পরিকল্পিত সুখ

বিগত বছরগুলোতে সুখ সম্পর্কিত চিন্তা ভাবনায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। কিছুদিন আগেও মনে করা হত সুখ প্রকৃতপক্ষে মানুষের নিয়ন্ত্রণের অতীত কিছু ধারণা, যেমনঃ ভাগ্য, নিয়তি অথবা জিনগত বৈশিষ্ট্য দ্বারা নির্ধারিত হয়। স্যামুয়েল বেকেটের উক্তিকে তখন সত্যি বলে মনে হতঃ “ পৃথিবীর অশ্রুর পরিমাণ অপরিবর্তনিয়”। কিন্তু নতুন কিছু আবিষ্কার সুখ সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে বদলে দিচ্ছে।এগুলো আমাদের শিখাচ্ছে আমরা সুখকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি এবং চাইলে কাউকে সুখী হতে শেখাতেও পারি।

অনেক উপাদানের উপরে মানুষের সুখ নির্ভর করে। এর মধ্যে সুস্বাস্থ্য ও সুসম্পর্কের মতো দৃশ্যমান উপভোগ্য উপাদান থেকে শুরু করে রয়েছে এমন অনেক আচরণ যার সাথে সুখের সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর, যেমন দানশীলতা বা মহৎ আচরণ। এগুলোর কিছু কিছু শেখা বা অভ্যাস করা সম্ভব এবং কিছু কাজ পরীক্ষামূলকভাবে মানুষকে ভালো থাকতে সাহায্য করেছে। যেমনঃ অনিবার্য ঘটনাগুলোকে মেনে নিতে শেখা এবং পিছিয়ে থাকার মনোভাব বর্জন করা। দালাই লামা সম্প্রতি লন্ডনে এরকম কিছু কাজের কোর্স উদ্বোধন করেছেন যেগুলো পরিচালিত হয় অ্যাকশন ফর হ্যাপিনেস দ্বারা, যে প্রতিষ্ঠানটি চালু হতে আমার ভূমিকা রয়েছে।

একটি সমাজ সমষ্টিগতভাবে সুখী হবার প্রচেষ্টা করতে পারে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন জাতীয় পরিসংখ্যানে সুখী হবার পরিমাপকগুলো সংযুক্ত করেছেন। সম্প্রতি জার্মান চ্যান্সেলর এঙ্গেলা মোরকেল নাগরিকদের সু-অবস্থা নিশ্চিতকরণে একটি কর্মসুচি চালু করেছেন। রাষ্ট্রগুলো কীভাবে পরিচালিত হয় তা নাগরিকদের সুখী হবার উপরে বড় ধরণের প্রভাব ফেলে। যেমনঃ রাষ্ট্রে শান্তি অবস্থা বজায় রাখা, আইনের শাসন নিশ্চিত করা এবং শাসন ব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক পদ্ধতির ব্যবহার ইত্যাদি। গবেষণায় দেখা গেছে এগুলো নাগরিকদের সুখী হবার সহায়ক এবং কোন কোন ক্ষেত্রে মূল কারণ। এই দাবীর পিছনে পরিষ্কার যুক্তিও রয়েছে। একটি শান্তিপূর্ণ দেশ শুধু যে তার নাগরিকদের সুখী করে তাই নয়, বরঞ্চ এটা অসুখী হবার অনেকগুলো কারণকেও দূর করে। নাগরিকদের ভালো থাকার সাথে সরকারের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের সম্পর্ক আছে; শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন ও প্রসারণ এবং বেকারত্ব দূরীকরণে অধিক মনোযোগ এর উদাহরণ। কিন্তু কিছু কিছু পদক্ষেপ এর প্রভাব সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা যায় না। যেমন আমরা জানি না যে, বিয়ের উপরে বিভিন্ন বিধিনিষেধ ভালো থাকাকে প্রভাবিত করে কিনা। যদিও বিয়ের সাথে ভালো থাকার গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আছে।

একইভাবে আমরা এটা জানিনা যে আবশ্যিক শিক্ষা কিংবা কাঠামোবদ্ধ শিক্ষানীতির সাথে ভালো থাকার সম্পর্কটা ইতিবাচক নাকি নেতিবাচক। সামগ্রিকভাবে বলা চলে সুখী হবার উপরে শিক্ষার ক্ষীণ প্রভাব রয়েছে ( কারণ শিক্ষার ফলে চাহিদা পূরণের ক্ষমতার তুলনায় চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পায়)। সেই সাথে এটা পুরোপুরি পরিষ্কার নয় যে পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব কালীন ছুটি, নমনীয় কর্মসূচি, বর্ধিত অবসর বয়স সীমা, কাজ ভাগাভাগি করে নেয়া সংক্রান্ত আইন- ইত্যাদি মানুষের ভাল থাকার উপরে আশানুরূপ প্রভাব ফেলে কি না।

এই না জানার পিছনে কিছুটা দায়ী পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাব। মানব জীবন নানা উপাদানের সাথে জটিল সম্পর্কে আবর্তিত হবার ফলে সমস্যাগুলোর প্রকৃত কারণ নির্ণয় করা সম্ভব হয়না।  প্রথম দর্শনে মনে হতে পারে, রাজস্ব আদায়ের হার কমালে জনগণ সুখী হবে।  কেননা তাদের প্রয়োজন মেটানোর জন্য হাতে থাকা অধিক অর্থ ভালো থাকাকে প্রবর্ধিত করবে। কিন্তু এই সময়েই অন্যান্য উপাদানগুলো তাদের প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করে। যেমনঃ রাজস্ব  আদায়ের প্রক্রিয়া সবার কাছে স্বচ্ছ কিনা অথবা এর সাথে সামঞ্জস্য রেখে সরকারের অন্যান্য ব্যায় হ্রাস পাচ্ছে কিনা।

ব্যতিক্রমীভাবে গবেষণায় উঠে এসেছে, ভালো থাকা ও ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ড অনেকভাবেই সম্পর্কিত। যেমনঃ শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপরে ব্যায়ামের নানাবিধ প্রভাব সম্পর্কে তথ্যসম্বলিত অনেক বই এখন পাওয়া যায়। প্রবীণদের জন্য কর্মব্যস্ত থাকাটা ভালো থাকার অন্যতম প্রধান লক্ষণ, সেটা যেকোনো কাজেই হোক না কেন- উদাহরনঃ শারীরিক ও মানসিক ব্যায়াম, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ কিংবা বেতন বাঁধা কাজ।  ( কানাডায় এক সমীক্ষায় দেখা গেছে ৬৫ বছর বয়সোর্ধ নাগরিকদের জন্য বৈতনিক কাজই সবচেয়ে  কাঙ্ক্ষিত )

গবেষণায় নানাভাবে প্রমাণিত হয়েছে যেসব নীতিমালা সহানুভূতি ও সহমর্মিতার বোধকে উৎসাহিত করে সেসব ভালো থাকাকেও ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে।  গবেষণায় এটাও স্পষ্টভাবে দেখা গেছে যে নগরায়ন ভালো থাকাকে প্রভাবিত করতে পারে যদি এর ফলে যাতায়াত সময় হ্রাস পায় এবং অপরাধভীতি কমে।

দুর্দশা দূর করা ব্যবহারিকভাবে অসম্ভব, কারণ এটা মানব জীবনের একটা অংশ। কিন্তু মানুষ এককভাবে এবং রাষ্ট্রীয় সহযোগিতায় পৃথিবীকে একটি আনন্দময় আবাসে পরিণত করতে পারে। পৃথিবীর অশ্রু সবসময়ই অপরিবর্তিত থাকতে হবে- এরকম কোন কথা নেই।

অননূদিত প্রবন্ধটি পড়তে ক্লিক করুন: http://www.project-syndicate.org/commentary/learning-and-legislating-happiness-by-geoff-mulgan-2015-11

You might also be interested in