ধনী দেশগুলো কেন গণতান্ত্রিক

মাত্র বাইশ বছর বয়সে অ্যাডাম স্মিথ দাবি করেছিলেন, “অতি দরিদ্র একটি  রাষ্ট্রকে সম্পদশালী হিসেবে গড়ে তুলতে শান্তি, সহজ কর ব্যবস্থা এবং একটি সহনীয় বিচার ব্যবস্থার বাইরে খুব কম জিনিসেরই প্রয়োজন হয়। বাকি জিনিসগুলো প্রকৃতির নিয়মেই চলে আসে।” প্রায় ২৬০ বছর পর এখন আমরা জানি যে কথাটি সত্য নয়।

মালেশিয়ান এয়ারলাইনস ফ্লাইট ৩৭০ এর অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রের মধ্যকার জটিল সম্পর্কের গুরুত্ব বোধগম্য হয়। আমরা বুঝতে পারি স্মিথ এই সম্পর্কের উপর গুরুত্বারোপ না করে কতটা ভুল করেছিলেন। বিমান ভ্রমণকে আরামদায়ক এবং নিরাপদ করার জন্য রাষ্টগুলো নিশ্চিত করে যে, পাইলটেরা বিমান চালাতে জানে এবং সেই বিমানকে সবরকমের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। রাষ্ট্রগুলো এয়ারপোর্ট নির্মাণ করে এবং রাডার ও স্যাটেলাইটের যোগান দেয় যা বিমানগুলোকে ট্র্যাক  করতে পারে, আকাশ পথ নিয়ন্ত্রণকারীদের দ্বারা বিমানগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ এড়ায় এবং সিকিউরিটি সার্ভিসের মাধ্যমে সন্ত্রাসীদের দমিয়ে রাখে। যখন কোন বিপদ হয়,তখন সমাধানের জন্য পেশাদার সুদক্ষ সরকারী কর্মচারীদের সাহায্য নেয়া হয়। শান্তি, সহজ কর ব্যবস্থা কিংবা ন্যায়বিচার তখন  কোন কাজে লাগেনা।

তরুণ  স্মিথ যা ধারণা করেছিলেন, সকল উন্নত অর্থনীতিতে এখন তার চেয়ে অনেক বেশি উপকরণ বিবেচনায় নেয়ার প্রয়োজন হয়।  আধুনিক সরকারগুলো শুধু আকারে বড় এবং জটিল নয়, বরং তা হাজার হাজার সংস্থা নিয়ে গঠিত এবং  লক্ষ লক্ষ পৃষ্ঠার আইন-কানুন এর উপর প্রতিষ্ঠিত। তারা গণতান্ত্রিকও, তবে তা একারণে নয় যে তারা প্রায়ই নির্বাচনের ব্যবস্থা করে । তাহলে কেন?

৪৩ বছর বয়সে তার ‘ওয়েলথ অব নেশন’ বইটি প্রকাশ করার পর,স্মিথ অর্থনীতিতে প্রথম কমপ্লেক্সিটি সায়েন্টিস্ট (Complexity Scientist) হিসেবে আবির্ভূত হন। তিনি বুঝেছিলেন, অর্থনীতি এমন একটি জটিল পদ্ধতি যেখানে শুধুমাত্র খাওয়া-পরার মত সাধারণ ব্যাপারগুলোর ব্যবস্থা করতে হাজার হাজার লোকের কাজের মধ্যে সমন্বয় সাধন করার প্রয়্জেন হয়।

কিস্তু স্মিথ এটা ও বুঝেছিলেন, অর্থনীতির এই অতি জটিলতা যেমন কারো দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন, তেমনি নিজেকে সংগঠিত করার ক্ষমতাও তার আছে। তিনি বলেছেন, অর্থনীতির একটি অদৃশ্য হাত রয়েছে। এই অদৃশ্য হাত কাজ করে বাজারমূল্যের মাধ্যমে যা একটি তথ্যব্যবস্থা তৈরি করে। কোন একটি সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সাধনের ক্ষেত্রে  সম্পদ ব্যবহার করা লাভজনক হবে কিনা , সেই হিসেবের জন্য এই তথ্যব্যবস্থা ব্যবহার করা যেতে পারে।

মুনাফার আকর্ষণ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিকে বাজারমূল্য বিষয়ে তথ্য ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত করে। অন্যদিকে পুঁজি বাজারগুলো হচ্ছে সম্পদ বিনিয়োগ ব্যবস্থা (Resource Mobilization) , এটি সেসব কোম্পানী এবং প্রজেক্টে অর্থ সরবরাহ করে, যেগুলোর লাভজনক  হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে।  এভাবেই ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি বাজারমূল্যের প্রতি তাদের প্রতিক্রিয়া দেখায়।

আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থার এমন অনেকগুলো উপাদান দরকার হয়, বাজারব্যবস্থা  যার যোগান দেয় না। এয়ারলাইনের ক্ষেত্রে এই উপাদানগুলো যেমন- নিয়মাবলি, স্ট্যান্ডার্ড, সার্টিফিকেশান, অবকাঠামো, স্কুল এবং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বিজ্ঞান গবেষণাগার, নিরাপত্তা সেবা, এবং অন্যান্য সেবাগুলো প্রয়োজন হয়। বাজারে না পাওয়া এই উপকরণগুলো বাজারে সুলভ এমন উপকরণগুলোর পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। এই উপকরণগুলো বাজারব্যবস্থা সম্পর্কিত কার্যক্রমগুলোর সাথে গভীরভাবে জড়িত থাকে।

তাই এখন প্রশ্ন হল,রাষ্ট্রকর্তৃক সরবরাহকৃত উপকরণগুলোর নিয়ন্ত্রণ করে কে? প্রধানমন্ত্রী? আইনসভা? কোন দেশের শীর্ষ বিচারকেরা কি প্রণীত আইনসমূহের লক্ষ লক্ষ পৃষ্ঠা পড়ে দেখেছেন? কিংবা আইনগুলো একটা আরেকটার সাথে কতটা সম্পূরক বা পরষ্পর বিরোধী তা বিবেচনা করেছেন? কিংবা অর্থনীতির সাথে জড়িত বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রমের ক্ষেত্রে এই আইন কতটুকু প্রয়োগ করেছেন? এমনকি একজন প্রেসিডেন্সিয়াল এক্সিকিউটিভও, হাজার হাজার সরকারী সংস্থা কি কাজ করছে আর কি কাজ করছে না এবং সমাজে তার কি প্রভাব পড়ছে, এসব ব্যাপারে পুরোপুরি সচেতন থাকতে পারেনা।

এটা তথ্য-আধিক্যজনিত( Information-rich) সমস্যা। বাজার দ্বারা নির্ধারিত সামাজিক সমন্বয়ের চ্যালেঞ্জের মত এটাকেও কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।  এটা তাই কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকে পাত্তা দেয় না । এজন্য এক্ষেত্রে বাজারের অদৃশ্য হাতের মত নিজেই নিজেকে  সংঘটিত করতে পারে এমন একটি ম্যাকানিজমের দরকার।  স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুধু নির্বাচনগুলোই  যথেষ্ট নয়, কারণ সেগুলো গতানুগতিকভাবে দুই থেকে চার বছর পরপর অনুষ্ঠিত হয়, এবং প্রত্যেক ভোটার সম্পর্কে খুব কম তথ্য সংগ্রহ করা যায়।

এজন্য সফল রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে একটি বিকল্প অদৃশ্য হাত তৈরি করতে হয়েছে। এটি এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করতে, তার সমাধান দিতে এবং পর্যবেক্ষণ করার জন্য ক্ষমতাকে  বিকেন্দীকরণ করা হয়। এতে করে পর্যাপ্ত তথ্যের উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব হয়  ।

শুধুমাত্র একটি উদাহরণ দেয়া যায়, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকার দেশের প্রায় ৫ লাখ নির্বাচিত আসনের মধ্যে শুধুমাত্র ৫৩৭ টি আসনের দায়িত্ব নেয়। স্পষ্টত অন্য পদগুলোর দায়িত্ব অন্য কোনভাবে পালন করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ১০০ জন সিনেটরের প্রত্যেকের ৪০ জন করে সহযোগী রয়েছে। ৪৩৫ জন প্রতিনিধির প্রত্যেকের ২৫ জন করে সহযোগী রয়েছে।  তারা ৪২ টি কমিটি, এবং ১৮২ টি সাবকমিটিতে সংগঠিত, এর মানে , সেখানে সমান্তরালভাবে একইসাথে ২২৪ টি আলোচনা  সংঘটিত হচ্ছে। এবং ১৫০০০ হাজারেরও বেশি সংখ্যক মানুষের এই গ্রুপটিই শুধু নয়। ২২০০০ মত নিবন্ধিত লবিস্ট তাদের সঙ্গে রয়েছে , যাদের মূল লক্ষ্য (অন্যান্য লক্ষ্যের মধ্যে) আইনপ্রণয়নকারীদের সাথে বসা এবং আইনের খসড়া তৈরিতে সহায়তা করা।

এই ফেডারেল সরকার ব্যবস্থা এবং স্বাধীন সংবাদপত্র মিলে একটি কাঠামো তৈরি করে। এই কাঠামোই আইনের লক্ষ লক্ষ পৃষ্ঠা পড়ে এবং সরকারী সংস্থাগুলো কি করছে, না করছে তা পর্যবেক্ষণ করে। এই কাঠামোই তথ্য উৎপাদন করে এবং এর প্রতি প্রতিক্রিয়া দেখাতে উৎসাহিত করে। এটা বাজেটে সম্পদ বরাদ্দের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে। এটা হচ্ছে একটি উন্মুক্ত ব্যবস্থা। এখানে যে কেউ খবর তৈরি করতে পারে অথবা তার মামলার জন্য একজন লবিস্ট নিয়োগ করতে পারে , এটা তিমিমাছ  শিকার করা অথবা তা রক্ষা করার মত যেকোন কারণে হতে পারে।

এরকম একটি প্রক্রিয়া ছাড়া, আধুনিক অর্থনীতির জন্য যেরকম পরিবেশের দরকার, রাজনৈতিক ব্যবস্থা তা দিতে পারবেনা। একারণেই সব  ধনী দেশগুলো গণতান্ত্রিক, এবং আমার নিজের দেশের মত (ভেনিজুয়েলা) কিছু দেশ দিন দিন গরীবতর হচ্ছে। যদিও এসব দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তবে তারা খুব সাধারণ সমস্যার সমন্বয় করতে গিয়েও হোঁচট খায়। আসলে ভোটের জন্য লাইনে দাঁড়ালেই, নাগরিকদের টয়লেট পেপারের জন্য লাইনে দাঁড়াতে হবেনা এই নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না।

অননূদিত প্রবন্ধটি পড়তে ক্লিক করুন : www.project-syndicate.org/commentary/ricardo-hausmann-on-the-market-like-mechanism-in-advanced-economies–political-systems

Published by Ricardo Hausmann

Director of the Center for International Development at Harvard University and Professor of the Practice of Economic Development at Harvard’s Kennedy School of Government. Also George A. Cowan Professor of the Santa Fe Institute. Ricardo Hausmann’s research includes issues of growth, structural transformation, macroeconomic volatility, international finance, gender gaps and aid coordination. He has served as Minister of Planning of Venezuela (1992-1993) and as a member of the Board of the Central Bank of Venezuela. He also served as Chair of the IMF-World Bank Development Committee.