পাকিস্তানকে যে কাজটি করতে হবে

সপ্তাহ জুড়ে চলতে থাকা প্রকাশ্য বিতর্ক ও মতানৈক্য শেষ পর্যন্ত অচলাবস্থায় গিয়ে পৌঁছেছে।  পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সারতাজ আজিজ ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার সাথে তাঁর পূর্বনির্ধারিত আলোচনা বাতিল করেছেন। গত মাসে রাশিয়ার ইউফায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে  দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ ও নরেন্দ্র মোদি একটি যৌথ বিবৃতি দিয়েছিলেন যা পরবর্তী মাসগুলোতে ভারত-পাকিস্তান সংলাপের একটা প্যারামিটার নির্ধারণ করে দিয়েছিল। কিন্তু তা স্বত্বেও বৈঠকের এজেন্ডা নিয়ে দুদেশ একমত হতে পারেনি। অধিকাংশ সংবাদ সংস্থার ভাষ্য অনুযায়ী, পাকিস্তান চেয়েছিল ইউফাতে ঐক্যমতের ভিত্তিতে নির্ধারিত একমাত্র এজেন্ডা ‘টেররিজম’-এর সাথে সাথে কাশ্মীর ইস্যুও আলোচনার এজেণ্ডাতে অন্তর্ভুক্ত হোক। গত গ্রীষ্মে ভারত-পাকিস্তান সংলাপের আগে আগে পাকিস্তানি কর্মকর্তারা জম্মু-কাশ্মিরের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে বৈঠক এবং মোদী সরকার কর্তৃক তাদের সতর্কবার্তা জানানোর পর থেকে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়েছে। এখন ভারত আবার তাদের সেই সতর্কবার্তা (redline) পুনরায় মনে করিয়ে দিচ্ছে। নতুন দিল্লির পাকিস্তান হাইকমিশন তাদের এক সান্ধ্যকালীন ভোজে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। তাই এই সতর্কবার্তা ও ভোজ আমন্ত্রণের মধ্যখানে এক অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় ২২ আগস্ট ইস্যু করা তাদের এক বিবৃতিতে এনএসএ বৈঠক বাতিলের ঘোষণা দিয়ে বলেছে, এই আলোচনা ‘কোন কোন কাজে আসবে না, যদি তা হয় [ভারত কর্তৃক] আরোপিত দুটি শর্তের উপর ভিত্তি করে।’ পাকিস্তানের যুক্তি হল, ভারত ও পাকিস্তানের সংলাপে আলোচনা করার মত অনেক ইস্যুই আছে এবং এরকম একটি বৃহৎ পরিসরের গুরুত্বপূর্ণ সংলাপে ‘টেররিজম’ সবসময়ই একটা ইস্যু হিসেবে আলচিত হয়ে আসছে। ইসলামাবাদ মনে করে, বিবদমান বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে আওতাভুক্ত না করলে এই আলোচনা সামান্যই ফল বয়ে আনবে। দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে এরকম বিবদমান ইস্যু আছে অনেকগুলোই। নতুন দিল্লির অবস্থান হল, ‘সন্ত্রাস ও আলোচনা’ একসাথে চলতে পারে না। সংলাপ সম্পর্কিত ২২ আগস্ট অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ এই কথাই পুনর্বার স্মরণ করিয়ে দিলেন এবং জানিয়ে দিলেন যে, একটি পূর্ণাঙ্গ সংলাপের ধারাবাহিক অগ্রগতির পথে প্রথম পদক্ষেপ হতে হবে সন্ত্রাসবাদ প্রতিহত করা।

 

বৈঠকের একক এজেন্ডা কিংবা পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের বিচ্ছন্নতাবাদীদের সাথে সাক্ষ্যাৎ করা উচিত হয়েছে কিনা- এসব কচপচানি এক পাশে সরিয়ে রাখি। ভারত-পাকিস্তান এনএসএ সংলাপ বাতিল হয়ে যাওয়ার আরও বড় প্রেক্ষাপট আছে- প্রায় এক মাস আগে গত ২৭ জুলাই জঙ্গিরা ভারতীয় পাঞ্জাবের আন্তর্জাতিক সীমান্তের গুরুদাসপুরে আক্রমণ করেছে। ৫ আগস্ট আরেকটি আক্রমণ হয়েছে জম্মু-কাশ্মিরের জম্মু অঞ্চলের উধামপুরে। আক্রমণকারীদের একজন ধরা পড়েছে এবং সে জানিয়েছে তার নাম নাভিদ ইয়াকুব, (পাকিস্তানের) ফয়সালাবাদে তার বাড়ি এবং লস্কর-ই-তৈয়েবার সদস্য। এই দুটি ঘটনা আশঙ্কা তৈরি করেছিল যে, ভারত এনএসএ বৈঠক বাতিল করে দেবে। কিন্তু এসব আক্রমনের পরেও নতুন দিল্লি ইউফায় মোদী ও শরীফের করা প্রতিশ্রতি ভেঙ্গে দেয়নি।

এজেন্ডা নির্ধারণ এবং কাশ্মির সমস্যাসমূহ নিরসনের যথাযথ উপায় নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের একমত না হতে পারাটা সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক। কিন্তু এই ব্যপারে কোন ভুল নেই যে- গত দুই দশক ধরে পাকিস্তানের ভূখণ্ড থেকে ভারতের উপর জঙ্গি আক্রমনের ইতিহাস বিবেচনা করে এখন পাকিস্তানকেই এগিয়ে আসতে হবে।  এবং জটিল রাজনৈতিক বিষয়গুলো আলোচনার জন্য একটি ভীতিহীন পরিবেশ নিশ্চিত করার কাজটিও পাকিস্তানের উপরই বর্তায়। হ্যাঁ, পাকিস্তানিরাও জঙ্গিবাদের শিকার এবং তা নিয়ে কোন দ্বিমতও নেই। কিন্তু কিছু গোষ্ঠীর উপর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবিত নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের বাইরেও  সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধে রাষ্ট্র হিসেবে তাদের কিছু আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা আছে।  আজিজ তার বক্তব্যে পাকিস্তান-ভিত্তিক জঙ্গিবাদের প্রসঙ্গ তোলেননি। বরং, তারা সোভিয়েত স্টাইলের গুল-ছোঁড়াছুড়ি খেলা শুরু করে বেলুচিস্তানে কথিত ভারত-সংশ্লিষ্টতা নিয়ে একটি বক্তব্যকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। অভিযোগ করছে, পাকিস্তানের জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো সম্পর্কে অভিযোগের স্বপক্ষে ভারত কোন প্রমাণ হাজির করতে পারেনি।

পাকিস্তান তার ভূখণ্ড থেকে জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে প্রতিরোধ করার জন্য কি পদক্ষেপ নিয়েছে? পাকিস্তান সিলেক্টিভভাবে দেশের একটি অংশে নামমাত্র জঙ্গিবাদ-বিরোধী অভিযান পরিচালনা করছে। কিন্তু অন্যদিকে জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র ঘোষিত সন্ত্রাসী সংগঠন ও তার নেতা হাফিয সায়েদকে লাহোর ও করাচীর মত বড় শহরগুলোতে  প্রকাশ্যে পাবলিক র‍্যালি, ‘হিউম্যানিটারিয়ান’ কর্মকাণ্ড ও মুষ্টিভিক্ষা সংগ্রহ করার সুযোগ দিচ্ছে। ২০০৮ সালের মুম্বাই হামলায় অভিযুক্ত দুষ্কৃতিকারীদের বিচারকাজও এখনো সম্পন্ন হয়নি। বিচারকাজে চলছে অন্তহীন বিলম্ব, এমনকি এই বছর মুম্বাই হামলা পরিকল্পনাকারীদের একজনকে জামিনে মুক্তি দেয়া হয়েছে। জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র চিহ্নিত আরেকটি জঙ্গি সংগঠনও তাদের সিলেক্টিভ জঙ্গিবাদ-বিরোধী অভিযানের বাইরে থেকে যাচ্ছে। অথচ তালেবান নেতা মোল্লা ওমরের মৃত্যুর পর হাক্কানি-র একজন সদস্যই তালেবানদের নেতা পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। বিলম্বে হলেও ওবামা প্রশাসন এই সঙ্কট স্বীকার করে নিয়েছে। আপাতদৃষ্টে মনে হচ্ছে তারাও এই সনদ দিচ্ছে না যে, পাকিস্তানের জঙ্গিবাদ-বিরোধী অভিযান হাক্কানি নেটওয়ার্ককে ধ্বংস করে দিয়েছে। এগুলো শুধু সমস্যার মেদহীন রূপরেখা মাত্র। বরং এটা বলাই যথেষ্ট হবে যে, এসবের কোন কিছু দেখেই মনে হচ্ছে না যে একটি রাষ্ট্র তার ভূখণ্ডকে জঙ্গিবাদের থাবা থেকে মুক্ত করার জন্য সর্বতোভাবে যুদ্ধ করছে।

এ ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই যে, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার সম্পর্ক বিপদসংকুল। বর্তমান আট পয়েন্টের সংলাপ-কাঠামোর চেয়েও তাদের একটি সংলাপে এজেন্ডার তালিকা অনেক বড় হতে পারে। সত্যি কথা বলতে কি, হয়ত তাই হওয়া উচিত। কিন্তু পাকিস্তানকে অভিযোগ এড়িয়ে যাওয়া বন্ধ করতে হবে। জঙ্গিবাদ তার সমাজকে চিবিয়ে খাচ্ছে এবং প্রতিবেশীর সাথে শত্রুতা তৈরি করছে। (পাকিস্তানের সমস্যা শুধু ভারতের সাথে নয়। দুই সপ্তাহ আগে হতাশ প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি পাকিস্তানের সকল পক্ষকে আফগানিস্তানে হামলাকারী জঙ্গিদের দমন করার আহ্বান জানিয়েছেন)। কিন্তু এনএসএ বৈঠক বাতিল হয়ে যাওয়া নিয়ে অনুতাপের সুর থাকলেও ২৪ আগস্ট পাকিস্তানের ডন পত্রিকা আজিজকে এভাবে উদ্ধৃত করেছে- ‘মোদির ভারত এমন আচরণ করছে যেন তারা আঞ্চলিক সুপারপাওয়ার। আমরা পরমানু অস্ত্র-সজ্জিত জাতি এবং আমরা জানি কীভাবে নিজেদের রক্ষা করতে হয়।’ এই বক্তব্য শুনে কি মনে হয় যে একটি দেশ সমঝোতার ব্যাপারে নিবেদিত এবং দশকের পর দশক চলে আসা সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ করছে?  এটা পাকিস্তানেরই দায়িত্ব- তাদের সদিচ্ছার উপর ভারত ও সারা পৃথিবীর আস্থা ফিরিয়ে আনা। ভারতের সীমান্তে একের পর এক জঙ্গি হামলা চলতে দিয়ে এবং পরমানু অস্ত্র নিয়ে মেকি গর্জন করে তা কখনো সম্ভব নয়। জঙ্গিবাদ ও  সব ধরনের সন্ত্রাস প্রতিরোধ করাই হওয়া উচিত ইসলামাবাদের এক নম্বর কাজ।

অননূদিত প্রবন্ধটি পড়তে ক্লিক করুন: http://blogs.cfr.org/asia/2015/08/25/pakistan-you-have-one-job/?utm_source=feedburner&utm_medium=feed&utm_campaign=Feed%3A+AsiaUnbound%2FAAyres+%28Asia+Unbound+%C2%BB+Alyssa+Ayres%29