দুর্বল রাষ্ট্র, দরিদ্র দেশ

প্রিন্সটনঃ স্কটল্যান্ডে বেড়ে উঠার সময় আমাকে শিখানো হয়েছিলো পুলিশকে নিজের বন্ধু ভাবতে এবং প্রয়োজনের মুহূর্তে তাদের কাছে সাহায্য চাইতে। কিন্তু ১৯ বছর বয়সে প্রথম যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে এসে টাইম স্কয়ারে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণরত নিউইয়র্ক সিটির একজন পুলিশ কর্মকর্তার কাছে নিকটবর্তী পোস্ট অফিসের দিকনির্দেশনা জানতে চেয়ে আমি যে বিরূপ আচরণ পাই, তার পরবর্তীতে আমার বিস্ময় পাঠকেরা নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারেন। এর প্রতিক্রিয়াস্বরূপ আমার নিয়োগকর্তার জরুরি কাগজপত্রসমূহ একটি ডাস্টবিনে ফেলে দেই, যেটিকে আমি মেইলবক্স ভেবে ভুল করেছিলাম।

ইউরোপীয়ানেরা তাদের সরকার সম্পর্কে আমেরিকানদের তুলনায় অধিক ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করে। কারণ দ্বিতীয় গোষ্ঠীটির কাছে ফেডারেল, স্টেট এবং স্থানীয় রাজনীতিবিদদের ব্যর্থতা ও অজনপ্রিয়তা একটি সাধারণ ঘটনা। তারপরেও আমেরিকার সরকার বিভিন্ন পর্যায়ে জনগণের নিকট হতে কর আদায় করে এবং এর বিনিময়ে জনগণকে এমন সব সেবা প্রদান করে যা ব্যাতিত তাদের জীবনধারণ দুষ্কর হয়ে পড়তো।

বেশিরভাগ ধনী দেশের নাগরিকদের মতো আমেরিকানরাও এটা ধরে নেয় যে রাষ্ট্রই নাগরিকদের জন্য আইন ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, পাবলিক স্কুল, বয়োবৃদ্ধদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা, সড়ক যোগাযোগ, প্রতিরক্ষা ও কূটনীতি এবং উন্নয়নমূলক গবেষণা, বিশেষ করে ওষুধ শিল্পে অধিক বিনিয়োগ প্রদান করবে। নিশ্চিতভাবেই এই সেবাগুলোর সবকটি সমান গুরুত্ব বহন করেনা এবং সকলের কাছে এগুলোর চাহিদাও একরকম নয়। তবুও জনগণ সরকারকে কর প্রদান করে এবং দেয়া অর্থ যেভাবে ব্যায় করা হয় তা যদি কোন গোষ্ঠী স্বার্থের পরিপন্থী হয় তবে এবিষয়ে সুস্থ জনবিতর্কের আয়োজন করা হয়। নিয়মিত নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ তাদের প্রাধান্য পরিবর্তনের সুযোগ পায়।

এই ব্যবস্থা খুবই স্বাভাবিক একটি ঘটনা, অন্তত তাদের জন্য যারা ধনী দেশগুলোতে কার্যকরী সরকার ব্যবস্থায় বাস করে যেখানে তাদের এই নিয়ে  কোন অনুযোগ করতে হয়না। কিন্তু পৃথিবীর বেশিরভাব মানুষ এই ব্যবস্থার বাইরে বসবাস করে । এশিয়া এবং আফ্রিকার বেশিরভাগ অংশেই সরকার কর আদায় ও সেবা প্রদানের ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত। সরকার ও জনগণের মাঝে যে চুক্তিনামা রয়েছে তা ধনী দেশগুলোতে ত্রুটিপূর্ণ হলেও দরিদ্র দেশগুলোতে প্রায়শই অনুপস্থিত। নিউইয়র্কের সেই পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন দুর্বিনীত এবং অন্য একটি সেবা প্রদানে ব্যস্ত। পৃথিবীর বেশিরভাগ অংশেই পুলিশের যে লোকগুলিকে রক্ষা করার কথা তারা তাদের উপরে হামলে পড়ে, অর্থের জন্য তাদের উপরে অত্যাচার চালায় কিংবা শক্তিশালী প্রভুর নির্দেশে তাদেরকে নির্যাতন করে।

এমনকি ভারতের মতো মধ্যম আয়ের দেশেও পাবলিক স্কুল ও ক্লিনিকগুলোতে ব্যাপক অনুপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়, যার জন্য কোন শাস্তি দেয়া হয়না। প্রাইভেট ডাক্তারেরা তাদের ইচ্ছামতো জনগণকে টিকা, ইনজেকশন এবং এন্টিবায়োটিক প্রদান করেন যা রাষ্ট্র কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হয়না। এবং সবচেয়ে আশংকার কথা হল এই ডাক্তারদের অনেকেই সম্পূর্ণ অযোগ্য।

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে শিশুরা মৃত্যুবরণ করে কেননা তারা ভুল স্থানে জন্ম নিয়েছে। এইসব শিশুরা অজানা দুরারোগ্য রোগে মারা যায়না, বরঞ্চ সেইসব সাধারণ শিশুরোগেই তাদের মৃত্যু হয় যার চিকিৎসা গত এক শতাব্দী ধরে মানুষ করে আসছে। নিয়মিত মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যসেবা প্রদানে সক্ষম সরকারব্যবস্থা না থাকলে এই শিশুরা মরতেই থাকবে। একইভাবে সরকার সক্ষম না হলে আইন নিয়ন্ত্রণ ও প্রয়োগব্যবস্থা ঠিকমতো কাজ করবে না, যার ফলে বাণিজ্যও সঠিকভাবে পরিচালিত হবেনা। যথাযথভাবে কর্মরত সিভিলকোর্ট না থাকলে উদ্ভাবক ও উদ্যোক্তারা তাদের আইডিয়ার জন্য যে সঠিকরূপে মুল্যায়িত ও পুরস্কৃত হবে তার কোন নিশ্চয়তা থাকেনা।

সরকারের সক্ষমতার অনুপস্থিতি, অর্থাৎ উন্নত দেশের নাগরিকেরা যেসকল সেবা ও নিরাপত্তা স্বাভাবিক বলে ধরে নেন- সেগুলো না থাকাটাই পৃথিবীজুড়ে বঞ্চনা ও দারিদ্র্যের প্রধান কারণ। কর্মক্ষম ও সচেতন নাগরিক সংযুক্ত কার্যকরী সরকার না থাকলে বৈশ্বিক দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য যে প্রবৃদ্ধি অর্জন করা প্রয়োজন তা অর্জনের সম্ভাবনা ক্ষীণ।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে পৃথিবীর ধনী দেশগুলো বর্তমানে এই পরিস্থিতির আরো অবনতিতে ভূমিকা রাখছে। বিদেশী সহায়তা এর জন্য অনেকাংশে দায়ী- যা ধনী দেশগুলো হতে দরিদ্র দেশগুলিতে যাচ্ছে। এই সহায়তার ফলে স্বাস্থ্যসেবাখাতে বিশেষ উন্নতি হচ্ছে, অনেক মানুষ জীবন ফিরে পাচ্ছে যারা এই সহায়তা না থাকলে হয়তো মৃত্যুবরণ করতো। কিন্তু এর ফলে রাষ্ট্রের স্থানীয় সক্ষমতার উন্নতি ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

এই ঘটনাটি সবচেয়ে দৃশ্যমান আফ্রিকান দেশগুলিতে, যেখানে সরকার সরাসরি বিদেশী সাহায্য পায় এবং বাৎসরিক ব্যায় বিবেচনায় আনলে এই সহায়তার অঙ্কটিও বেশ বড় (কোন কোন ক্ষেত্রে মোট ব্যায়ের অর্ধেকেরও বেশি)। এই ধরণের সরকারের সাথে জনগণের কোন চুক্তি নেই, কার্যকরী কোন আইনসভাও নেই, নেই কর আদায়ের কোন ব্যবস্থা। যদি এইসব সরকার কারো নিকট দায়বদ্ধ থেকে থাকে, তবে তা হল একমাত্র দাতাগোষ্ঠী। কার্যক্ষেত্রে অনেকসময় এটিও থাকেনা, কারণ দাতা দেশগুলি তাদের নাগরিকদের কাছ থেকে চাপে থাকে (যারা ন্যায়গতভাবেই দরিদ্রদের সহায়তা করতে চান) অর্থ সাহায্য পাঠানোর জন্য। ঠিক তেমনি দরিদ্র দেশের সরকারগুলোও এই অর্থ গ্রহণ করার জন্যই মুখিয়ে থাকে।

সরকারকে পাশ কাটিয়ে দরিদ্রদের কাছে সরাসরি সহায়তা পাঠালে কেমন হয়? নিশ্চিতভাবেই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হবে পূর্বের চেয়ে স্বস্তিদায়ী এবং ইতিবাচক।

বিশেষ করে সেসব দেশগুলোতে যেখানে সরকারের মাধ্যমে বিদেশী সহায়তার খুব সামান্য অংশই দরিদ্রদের হাতে গিয়ে পৌঁছায়। এবং এর ফলে সহায়তার পরিমাণও কম লাগবে। ধনী দেশগুলোর প্রতিটি পূর্ণ বয়স্ক মানুষ দৈনিক $১৫ সেন্ট করে দিলেই পৃথিবীর সকল দরিদ্র মানুষকে $১ ডলারের নিম্ন রেখায় উত্তীর্ণ করা সম্ভব।

কিন্তু এর ফলে কোন সমস্যারই সমাধান হবেনা। দরিদ্র জনগণের তাদের জীবনমান উন্নত করতে সরকারকে প্রয়োজন হবে। সরকারকে পথ থেকে সরিয়ে দিলে স্বল্পযাত্রায় পরিস্থিতির উন্নতি হয়তো সম্ভব, কিন্তু অনেক সমস্যা এতে করে অমীমাংসিত রয়ে যাবে। দরিদ্র দেশগুলোর স্বাস্থ্যসেবা চিরকাল বিদেশী সাহায্যে পরিচালিত হতে পারেনা। বিদেশী সহায়তা দরিদ্রদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চাহিদাটিকেই অস্বীকার করে। সেটি হল একটি কার্যকরী সরকার ব্যবস্থা যা তাদের জন্য আজ ও আগামীতে কাজ করবে।

আমরা যা করতে পারি তা হল নিজেদের সরকারকে সেইসব পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বাঁধা দিতে পারি যার ফলে দরিদ্র দেশগুলো দারিদ্র্য থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে পাচ্ছেনা। বিদেশী সহায়তা বা অনুদান হ্রাস করা তার একটি, অনুরূপ কাজ হচ্ছে অস্ত্র ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করা, ধনী দেশগুলি হতে বাণিজ্য ও ভর্তুকি ব্যবস্থার উন্নয়ন, সহায়তা খাতের বাইরে কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রদান এবং সেসব রোগের জন্য আরও কার্যকরী প্রতিষেধক উদ্ভাবন যেগুলোতে ধনী দেশের মানুষেরা খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হননা। দরিদ্র মানুষগুলোর দুর্বল সরকারকে দুর্বলতর করে দিয়ে আমরা তাদের সাহায্য করতে পারিনা।

অননূদিত প্রবন্ধটি পড়তে ক্লিক করুন: www.project-syndicate.org/commentary/economic-development-requires-effective-governments-by-angus-deaton

You might also be interested in