দক্ষিণ এশিয়ায় গণতান্ত্রিক পশ্চাদপদতা এবং আইএস সংশ্লিষ্ট জঙ্গিবাদের উত্থান (দ্বিতীয় ভাগ)

জেমাহ ইসলামিয়ার মত জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে জাকার্তার প্রাথমিক সাফল্যের পর একুশ শতকের প্রথম দশকের শেষ এবং দ্বিতীয় দশকের শুরুর দিকে এক নতুন প্রজন্মের ইসলামবাদীদের অভ্যুদয় ঘটতে শুরু করে। তাদের কেউ কেউ ১৯৯০ ও ২০০০ দশকের জঙ্গিদের প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষিত, কেউ ১৯৯০ ও ২০০০ দশকের জঙ্গি পরিকল্পনা ও হামলায় অংশগ্রহণ করেছে কিংবা জেমাহ ইসলামিয়াহ ও অন্যান্য জঙ্গিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পুরো অঞ্চল জুড়ে পরিচালিত অভিযান থেকে বেঁচে গেছে। জোন্স জানিয়েছেন, ২০১৬ জানুয়ারির ঘটনায় প্রধানত জঙ্গিদের ‘অদক্ষতা’র ফলে ইন্দোনেশিয়া কর্তৃপক্ষ রক্ষা পেয়েছে। কিন্তু যদি চরমপন্থি গোষ্ঠীগুলো এভাবে বেড়ে উঠে এবং সিরিয়ায় প্রশিক্ষিত হয়, তাহলে বিধ্বংসী বোমা ও বন্দুক হামলা করার ক্ষেত্রে তারা আরও  নিখুঁত হয়ে উঠবে।

আত্মঘোষিত ইসলামিক স্টেট তরুণ চরমপন্থিদের নতুন করে প্রণোদনা জুগিয়েছে। যেহেতু এই তরুণদের কেউ কেউ সিরিয়া ও ইরাকে যেতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে, সুতরাং আইএস ক্রমেই দক্ষিণ এশিয়ার তরুণ চরমপন্থিদের প্রশিক্ষণস্থল এবং সারাবিশ্বের সহমর্মী জঙ্গিদের সাথে মেলামেশার করার এক নতুন কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। কিছু কিছু কারণে দক্ষিণ এশিয়ার চরমপন্থিদের জন্য সিরিয়া ও ইরাকে আইএসের যুদ্ধ ১৯৮০-র দশকের আফগানিস্তান যুদ্ধের আধুনিক ভার্সন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যেখানে একজন বিদেশী আসবেন, যুদ্ধের ক্রিয়া-কৌশল এবং অন্য চরমপন্থিদের সাথে মেলামেশা করতে শিখবেন।  তাছাড়া, ১৯৮০-র দশকের মুজাহিদদের  আফগানিস্তান যুদ্ধে যোগ দেয়ার চেয়ে দক্ষিণ এশিয়ার চরমপন্থিদের জন্য সিরিয়া ও ইরাকে ইসলামিক স্টেটের যুদ্ধে যোগ দেয়া অনেক বেশী সহজ হয়ে উঠেছে।  সামাজিক মাধ্যমের কল্যাণে দক্ষিণ এশীয় তরুণরা আশির দশকের মুজাহিদদের তুলনায় অনেক সহজেই ইসলামিক স্টেটের  জীবনযাত্রা সম্পর্কে অবহিত হতে এবং আইএস-অধিকৃত অঞ্চলে যাওয়ার পরিকল্পনা করতে পারেন। তাছাড়া এটা অনুমান করা যায় যে, অন্যান্য দেশের চরমপন্থিদের আরও নৃশংস উপায় অবলম্বনের পথে উৎসাহিত করার জন্য পরিকল্পিতভাবেই ইসলামিক স্টেট তাদের নাটকীয় নৃশংসতার ঘটনাবলী বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছে।

কোন কোন আইএস নেতা দক্ষিণ এশিয়ানদের নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ দেয়ার কিছু আপাত সুবিধাও দেখতে পান। শেষ পর্যন্ত ইন্দোনেশিয়া পৃথিবীর বৃহত্তম মুসলিম জনগোষ্ঠীর দেশ, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া পৃথিবীর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দুটি মডারেট মুসলিম-প্রধান রাষ্ট্র। এদের সাথে আবার যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, চীন ও অন্যান্য দেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে, যারা হয় ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে জড়িত  কিংবা অন্য কোনভাবে ইসলামিক স্টেটের নেতাদের হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। গত চার বছরে ইসলামিক স্টেট একই ভাষাভাষী ইন্দোনেশীয় ও মালয়েশিয়ানদের জন্য শুধু আলাদা ব্রিগেডই তৈরি করেনি, বরং দক্ষিণ এশিয়ানদের নিয়োগ দেয়ার লক্ষ্যে এবং দক্ষিণ এশিয়ার নারীদের ইসলামিক স্টেটে গিয়ে যোদ্ধাদের বিয়ে করার জন্য উৎসাহিত করতে সামাজিক মাধ্যম ও ভিডিও বার্তার মাধ্যমে ব্যাপক  প্রচারণা চালিয়েছে। জোন্সের প্রতিষ্ঠান ইন্সটিটিউট ফর পলিসি অ্যানালাইসিস অব কনফ্লীক্ট-এর হিসেব অনুযায়ী, ইন্দোনেশিয়া থেকে যারা ইসলামিক স্টেট-অধিকৃত অঞ্চলে গিয়েছে, তাদের মধ্যে চল্লিশ শতাংশ নারী ও শিশু।

ইসলামিক স্টেটের এই ক্রমবর্ধমান প্রচারণার পাশাপাশি আরও কয়েকটি কারণে দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোতে চরমপন্থার উত্থান ঘটতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে- সামাজিক মাধ্যম ও ইন্টারনেট  সংযোগের বিস্তৃতি; হোয়াটসঅ্যাপ ও জেল্ল জাতীয় অ্যাপসের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার যেগুলোতে ট্র্যাক করা কর্তৃপক্ষের জন্য তুলনামূলক কঠিন; দক্ষিণ এশিয়ায় বিদেশী অর্থায়নে তৈরি ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিস্তার; এবং আইএসের বিস্তারে কিছু দক্ষিণ এশীয় নেতার প্রতিক্রিয়া, যা প্রায় সুস্পষ্ট ‘ইসলামোফোবিয়া’ বা ‘ইসলামভীতি’তে রূপান্তরিত হয়।

মায়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া ও এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশে রাজনৈতিক স্বাধীনতার অভাবই সম্ভবত জঙ্গিবাদের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি। একসময় উন্নয়নশীল রাষ্ট্রসমূহের জন্য গণতন্ত্রের আলোকবর্তিকা হিসেবে স্বীকৃত অধিকাংশ দক্ষিণ এশীয় রাষ্ট্র ২০০০- দশকের শেষ দিক থেকে গণতান্ত্রিক সংকোচনের পথে চলেছে। ফ্রিডম হাউজ ২০০৯ সালে প্রকাশিত তাদের রিপোর্ট অন গ্লোবাল ফ্রিডম-এ ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং পূর্ব তিমুরকে ‘অংশত স্বাধীন’ জাতি হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে, যেখানে শুধু ইন্দোনেশিয়া ‘ফ্রি’ বা ‘স্বাধীন’ তালিকাভুক্ত হয়েছে। অথচ বিশ বছর আগে এই অঞ্চল থেকে শুধু  ফিলিপাইনকে ‘অংশত স্বাধীন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিলো, অন্য দেশগুলো ছিল ‘নট ফ্রি’ বা ‘স্বাধীন নয়’ তালিকাভুক্ত এবং পূর্ব তিমুর তখনো স্বাধীন দেশ হিসেবে জন্ম নেয়নি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, পুরো ৯০-র দশক এবং ২০০০-র দশকের অধিকাংশ সময় জুড়ে মনে হচ্ছিল থাইল্যান্ড তার স্বৈর হস্তক্ষেপের পর্ব থেকে বেরিয়ে আসবে; একের পর এক থাই সেনাবাহিনীর কমান্ডার এসে  জোর গলায় বলে গেছেন, ক্যু-র কাল শেষ হল এবং সশস্ত্র বাহিনী নির্বাচিত সিভিলিয়ান মন্ত্রীদের দ্বারা পরিচালিত একটি সাধারণ সেনাবাহিনী হিসেবে কাজ করবে। ১৯৯৭ সালে থাইল্যান্ড একটি প্রগতিশীল সংবিধান পাশ করে এবং নব্বই দশক এবং গত দশকে দেশটিতে অনেকগুলো স্বচ্ছ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

অন্যদিকে, মালয়েশিয়ায় এই শতকের প্রথম দশকে ও চলমান দশকের শুরুতে  দুই দল-নির্ভর   প্রতিযোগিতামূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা বিকাশিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কম্বোডিয়ায় ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিরোধী জোটের অপ্রত্যাশিত সুবিধা অর্জনের ফলে বিরোধী রাজনীতিবিদগণ এবং দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী হান সেনের মধ্যে একটা সংক্ষিপ্ত সমঝোতা পর্ব তৈরি হয়েছে।

আজ খুব কম মানুষই দক্ষিণ এশিয়ার গণতন্ত্রকে রাজনৈতিক স্বাধীনতার দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপিত করবেন। একবিংশ শতকের শুরু থেকে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে থাইল্যান্ড, যার চূড়ান্ত পরিণতি হয়েছে ২০১৪ মে’র সামরিক অভ্যুত্থান, গত এক দশকের কম সময়ে দেশটিতে দ্বিতীয় অভ্যুত্থানের ঘটনা এটি। এখনো থাইল্যান্ড শাসন করছে সামরিক জান্তা। ২০১৭ সালে নির্বাচন হলেও জান্তা শাসনামলে রচিত থাইল্যান্ডের নতুন সংবিধান নাটকীয়ভাবে গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের বিকাশকে ব্যহত করবে। ২০১৫ সালে হান সেনের সরকার বিরোধী দলের সাথে দীর্ঘদিনের শত্রুতার সম্পর্কের ইতি টেনেছে ।

কম্বোডিয়ার সরকার বিরোধীদলীয় নেতা স্যাম রেইন্সিকে ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত করে  তাকে নির্বাসনে যেতে বাধ্য করেছে এবং স্পষ্টত সরকার পক্ষের পৃষ্ঠপোষকতায় এক দল লোক কর্তৃক সংসদ ভবনের বাইরে বিরোধী দলের সদস্যদের উপর আক্রমণের ঘটনায় কম্বোডিয়ান পুলিশ কোন পদক্ষেপ নেয়নি। মালয়েশিয়ায়ও একই গল্পের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। ২০১৩ সালের সাধারণ নির্বাচনে স্বল্প ব্যবধানে জয়ী হওয়ার পর থেকে ক্ষমতাসীন জোট সরকার নির্বাচনে অসদুপায় অবলম্বন ও ভোট কারচুপির অভিযোগে বিরোধী দলের প্রধান আনওয়ার ইব্রাহিমকে জেলে পুরে রেখেছে এবং অন্যান্য বিরোধী রাজনীতিবিদ ও সিভিল সোসাইটি কর্মীদের পর্যুদস্ত করার জন্য নতুন একটি আইনের অপব্যবহার শুরু করেছে।

মায়ানমারে ২০১১-১২ সালের পর থেকে মুসলমানরা নৃশংস সহিংসতার শিকার হচ্ছে। বিভিন্ন গ্যাং ও আধা-সামরিক  সংগঠনগুলো একরকম রাষ্ট্রীয় ছত্রছায়ায় পশ্চিম মায়ানমার ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মুসলমান সম্প্রদায়ের উপর একের পর এক আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ১৩০,০০০ জনেরও বেশি মানুষ তাদের বাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন কিংবা আভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষদের ক্যাম্পে গিয়ে পচে মরছেন, যে ক্যাম্পগুলো শরণার্থীদের সহায়তা সেন্টারের পরিবর্তে ইন্টার্নমেন্ট ক্যাম্পের ভূমিকা পালন করছে।

দক্ষিণ থাইল্যান্ডে ক্রমবর্ধমান স্বৈর শাসনের ফলে জনগণ থাই রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং ফলে জঙ্গি দলগুলোর রিক্রুইটমেন্ট প্রক্রিয়াকে আরও সহজতর করে তুলেছে। জঙ্গিদের সদস্য সংগ্রহ প্রক্রিয়ার উপর করা দক্ষিণ থাইল্যান্ডের অস্থিরতারর উপর বিশেষজ্ঞ এবং দি ন্যাশন পত্রিকার লেখক ডন পাঠানের এক গবেষণায় তা উঠে এসেছে। ২০১৪ মে’র অভ্যুত্থানের আগে সর্বশেষ জনপ্রিয়ভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ইনলাক সিনাওয়াত্রার সরকার দক্ষিণাঞ্চলের জঙ্গিদের সাথে শান্তি আলোচনা শুরু করার উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর থাই সেনাবাহিনী যথারীতি আলোচনার পথ বন্ধ করে দেয়। ২০১৫ সালের শেষ দিকে এবং ২০১৬  সালের শুরুতে দক্ষিনের বিদ্রোহীদের কয়েকজন প্রতিনিধি পুনরায় আলোচনা শুরু করার জন্য সেনাবাহিনীর মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন। কিন্তু এসব বৈঠক এখনো পর্যন্ত কোন দৃশ্যমান ফল বয়ে আনতে পারেনি।

মালয়েশিয়ায় সরকারের ক্রমবর্ধমান নিষ্পেষণ এবং নিজেদের ইসলামভাবাপন্ন হিসেবে প্রমাণ করার খায়েস চরম্পন্থার উত্থানে জ্বালানি হিসেবে কাজ করছে। মালয়েশিয়ার সরকার শুধু বিরোধী মত দলনের জন্য আইন প্রণয়ন করে ক্ষান্ত দেয়নি, বরং মালয় জনগোষ্ঠীর লোকদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকার দেয়া এবং এথনিক ভারতীয় ও এথনিক চাইনিজদের সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাহীন (disempower) করার জন্য সরকারি ক্ষমতা প্রয়োগ করছে। মালয়েশিয়ার নেতারাও ক্রমবর্ধমানভাবে তাদের বক্তব্যে এই সুর তোলার চেষ্টা করছেন যে, মালয়েশিয়া শুধু মালয় মুসলমানদের রাষ্ট্র এবং অমুসলিম এথনিক সংখ্যালঘুদের দোসর চিহ্নিত করে বিরোধী নেতাদের পর্যুদস্ত করার চেষ্টা করছেন। ফলে,  মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব তুন রাজাক একদিকে জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে মডারেট মুসলমানদের ভূমিকা সম্পর্কে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বেশ সরব, অন্যদিকে তার সরকার দেশ পরিচালনায় মালয় মুসলিম জাতীয়তাবাদীদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অত্যধিক জোর প্রয়োগ করার সুযোগ করে দিচ্ছে। একই সাথে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ, অলাভজনক প্রতিষ্ঠান এবং স্বাধীন গণমাধ্যমের কার্যক্রমের উপর সরকার যে নিষ্পেষণ চালাচ্ছে, তার ফলে মালয়েশিয়ান, এমনকি ইসলামবাদীদের জন্যও, জনগুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয়ে শান্তিপূর্ণভাবে অংশগ্রহণ করার সুযোগ সীমিত হয়ে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক নীতিমালায় মানুষের ধর্মবিশ্বাস ও আত্মপরিচয়কে গুলিয়ে ফেলার ফলে ধর্মই এখন মালয়েশিয়ানদের আত্মপরিচয়ের কেন্দ্রে স্থাপিত হয়েছে। অ্যানালাইসিস ফর নিউ মেন্ডালা-য় পেনাং ইন্সটিটিউটের বিশ্লেষক কক হীন অই লিখেছেন, ‘আরও বেশি বেশি মালয়েশিয়ানরা নিজেদের প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হিসেবে নিজেদের মুসলমান হিসেবে চিহ্নিত করছেন। (২০১৫ সালে পরিচালিত) একটি জরিপে মারদেকা সেন্টার দেখিয়েছে যে, ৬০% মালয় নিজেদের প্রথমত মুসলমান মনে করেন, ২৭% নিজেদের মালয়েশিয়ান এবং মাত্র ৬% নিজেদের প্রথমত মালয় বলে মনে করেন।’

.তবে হ্যাঁ, দক্ষিণ এশিয়ায় গনতন্ত্রায়ন প্রক্রিয়ার এই ব্যর্থতাই শুধু ইসলামি চরমপন্থা বিকাশের একমাত্র কারণ নয়। বরং, এই ব্যর্থতা অনেক বিচিত্র ধরনের কট্টরপন্থি গোষ্ঠীর উত্থান ঘটিয়েছে যারা রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের আইনি ও সাংবিধানিক সমাধানে ন্যুনতম আগ্রহ দেখায়। থাইল্যান্ডের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া থমকে যাওয়ার ফলে সশস্ত্র বৌদ্ধ সংগঠনের উদ্ভব হয়েছে, যাদের কেউ কেউ বৌদ্ধ ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম করার জন্য চাপ প্রয়োগ করছে। হার্ডলাইন, কনজারভেটিভ, রয়ালিস্ট- বিভিন্ন ধরনের গোষ্ঠীকে সড়কে সমাবেশ করতে দেখা গেছে । ২০১৩ সালের শেষ দিকে এবং ২০১৪ সালের শুরুতে রয়ালিস্ট দলের সমাবেশকারিরা, যাদের অনেকে সশস্ত্র বৌদ্ধ সংগঠনের সাথেও যুক্ত,  মিছিল- সমাবেশ করে ব্যাংকককে অচল করে দিয়েছিল; পরিকল্পিত সংসদীয় নির্বাচন বানচাল হয়েছে এবং চূড়ান্ত পরিণতিতে ঘটে ২০১৪ মে’র অভ্যুত্থান। (২০১৩-১৪ সালের প্রতিবাদের সময় অনেক রয়ালিস্ট প্রকাশ্যে দরিদ্র থাইদের জন্য ফ্রাঞ্চাইজ প্রথা উঠিয়ে দেয়া/ নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনার দাবি করেছে।) মায়ানমারে কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনের শেষে রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রে সৃষ্ট শূন্যস্থান এবং অসম্পূর্ণ গনতন্ত্রায়নের ফলে র‍্যাডিক্যাল বুদ্ধিস্ট জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীসমূহ ক্ষমতায় আরোহণ করার সুযোগ পেয়েছে। কিছু নবসৃষ্ট র‍্যাডিকেল বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদী গ্রুপের সাথে কট্টর মুসলিম-বিরোধী রাজনৈতিক দলের সাথে যোগসাজশের অভিযোগ আছে, অন্য গ্রুপগুলোর বিরুদ্ধেও রোহিঙ্গা ও মায়ানমারের অন্যান্য মুসলমানদের উপর হামলা চালিয়েছে এমন গ্যাং ও আধা-সামরিক বাহিনীর সাথে যোগসাজশের অভিযোগ আছে।

 

প্রধানত অর্থনৈতিক বৈষম্যের ফলে এসব শক্তিশালী চরমপন্থি দলগুলোর সৃষ্টি হয়েছে, তা সত্য নয়। দক্ষিণ থাইল্যান্ডের তিনটি প্রদেশের কোনোটি দেশের সবচেয়ে দরিদ্র প্রদেশ নয় এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দরিদ্রতম অঞ্চলগুলোর তুলনায় অনেক উন্নত। এমনকি, থাইল্যান্ডের সবচেয়ে দক্ষিনের প্রদেশগুলো দেশটির গ্রামীণ ও খরা-পীড়িত উত্তরপূর্বের কিছু অঞ্চলের তুলনায় অনেক ধনী।  চরমপন্থি রয়ালিস্ট যে গ্রুপটি ইয়াংলিক সরকারের পতনে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে তার নেতৃত্বে ছিল মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত থাই নাগরিকরা, এমনকি তাদের মধ্যে দেশের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের কেউ কেউও ছিলেন। আবার, মালয়েশিয়ার কট্টরপন্থী মালয় মুসলিম গোষ্ঠী এবং চিহ্নিত সশস্ত্র ইসলামিস্ট সেলগুলো সাধারণত সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র শ্রেণিকে আকর্ষণ করে না। বরং, মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মালয়, যারা নগরায়ন ও আরও বেশি উন্মুক্ত রাজনীতি মালয়দের রাষ্ট্রীয় সুবিধা থেকে বঞ্চিত করবে বলে আশঙ্কা করে, তাদেরকেই বেশি প্রভাবিত করতে পারে।

অন্যদিকে, ইন্দোনেশিয়ায় গত এক দশকে রাজনৈতিক নিষ্পেষণের ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু এখানে দীর্ঘ গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রক্রিয়া চরমপন্থার আবেদন বৃদ্ধি করেছে। ফিলিফাইন ছাড়া দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার এই একটিমাত্র দেশই  ধারাবাহিকভাবে উন্নয়নশীল বিশ্বে ‘সবচেয়ে স্বাধীন’ দেশ হিসেবে ফ্রিডম হাউজের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে আসছে।  দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দুই বছরে প্রেসিডেন্ট জকো উইদোদো গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশ ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহ আরও শক্তিশালী করে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। যদিও দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রে  তিনি খানিকটা কম আগ্রাসী, যেমনটা তার অনেক সমর্থক তাঁর কাছে প্রত্যাশা করেছিলেন। (বিশেষত, জকভি স্ট্যাস্টিস্ট ও অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদী পলিসি প্রেসক্রিপশনে ফিরে গিয়েছেন বলে মনে হচ্ছে।) তারপরও প্রেসিডেন্ট জকভি আঞ্চলিক ও স্থানীয় নির্বাচন ব্যবস্থা চালিয়ে যাচ্ছেন, বিখ্যাত দুর্নীতিবিরোধী কর্মীদের তাঁর মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়েছেন এবং প্রায় রাজাসুলভ একটি পদ থেকে প্রেসিডেন্টের ইমেজকে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিয়োজিত পাবলিক সার্ভেন্টে রূপান্তরিত করেছেন।

অন্যদিকে, গত দশকের মাঝামাঝি সময়ে ইন্দোনেশিয়ার আইন প্রণয়নকারী সংস্থা ও সরকারি বাজেটের বিকেন্দ্রীকরণের ফলে স্থানীয় রাজনীতিবিদ ও জনগণের ব্যাপক ক্ষমতায়ন ঘটেছে। বিকেন্দ্রীকরণের ফলে মদ বিক্রি, জুয়া নিয়ন্ত্রণ ও অন্যান্য যেসব বিষয়ে ইসলামিক দল ও সশস্ত্র ইসলামিস্ট গ্রুপগুলো গুরুত্ব দেয়ার চেষ্টা করে সেসব বিষয়ে কিছুটা পার্থক্য দেখা দিয়েছে। (মাঝে মাঝে এসব স্থানীয় আইন পাপুউ এলাকার খ্রিস্টান প্রধান এলাকায় মুসলমানদের বদলে নিবেদিত খ্রিস্টানদের স্বার্থ রক্ষা করে।) এবং বিকেন্দ্রীকরণ ও গণতান্ত্রিক সংহতিকরণের ফলে নতুন প্রজন্মের জঙ্গিদের বিরুদ্ধে ইন্দনেশিয়ার প্রতিরোধের ক্ষেত্রে অনেক তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

বিকেন্দ্রীকরণ জাতীয় পর্যায়ে ইসলামিক দল ও সশস্ত্র গ্রুপগুলোর আবেদন কমাতে সহায়তা করেছে। ধর্মপ্রাণ ভোটাররা তাদের অনেক দাবী স্থানীয় আইন দ্বারা পূরণ করতে পারছেন। ফলে জাতীয়তাবাদি ইসলামিক দলগুলো কিংবা সহিংসতার মাধ্যমে জোরপূর্বক পরিবর্তনের শপথ গ্রহণ করেছে এমন সশস্ত্র গ্রুপগুলোর আবেদন কমে যায়। এখানে মত প্রকাশের স্বাধীনতা বলতে বোঝায়, ইন্দোনেশিয়ানরা  কঠোরতর ইসলামিক আইন প্রয়োগের জন্য প্রকাশ্যে দাবী জানাবে, কিন্তু সরকার তাদের কণ্ঠ রোধ করবে না।

ইন্দোনেশিয়ার রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা এবং সশস্ত্র দলগুলোর বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্টের জনসমাবেশে বক্তৃতা ইন্দনেশিয়ান জনগণের উপর একটা প্রভাব ফেলেছে। পিউ রিসার্চ সেন্টার পরিচালিত ২০১৫ সালের নভেম্বরের এক জরিপে দেখা যায়, ৮০% ইন্দোনেশিয়ান ইসলামিক স্টেটের ব্যাপারে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন, যে সংখ্যা মালয়েশিয়া, তুরস্ক, পাকিস্তানসহ অন্যান্য রাষ্ট্রের তুলনায় অনেক বেশি। মালয়েশিয়ায় যেমন একই জরিপে মাত্র ৬০% নাগরিক ইসলামিক স্টেটের ব্যপারে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন।  তাছাড়া বৃহত্তর ইন্দোনেশিয়ান ধর্মীয় দলগুলো জঙ্গিবাদবিরোধী প্রচারণায় তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ৫ কোটি সদস্যের ইন্দোনেশিয়ার একটি ধর্মীয় সংগঠন নাহ্লাদাতুল উলামা সহিষ্ণু ইসলামের পক্ষে এক ধরণের উন্নত পাবলিক ক্যাম্পেইন তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। এই ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়ানদের গুরুত্ব দিয়ে বোঝানো হচ্ছে যে ইসলামিক স্টেটের ইসলাম ইন্দোনেশিয়ার ইসলামিক প্রথা থেকে কতটা দূরবর্তী।

এরকম জাতীয় প্রচারাভিযান ইন্দোনেশিয়ান সিকিউরিটি ফোর্সগুলোর কাজেও অনেক সহায়তা করছে, কারণ সাধারণ মানুষের কাছ থেকে পাওয়া সূত্রের উপর তারা অনেকটা নির্ভর করে থাকে। যদিও জানুয়ারিতে জঙ্গিরা হামলা চালাতে সক্ষম হয়েছে, কিন্তু ২০১৫ ডিসেম্বরেই ইন্দোনেশিয়ার সিকিউরিটি ফোর্স পাঁচটি বড় শহরে অভিযান চালিয়ে ইসলামিক স্টেট এবং বড় ধরণের হামলার পরিকল্পনার সাথে জড়িত অনেক ব্যক্তিদের গ্রেফতার করেছে।

তবে এটা ঠিক, ইন্দোনেশিয়া জঙ্গি গ্রুপগুলোকে নির্মূল করতে পারেনি। ইন্দোনেশিয়া যে কোন মুহূর্তে জঙ্গি হামলার কবলে পরার আশঙ্কা আছে, যদিও সরকার ইসলামিস্টদের বিরুদ্ধে জনমত পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছে এবং বহু জঙ্গি সেলকে ধ্বংস করেছে। দ্বীপপুঞ্জের স্বছিদ্র সীমান্ত, দুর্নীতিপরায়ণ ইমিগ্রেশন চেকপয়েন্ট এবং মুক্ত সমাজ- এসব কিছুই জঙ্গি গোষ্ঠীর অনুপ্রবেশ এবং নির্বিঘ্নে কাজ করে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে পারে। যদিও ইন্দোনেশিয়ার মুক্ত সমাজ এই আশঙ্কা উড়িয়ে দিতে ভূমিকা রেখেছে যে, ইসলামিক স্টেট দ্বারা অনুপ্রাণিত কোন জঙ্গি গোষ্ঠী বড় পরিমাণ অনুসারী সংগ্রহ করতে পারবে।

অননূদিত প্রবন্ধটি পড়তে ক্লিক করুন: http://blogs.cfr.org/asia/2016/02/04/democratic-regression-and-the-rise-of-islamic-state-linked-militants-in-southeast-asia/

You might also be interested in