দক্ষিণ এশিয়ায় গণতান্ত্রিক পশ্চাদপদতা এবং আইএস সংশ্লিষ্ট জঙ্গিবাদের উত্থান (প্রথম ভাগ )

১৪ জানুয়ারি জাকার্তার একটি ব্যস্ততম শপিং ও অফিস পাড়া জঙ্গি হামলায় কেঁপে উঠেছে। বেলা এগারটার এই ঘটনায় একটি স্টারবাকস স্টোরে আত্মঘাতি বোমায় হামলাকারী একজনের দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে।  তারপর একদল হামলাকারী ওই এলাকা থেকে বিদেশীদের জিম্মি করে রাস্তা লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি  গুলি ছুঁড়তে থাকে এবং মোটরসাইকেলে চড়ে নিকটবর্তী একটি পুলিশ স্টেশনে গিয়ে সেখানে হামলা চালায়। বাকি জঙ্গিরা তারপর পুলিশের সাথে এক চলন্ত বন্দুক-বোমা যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। পাঁচ হামলাকারীসহ আটজনের মৃত্যু হয়।  হামলার কিছুক্ষণের মধ্যে এটা জানা যায় যে, এই হামলার সম্ভাব্য মূল হোতা বাহরুন নাইম নামের এক ইন্দোনেশীয় নাগরিক। তিনি ইসলামিক স্টেটের রাজধানি রাক্কায় থাকেন এবং ধারণা করা হচ্ছে সেখান থেকেই তিনি জাকার্তা হামলা পরিচালনা করেছেন।

যদিও এই হামলার আকস্মিকতা কিছু ইন্দোনেশীয়কে হতবাক করেছে, কিন্তু আইএস সমর্থিত জঙ্গিরা জাকার্তায় সহিংসতা তৈরি করেছে- এই ব্যাপারটি একেবারে অবিশ্বাস্য কোন ঘটনা ছিল না। কারণ, আইএসের সাথে যুক্ত জঙ্গিরা জাভা ও অন্যান্য দ্বীপে সেল খুলে কার্যক্রম পরিচালনা করছে – জাকার্তা হামলার ঠিক এক বছর আগে থেকে ইন্দোনেশিয়া পুলিশ ও ইন্টিলেজেন্স এরকম অনেক রিপোর্ট পেয়েছে। এই হামলার এক মাস আগে পুলিশ দ্বীপমালাজুড়ে উপর্যুপরি অভিযানে আইএসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশাল সংখ্যক সন্দেহভাজন জঙ্গীদের গ্রেফতার করেছে।  জঙ্গী গোষ্ঠীসমূহের উপর  ইন্দোনেশিয়ার শীর্ষস্থানীয় বিশ্লেষকদের একজন এবং ইন্সটিটিউট ফর পলিসি অ্যানালাইসিস অব কনফ্লিক্ট-এর বিশ্লেষক সিডনী জোন্স সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, দ্বীপমালাজুড়ে ‘কয়েক বছর ধরে ব্যর্থ চেষ্টার পর আইএস এখন ইন্দোনেশিয়ার জন্য  জঙ্গি হামলার হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।’ তাছাড়া ইন্দোনেশীয় সরকারের হিসেব অনুযায়ী, কয়েক শত ইন্দোনেশীয় নাগরিক  ইসলামিক স্টেট অধিকৃত সিরিয়া ও ইরাকে পাড়ি দিয়েছে এবং সেখান থেকে দেশে ফিরে এসেছে। ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া থেকে এত পরিমাণ লোকজন ইসলামিক স্টেট অধিকৃত এলাকায় জড়ো হয়েছে যে শুধু এই ভিজিটিং ইন্দোনেশীয় ও মালয়েশিয়ান জঙ্গিদের নিয়ে একটি বিগ্রেড খুলেছে আইএস ।

ইসলামিক স্টেট সংশ্লিষ্ট কিংবা তাদের দ্বারা অনুপ্রাণিত জঙ্গি গোষ্ঠীর হুমকি-জনিত সংকটের মুখোমুখি  ইন্দোনেশিয়া একা নয়। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার কিছু গোয়েন্দা সংস্থা আইএস অধিকৃত অঞ্চল ভ্রমণ করেছে এমন দক্ষিণ এশীয় ব্যক্তির সংখ্যা নির্ধারণ করেছে, যা ১,২০০ থেকে ১,৮০০ জন। সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রীর জনসমাবেশের বক্তৃতা থেকে জানা যায়, অত্যন্ত কার্যকর গোয়েন্দা নজরদারি থাকা স্বত্বেও নগররাষ্ট্র সিঙ্গাপুরেও অংশত ইসলামিক স্টেট দ্বারা অনুপ্রাণিত চরমপন্থিরা ঢুকে পড়েছে। তাছাড়া, আইএসের উত্থানের ফলে দক্ষিণ ফিলিপাইনে যারা দীর্ঘদিন যুদ্ধ করছে তাদের মত দক্ষিণ এশিয়ার কিছু পুরনো জঙ্গি গোষ্ঠীর পুনরুজ্জীবন ঘটেছে, যারা ২০১৪ ও ২০১৫ সালের মধ্যে প্রকাশ্যে আইএসের প্রতি তাদের আনুগত্য প্রকাশ করেছে। এই আনুগত্যের ঘোষণা কি পুরনো দলগুলো কর্তৃক নিজেদের আরও ভয়াবহ প্রমাণের জন্য সাজানো ঘটনা নাকি সত্যিই তাদের আইএস সংশ্লিষ্টতা আছে, তা এখনো অস্পষ্ট। কিন্তু এসব ঘোষণার ফলে সত্যিকারের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা আছে এমন গোষ্ঠী হিসেবে ইসলামিক স্টেটের ইমেজ আরও শক্তিশালী হয়।

যদিও ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, মায়ানমার, ব্রুনেই ও ইন্দোনেশিয়া- সবগুলো দক্ষিণ এশীয় রাষ্ট্রই জঙ্গিবাদের সমস্যায় আক্রান্ত, তাদের মধ্যে শুধু ইন্দোনেশিয়ারই প্রকৃতপক্ষে চরমপন্থা প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রস্তুতি আছে।   ১৯৯০ দশকের শেষ এবং এই শতকের শুরুর দিকে ইন্দোনেশিয়ার সরকারকে জঙ্গিবাদের উত্থানের মুখোমুখি হতে হয়েছিল, যখন অনেক সশস্ত্র ইন্দোনেশীয় আল-কায়েদা দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলো। ইন্দোনেশিয়ায় গণতন্ত্রের ক্রান্তিকালেও ইন্দোনেশিয়ার নিরাপত্তা সংস্থাগুলো সফলভাবে এই জঙ্গি সেলগুলোর মধ্যে ঢুকে পড়ে এবং অনেক সম্ভাব্য জঙ্গি হামলার পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দিতে সক্ষম হয়। তবে জোন্স যেমন ইঙ্গিত দিয়েছেন, গত দশকের এই জঙ্গি তৎপরতার ফলে বিভিন্ন জায়গায় কিছু চরমপন্থি নেটওয়ার্ক রয়ে যেতে পারে এবং আইএসের প্রতি সহানুভূতিশীল গোষ্ঠীগুলো এখন দ্বীপমালাজুড়ে সেগুলোকে আবার সক্রিয় করার চেষ্টা করতে পারে। এমনকি সামাজিক মাধ্যমগুলোতে ইসলামিক স্টেটের শক্তিশালী প্রচারণার ফলেও ইন্দোনেশিয়ার জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো পুনর্গঠিত হতে পারে।

তাছাড়া, দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ জুড়ে কর্তৃত্বপরায়ণ ও আধা-কর্তৃত্বপরায়ণ রাজনীতির অপশাসন চলছে, থাইল্যান্ডের কট্টর সেনা শাসন যার চূড়ান্ত উদাহরণ। তবে ইন্দোনেশিয়ার রাজনৈতিক ব্যবস্থা ক্রমশ পরিণত হচ্ছে এবং একটি সুসংহত ও অবশ্যম্ভাবীভাবে ফেডারেল গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক ব্যবস্থার এই অগ্রগতি এবং ইন্দোনেশিয়ার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসমূহের অগ্রগতির ফলে দেশটির চরমপন্থিদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় পুনর্বাসনের জন্য অনেকগুলো উপায় তৈরি হচ্ছে। ফলে, বৃহত্তর জনগণের কাছে জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর আবেদন কমে যাচ্ছে এবং পুলিশের পক্ষে সহিংসতার পরিকল্পনা করছে এমন অল্পসংখ্যক চরমপন্থিদের চিহ্নিত করা ও গ্রেফতার করা সহজতর হয়েছে। পরবর্তী পোস্টে আমি দক্ষিণ এশিয়ার দেশসমূহে গণতান্ত্রিক পশ্চাদপদতা কীভাবে জঙ্গিবাদের উত্থানে সহায়তা করে তা ব্যাখ্যা করবো।

অননূদিত প্রবন্ধটি পড়তে ক্লিক করুন: http://blogs.cfr.org/asia/2016/02/02/southeast-asias-democratic-regression-and-the-rise-of-islamic-state-linked-militants/

You might also be interested in