আসে। আবার ধনী দেশে কখনো কখনো তা ভোক্তার ক্ষতির বিনিময়ে উৎপাদনকারীর জন্য লাভজনক হয়। ভারতে গৃহীত নীতিগুলোতে দুই উপায়ই অবলম্বনের চেষ্টা করা হয়েছে। ফলে, ভারত কৃত্রিমভাবে নির্ধারিত কম মূল্যে অস্বাভাবিক পরিমাণ খাদ্যশস্য রেশন দিচ্ছে, আবার একই সাথে কৃষককে উচ্চ মূল্য দেয়ার ফলে অতিরিক্ত যোগান সমস্যায় ভুগছে (পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতি উপেক্ষা করে বিদ্যুৎ, পানি, সার ইত্যাদি কৃষি অবকাঠামো খাতেও কৃষকদের ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে)। সরকার প্রচুর পরিমাণ পচনশীল চাল ও গম কিনে মজুদ করেছে, কিন্তু দরিদ্রদের সহায়তা করার ঘোষিত লক্ষ্যের সাথে সামঞ্জস্যহীন ও দুর্নীতিগ্রস্ত বণ্টন-প্রক্রিয়ার ফলে তার স্বল্প পরিমাণই ভোক্তাদের নাগালে পৌঁছতে পারছে।

সরকার তার এই ভর্তুকি ও মজুদ নীতি অব্যাহত রাখতে চায় । কিন্তু তারা জানে তা হবে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নীতিবিরুদ্ধ। এই নীতিতে চিরস্থায়ী কোন পরিবর্তন সাধনে ব্যর্থ হয়েই মোদি ডব্লিওটিওর ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন এগ্রিমেন্ট- এর প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভেটো প্রদান করেছে।

একবার ভর্তুকির প্রচলন হলে, তা বাতিল করা খুবই দুরূহ হয়ে পড়ে। যখন বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম বাড়ে, গত দশকে যা প্রায়শ ঘটেছে, তখন বাজার নির্ধারিত মূল্যে অভ্যস্ত নাগরিকরা এই বাস্তবতা মেনে নিতে প্রস্তুত থাকে যে সরকার তাদের এই সংকট থেকে সুরক্ষা দিতে পারবে না। কিন্তু প্রশাসনিকভাবে নির্ধারিত খাদ্যদ্রব্য ও জ্বালানী মূল্যে অভ্যস্ত জনগন এরকম সংকটে সরকারকেই দায়ী করেন।

প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে এরকম ভর্তুকির নীতি গ্রহন না করার পক্ষে এটাই সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, ভর্তুকি প্রচলন করার পর তা চালিয়ে যাওয়া কোন ধূর্ত রাজনীতিবিদের জন্য সর্বোৎকৃষ্ট উপায়। যদি মূল্যবৃদ্ধির বিকল্প হয় ঘাটতি কিংবা রেশনিং, তাহলে ক্ষুব্ধ জনগন যে কোন মুহূর্তে প্রতিবাদী হয়ে উঠতে পারে। আবার চাহিদা ও ক্রয়ক্ষমতার অপ্রত্যাশিত ব্যবধানের ফলে খুচরা মূল্য অস্বাভাবিক রকম বেড়ে যায়, চূড়ান্ত বিচারে তাও কালক্ষেপণকারী নেতার জন্য সুবিধাজনক পরিস্থিতি তৈরি করবে না।

আদর্শ ব্যবস্থা হল, খাদ্য ও জ্বালানী খাতে ভর্তুকি কমানোর পাশাপাশি নিচুতলার মানুষের আয় বৃদ্ধির জন্য সহায়ক অন্যান্য উপায় উদ্ভাবন করা। উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলো মেক্সিকোর ‘প্রগ্রেসা-অপরতুনিদাদেস’ প্রোগ্রাম ও ব্রাজিলের ‘বলসা ফ্যামিলিয়া’র মত কন্ডিশনাল ক্যাশ ট্রান্সফার পদ্ধতি কিংবা ভারতের উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ইউনিক আইডেন্টিটিফিকেশন সিস্টেমের মত অভিনব নীতি থেকে কার্যকর ট্রান্সফার মেকানিজম সম্পর্কে অনেক কিছুই আয়ত্ব করেছে। কিন্তু যেখানে বাজেট সংকট বাধ্য করার আগে কোন সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় না, সেখানে সংকট উত্তরণে স্থানান্তরের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ নাও থাকতে পারে। বুদ্ধিমান রাজনীতিবিদের উচিত হবে ক্ষমতা গ্রহণের পর যত দ্রুত সম্ভব এই অস্বস্তিকর সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে দেয়া। জকভি ও সিসি এই নীতিই গ্রহন করেছেন। কিন্তু বাজারব্যবস্থা সংস্কারের পক্ষে বিপুল নির্বাচনী সমর্থন ও উদ্দীপনা স্বত্বেও মোদি এই সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয়েছেন।

অননূদিত প্রবন্ধটি পড়তে ক্লিক করুন : www.project-syndicate.org/commentary/jeffrey-frankel-explains-why-it-is-politically-wise-to-remove-price-supports-for-food-and-energy

Published by Jeffrey Frankel

Jeffrey A. Frankel is James W. Harpel Professor of Capital Formation and Growth. He directs the Program in International Finance and Macroeconomics at the National Bureau of Economic Research, where he is also on the Business Cycle Dating Committee which officially declares recessions. He served at the Council of Economic Advisers in 1983-84 and 1996-99; as CEA. He was also the Professor of Economics at the University of California at Berkeley. He currently serves on the Monetary Policy Committee of Mauritius and on advisory panels for the Bureau of Economic Analysis and the Federal Reserve Bank of New York. Jeffrey Frankel, a professor at Harvard University's Kennedy School of Government, previously served as a member of President Bill Clinton’s Council of Economic Advisers.