দারিদ্র্য থেকে উত্তরণ

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য তত্ত্বে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত একটি ধারণা হল, শেষ পর্যন্ত বাণিজ্য বৃদ্ধির সাথে জিডিপির দ্রুততর বৃদ্ধির একটা সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু বাণিজ্য-নির্ভর প্রবৃদ্ধি যেন দরিদ্রদের কল্যাণ বয়ে আনে তা নিশ্চিত করাই হল চ্যালেঞ্জ, যা মোকাবেলা করার জন্য আমার প্রতিষ্ঠান বিশ্বব্যাংক কাজ করে যাচ্ছে। এই একই কারণে এই মাসের শুরুতে বালিতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে সাতটি বহুজাতিক কোম্পানির প্রধানগণ একটি বাণিজ্য- তরান্বিতকরণ চুক্তির (trade-facilitation agreement) প্রস্তাবকে সমর্থন করেছেন।

আমাদের অবগত থাকা উচিত, সারা পৃথিবীতে দারিদ্র্য হার ইতিহাসের সর্বনিম্নে এসে পৌঁছেছে এবং চরম দারিদ্র্য হার (ক্রয়ক্ষমতার সমতা অর্জনের মাপকাঠিতে, যারা প্রতিদিন ১.২৫ ইউএস ডলারের কম উপার্জনের উপর বেঁচে থাকেন) ২০১০ সালে ২০০০ সালের চেয়ে প্রায় অর্ধেক কমেছে।  কিন্তু পৃথিবীব্যাপী এখনো এক বিলিয়নেরও বেশি মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে জীবনযাপন করছেন। প্রবৃদ্ধি ঘটেছে অসমান্তরালভাবে, সাব-সাহারান আফ্রিকার তুলনায় পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকায় দারিদ্র্যের হার কমেছে অনেক বেশি পরিমাণ।

এই পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নেয়ার জন্য বিশ্বব্যাংক তার দারিদ্র্য-বিমোচন কর্মসূচিগুলো পরিচালনার এক নতুন লক্ষ্য ঠিক করেছে, তা হল- প্রতিটি দেশের দরিদ্রতম ৪০% জনগণের আয়-বৃদ্ধি  তত্ত্বাবধান (monitor) করার মাধ্যমে টেকসই ও অংশীদারিমূলক সমৃদ্ধিকে উৎসাহিত করা । হ্যাঁ, আমরা যেভাবে উন্নয়ন সাফল্যকে সংজ্ঞায়িত করি এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বাণিজ্য-সংক্রান্ত সহায়তা দিয়ে থাকি সে ব্যাপারেও আমরা পুনর্বিবেচনা করছি।

বাণিজ্যের সাথে দারিদ্র্যের সম্পর্ক বহুবিধ এবং জটিল। বাণিজ্য বাড়লে পণ্য ও সেবার দাম কমে, তাতে ভোক্তারা লাভবান হন; দরিদ্র মানুষের জন্য অনেক বিচিত্র ধরনের পণ্য কেনার সুযোগ তৈরি হয় এবং কোম্পানিগুলো আরও বিচিত্র ধরনের পণ্য সরবরাহ করতে পারে।

কিন্তু বর্ধনশীল বাণিজ্যে বা বাণিজ্য বৃদ্ধির (increased trade) ফলে ফ্যাক্টরিগুলোতে স্বল্প-দক্ষতার লোকদের কর্মসংস্থান না থাকতে পারে এবং কৃষিপণ্যের দাম পড়ে যেতে পারে, যা গরিব মানুষদের  অসমানুপাতিকভাবে (disproportionately) আঘাত করে। উদাহারণস্বরূপ বলা যায়, ভারতের যে সব এলাকায় কৃষি পণ্য ক্রমবর্ধমান বিদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে, সেসব অঞ্চলে দারিদ্র্য কমেছে তুলনামূলক ধীরগতিতে। দক্ষতা অর্জনের পথে প্রতিবন্ধকতা এবং কঠোর শ্রম-বাজার নিয়ন্ত্রনের কারণে আন্তঃখাত শ্রম চলিষ্ণুতা (intersectoral labor mobility) বাধাগ্রস্ত হওয়ার ফলে এরকম পরিস্থিতিতে দরিদ্রদের সামনে বিকল্প কোন পথ খোলা থাকে না।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে, বাণিজ্য বাড়ার সাথে সাথে অল্প সময়ের মধ্যে কিছু গুরুতর বিষয়ে সমন্বয় সাধন করতে হয়। ব্যক্তিকে তার ভোক্তা-আচরণ (consumption habits) পরিবর্তন করতে হতে পারে; বিভিন্ন খাতে পুনরায় শ্রমবণ্টন করতে হতে পারে; কিংবা কিছু সংখ্যক শ্রমিককে কিছুদিনের জন্য হলেও স্বল্প মজুরিতে কাজ করতে হতে পারে। কিছু কোম্পানি বড় হবে, কিছু ছোট।

তবে অভিজ্ঞতা বলে, সরকার চাইলে দূরদর্শী নীতি গ্রহণ করে বাণিজ্যের সুফল বৃদ্ধি করতে পারে এবং দরিদ্রদের উপর এর নেতিবাচক প্রভাব কমাতে পারে। নীতিনির্ধারকগণ চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের জন্য পুনঃপ্রশিক্ষণ প্রদান এবং যে সকল নিয়ন্ত্রন-জনিত প্রতিবন্ধকতা সমৃদ্ধ ও রপ্তানি-নির্ভর খাতে শ্রম-প্রবাহকে বাঁধাগ্রস্ত করছে তা দূর করার নীতি গ্রহণ করতে পারেন। সেক্ষেত্রে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষার জন্য রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা তুলে দেয়া এবং বাজার সম্পর্কিত তথ্যাদি নির্ভুলভাবে সঠিক সময়ে পাওয়ার নিশ্চয়তা বিধান করা যেতে পারে।

এসব নীতি গ্রহণ করলে, উন্নয়নশীল দেশসমূহের বাণিজ্য সম্ভাবনা বাড়াতে বিশ্বব্যাংক গৃহীত পদক্ষেপগুলো দারিদ্র্য বিমোচনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। উদাহারণস্বরূপ, খামার, কৃষক ও গৃহস্থালিগুলোকে বাজার ও সাপ্লাই চেইনের সাথে যুক্ত করার জন্য আমরা উন্নয়নশীল দেশের সরকারগুলোকে সহায়তা করে থাকি, যাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায় এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতিশীল হয়।

তাছাড়া, অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পেও আমরা সহায়তা করে থাকি, যার মাধ্যমে এই দেশগুলো সড়ক, সেতু ও বন্দর নির্মাণ করে ব্যবসায়ীদের বাজারের সাথে যুক্ত করতে পারে। যেমন, কাজাখাস্তানে ১.৮ বিলিয়নের একটি হাইওয়ে প্রকল্পের মাধ্যমে পুরো দেশ জুড়ে বাণিজ্য-সহায়ক পরিবহণ ব্যবস্থা তৈরিতে সহায়তা করা হচ্ছে। এর ফলে সেদেশের দরিদ্রতম প্রদেশসমূহের অর্থনীতি উজ্জীবিত হচ্ছে এবং  ৩০,০০০ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করছে । ভারতের সাথে রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য নেপালের যে সড়কপথ ব্যবহৃত হয়, সেসব ঢালু, বিপজ্জনক ও ব্যস্ত সড়কের সংস্কারের জন্য অর্থায়ন এবং দেশটির কয়েকটি দুর্গম জেলাকে প্রধান সড়ক নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত করার জন্য গৃহীত সরকারি পদক্ষেপ বাস্তবায়নেও সহায়তা করছে ব্যাংক।

তাছাড়া, ঘুষের জন্য অন্যায় আচরণ ও দালালির চক্র থেকে ব্যবসায়ীদের সুরক্ষা দেয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট কাস্টমস নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশকে সহায়তা করছে বিশ্বব্যাংক। এবং সীমান্তে যেসব জটিলতা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির কারণ হচ্ছে, আমরা সেগুলো শনাক্ত করার চেষ্টা করছি। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়,  দাউলা বন্দরের মাধ্যমে ক্যামেরুনের বাণিজ্য প্রক্রিয়া সরলীকরণ ও আধুনিকায়ন করার ক্ষেত্রে এবং লাওসের ব্যবসায়ীদের প্রাসঙ্গিক আইন, প্রসিডিউর, শিডিউল সম্পর্কে জানার সুযোগ ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এজেন্সির ফর্মপূরণ ইত্যাদি অনলাইন সুবিধা প্রদানকারী অনলাইন পোর্টাল তৈরি করার ক্ষেত্রে সহায়তা করছি।

তাছাড়া ২০১০ সাল থেকে বিশ্বব্যাংকের বেসরকারি খাতে ঋণ প্রদানকারী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স কর্পোরেশন ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের মূলধন সুগমতা (ACCESS TO CAPITAL) বাড়ানোর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সাপ্লাই চেইনের সাথে একীভূত করার ব্যাপারে উৎসাহিত করে আসছে। বর্তমানে ৫০০ মিলিয়ন ইউএস ডলার গ্লোবাল ট্রেড সাপ্লায়ার ফিন্যান্স প্রোগ্রাম নামের একটি বিনিয়োগ ও পরামর্শমূলক (INVESTMENT AND ADVISORY INITIATIVE) প্রকল্পের আওতায়  বিকাশমান খাতের হাজার হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) প্রতিষ্ঠানকে স্বল্প-মেয়াদী অর্থায়ন করা হচ্ছে।

বিশ্ব নেতৃত্বের উচিত, এই প্রকল্পের সর্বোচ্চ সুফল নিশ্চিত করার জন্য একটি বৈশ্বিক মুক্ত বাণিজ্য পদ্ধতি তৈরি ও পরিচালনার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করা। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বালি সম্মেলনে একটি নতুন বাণিজ্য-ত্বরান্বিতকরণ চুক্তিতে পৌঁছানোর এক অপূর্ব সুযোগ তৈরি হয়েছে, যার মাধ্যমে সীমান্ত চৌকীগুলোতে পণ্য স্থানান্তর, অবমুক্তকরণ ও ছাড়পত্র লাভের (movement, release, and clearance) প্রক্রিয়া সহজতর হবে; বাণিজ্য সংক্রান্ত নীতিমালা আরও সুস্পষ্ট ও সুদূরপ্রসারী হবে; টেকনিক্যাল সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হবে এবং সীমান্ত-নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সহযোগিতামূলক সম্পর্ককে উৎসাহিত করবে।

কিন্তু যতদিন পর্যন্ত প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন ও সংস্কার করার ক্ষেত্রে সম্পদশালী রাষ্ট্র ও দাতাগোষ্ঠী উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোকে সমর্থন না করে, ততদিন পর্যন্ত বালি চুক্তি বাস্তবায়িত হবে না। এই পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ উন্নত রাষ্ট্রগুলোর নীতিনির্ধারকদের স্বীকার করে নিতে হবে যে, একটি অধিকতর কার্যকর, আরও সমন্বিত এবং অংশীদারিমূলক বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থা (world trade regime) সব দেশের জন্য লাভজনক হবে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আন্তরিক প্রতিশ্রুতি ও দেশগুলোর যথার্থ অভ্যন্তরীণ নীতিমালা গ্রহণের মাধ্যমেই বাণিজ্য হতে পারে দারিদ্র্য বিমোচনের একটি শক্তিশালী উপায়।

অননূদিত প্রবন্ধটি পড়তে ক্লিক করুন :www.project-syndicate.org/commentary/mahmoud-mohieldin-on-how-increased-trade-can-benefit-the-poor