ফেড যেভাবে বৈষম্য দূর করলঃ

নিউইয়র্কঃ অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ গত দশ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো সুদের হার বৃদ্ধির কাজটি করলো। সুদের হার বৃদ্ধির পরবর্তী প্রতিক্রিয়া, উদীয়মান বাজারের ন্যায্যতা, গৃহায়ন চাহিদা- অন্যসব বিষয়ের মাঝে ব্যাপক বিতর্কের উপাদান হিসেবে উঠে এসেছে। কিন্তু বাজার যখন ধীরে ধীরে কম সহযোগী মুদ্রানীতির সাথে মানিয়ে নিতে মানিয়ে নিতে শিখছে, অধিকাংশ মানুষই এবিষয়টির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক দিক এড়িয়ে গেছে।

২০০৮ সালে বৈশ্বিক আর্থিক সঙ্কট আঘাত হানার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে আয় ও সম্পদের বৈষম্য ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু মুদ্রানীতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার মাধ্যমে এই প্রথার সমাপ্তি ঘোষিত হয়েছে। কার্যক্ষেত্রে এই নীতি, এর বিপরীত প্রথাকে ত্বরান্বিত করতে কাজ করবে।

বর্তমান পরিস্থিতি অনুধাবনে কিছু গুরুতর পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করুন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে গৃহপর্যায়ে রিয়েল মেডিয়ান ইনকাম ( মুদ্রাস্ফীতি বিবেচনা করে) ১৯৭৯ সালের সমপর্যায়ে আছে। পিউ রিসার্চ সেন্টার পরিচালিত সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখা গেছে আমেরিকানরা ২০০০ সালে যা আয় করত, ২০১৪ সালে তার তুলনায় ৪ শতাংশ কম আয় করে এবং গত ৪০ বছরের মাঝে প্রথমবারের মতো মধ্যবিত্তরা আমেরিকান সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের প্রতিনিধিত্ব করেনা।

আমেরিকার শীর্ষ ২০ ধনী ব্যক্তির মিলিত সম্পদের পরিমাণ মোট জনসংখ্যার আয়ের দিক থেকে নিচে অর্ধেকেরও বেশি মানুষের সমষ্টিগত সম্পদ অপেক্ষা বেশি। এর আগে কখনো আমেরিকার উচ্চ আয়সম্পন্ন গ্রুপের সাথে অন্যান্যদের ব্যবধান এতোটা প্রকট হয়ে দেখা দেয়নি। ধনী গৃহগুলি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যার প্রতি পাঁচজনের একজনকে প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, ওয়ালস্ট্রিট থেকে উত্তরে মাত্র এক ঘণ্টার দূরত্বে কানেক্টিকাটের ব্রিজপোর্টে গিনি কোফেশিয়েন্ট (আয় বণ্টন ও বৈষম্য পরিমাপের একটি মানদণ্ড) এর মান জিম্বাবুয়ে অপেক্ষা সঙিন।

পরিহাসের বিষয় হল, আর্থিক বিপর্যয় সামাল দেবার জন্য নেয়া পদক্ষেপগুলোর কারণে এই পরিস্থিতি আরও খারাপ রূপ ধারণ করেছে। ২০০৭-০৮ সালের মন্দার কারণে উচ্চ আয়ের মানুষগুলো নিম্ন আয়ের মানুষের তুলনায় অধিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলো। কারণ পূর্বতন দলটি নিম্ন আয়ের মানুষের শ্রমবাজারের বিপরীতে অস্থিতিশীল পুঁজি বাজার থেকে অধিক অর্থ উপার্জন করতো। কিন্তু ২০০৯

সালে এর বিপরীত রীতি লক্ষ্য করা গেল এবং তখন থেকেই মোট আয় বৃদ্ধির ৯৫ শতাংশই গিয়েছে শীর্ষ ১ শতাংশ মানুষের কাছে।

ক্রমবর্ধমান আয় ও সম্পদ বৈষম্যের কারণ একাধিক ও সূক্ষ্ম। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের অতিরিক্ত শিথিল মুদ্রানীতির জন্য যেসকল অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতি দেখা যাচ্ছে তার উপরেও এই দোষের কিছুটা ভাগ বর্তায়। ঋণাত্মক ইন্টারেস্ট রেট এবং কোয়ান্টিটেটিভ ইজিং নগদ অর্থের মালিকদের আর্থিক নির্যাতনের সম্মুখীন করেছে, সঞ্চয়কারকদের ক্ষতি করেছে, ঝুঁকিপূর্ণ আর্থিক সম্পদের ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধি ঘটিয়েছে যেগুলোর মালিকানা মূলত ধনী ব্যক্তিদের কাছে। স্থায়ী উপার্জনে কোন বৃদ্ধি না ঘটায় সবচেয়ে রক্ষণশীল পেনশন ফান্ডগুলোও ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদরূপে জমে আছে এবং ক্রমশ এর মূল্যবৃদ্ধি ঘটছে। কর্পোরেশনগুলো এইসব উদ্দীপক পদক্ষেপ হতে ব্যাপকভাবে লাভবান হয়েছে, কিন্তু তা শ্রমজীবী মানুষের ক্ষতির বিনিময়ে। কোম্পানিগুলো খরচ কমিয়েছে, অবকাঠামোগত উন্নয়নে বিনিয়োগ স্থগিত করেছে, অতি অল্প সুদের হারে ঋণ নিয়েছে এবং দুর্বল শ্রমবাজারের সুযোগ নিয়ে মজুরি বৃদ্ধি বন্ধ করেছে; এসবের ফলে মুনাফার হার বেড়ে হয়েছে রেকর্ড পরিমাণ।

কিন্তু প্রশ্ন হল, এখন কি আমরা একটি বিপরীত প্রথার দ্বারপ্রান্তে? এমএন্ডপি ৫০০ তাদের ২০০৯ সালের পতন অপেক্ষা ১৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে যা দুর্বল হতে থাকা গ্রোথ ডায়নামিকসে বেশ আকর্ষণীয় একটি অঙ্ক। ( শিলার আর্নিং ইনডেক্স ২০০৯ সালের ১৫ থেকে বেড়ে এখন ২৬ এ অবস্থান করছে) এখন এই দর পতনের ফলে ধনী আমেরিকানরা আগামী পর্বগুলোয় তাদের আর্থিক বিনিয়োগ থেকে উল্লেখযোগ্য মুনাফা ভোগ করতে পারবেন না।

একইসাথে আমরা বিগত কয়েকবছরে প্রথমবারের মতো শ্রমবাজারে অর্থবোধক মূল্যবৃদ্ধি লক্ষ্য করছি। বেকারত্বের হার কমে এখন ৫ শতাংশ হয়েছে যা ফেডারেল রিজার্ভ এর বর্তমান নন এক্সিলারেটিং ইনফ্লেশান রেট অফ আনএমপ্লয়মেন্ট (নাউরু) এর হিসাবকৃত হারের কিছু উপরে। যদিও প্রকৃত নাউরু পরিমাপ সম্ভবত আরও নিচে অবস্থান করছে, আমরা শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ হারের একটি ধীর পতন  লক্ষ্য করতে যাচ্ছি। ২০১৬ সালেও যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজার সুসংগঠিত করা প্রয়োজন হবে।

বাস্তব প্রেক্ষাপট হল “শ্রমবাজারে নেই, কিন্তু কাজ প্রয়োজন” এরকম মানুষের সংখ্যাও নভেম্বর মাসে ৪,১৬,০০০ কমে ৫.৬ মিলিয়ন এর কিছু উপরে অবস্থান করছে। ঐতিহাসিকভাবে এরূপ পরিবর্তন ক্রমবর্ধমান মজুরি চাপের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত থাকে। যার ফলে আমরা দেখতে পাই, প্রাইভেট নন ফার্ম পেরোলের প্রত্যেক কর্মচারীর প্রতিঘণ্টায় গড় বেতন বার্ষিক ২.৫ শতাংশ বেড়েছে, ২০০৯ সালের পর থেকে যা সর্বোচ্চ।

ফেডারেল রিজার্ভ যেহেতু আস্তে আস্তে সুদের হার বাড়াচ্ছে, যেসব মধ্যবিত্ত পরিবার তাদের কষ্টার্জিত সঞ্চয় ব্যাংকে রাখে তার এর বিপরীতে কিছু মুনাফা পাবে। কিন্তু যৌগিক সঞ্চয়ের ইতিবাচক প্রভাবসমূহ বিবেচনা করে এর দীর্ঘমেয়াদী প্রতিক্রিয়াসমূহ এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। ২০০৪ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যবর্তী শেষ সংকটপূর্ণ চক্রে গৃহপর্যায়ের সুদের আয় ২৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল। যদিও এবারে সম্ভাব্য মুনাফা অর্জন স্বল্প পরিমানে এবং ধীর গতিতে আসবে; ফেডের কড়াকড়ি ও দ্রুত পদক্ষেপের ফলে সঞ্চয়ের উপরে প্রদেয় মুনাফা গৃহপর্যায়ের আয়কে সঠিক পথেই রাখবে- সেটা হল বৃদ্ধির দিকে।

অবশ্যই নানাধরনের রাজনৈতিক সংস্কার উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় তাদের সম্ভাব্য ইতিবাচক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে বৈষম্যকে আরও বহুগুণে কমিয়ে আনতে পারে। কিন্তু একটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রাক্বালে

এই ধরণের পদক্ষেপের সামনে অনেক অন্তরায় রয়েছে, উদাহরণ হিসেবে বলা যায়- কর ব্যবস্থাপনাকে আরও গতিশীল করা প্রয়োজন। এর অর্থ হল, শ্রমজীবী মানুষের মজুরি বৃদ্ধিই সবচেয়ে আশু প্রভাব রাখবে। যদিও এর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যাবে কর্পোরেট আমেরিকার মুনাফা হ্রাসের মধ্য দিয়ে।

সুদের হার বৃদ্ধি ফিনান্সিয়াল মার্কেটের জন্য ফেডের নেয়া একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত এবং তা ইতিমধ্যেই বিশ্বজুড়ে সম্পদের বাজারে প্রাণবন্ত সময়ের সূচনা করেছে। বিনিয়োগকারীদের জন্য এটা চ্যালেঞ্জিং হলেও মূল অর্থনীতিতে এর সুপ্রভাব বিবেচনা করে আমাদের স্বস্তি পাওয়া উচিত।

যুক্তরাষ্ট্রে সামাজিক চুক্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যা আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। “আমেরিকান ড্রিম” এর স্বপ্ন প্রতিনিয়ত সাধ্যের বাইরে চলে যাওয়ায় ভোটারদের মাঝে যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে এর মাধ্যমেই তারা সেটার প্রকাশ ঘটাতে পারে। মজুরি এবং ভোক্তাদের ব্যায় সক্ষমতার ক্রমবৃদ্ধি ব্যাতিত কোন অর্থনৈতিক পুনর্লাভ প্রক্রিয়াই টিকে থাকবে না। ফেড এর মাঝেই হয়তো প্রয়োজনীয় গতিশীলতার সূচনাসংকেত দিয়েছে যা হবে বৈষম্য ধারার একটি বিপরীত প্রতিক্রিয়া। সেইসাথে সূচনাকে আরও গতিময় করে তোলার কাজটিও হয়তো এরই মাঝে সম্পন্ন হয়েছে।

অননূদিত প্রবন্ধটি পড়তে ক্লিক করুন: www.project-syndicate.org/commentary/fed-monetary-policy-reduce-inequality-by-alexander-friedman-2015-12