দক্ষিণ এশিয়ায় গণতান্ত্রিক পশ্চাদপদতা এবং আইএস সংশ্লিষ্ট জঙ্গিবাদের উত্থান (তৃতীয় ভাগ)

দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার এই দশকব্যাপী গণতান্ত্রিক নিষ্পেষণ, যা আমি গত ব্লগ পোস্টে পর্যবেক্ষণ করেছি, আশঙ্কাজনক বৈশ্বিক নিষ্পেষণের প্রতিফলনও বটে। ফ্রিডম হাউজের ওয়ার্ল্ড রিপোর্ট, যা বিশ্বব্যাপী স্বাধীনতার বিস্তৃতি কিংবা লঙ্ঘন পরিমাপ করে, অনুযায়ী গত দশ বছর ধরেই বৈশ্বিক রাজনৈতিক স্বাধীনতার অবনতি ঘটছে। ফ্রিডম হাউজের ফ্রিডম ইন দি ওয়ার্ল্ড-এর ২০১৬ সংস্করণে দেখা যায়, আগের বছরের তুলনায় এই বছর সত্তরটিরও বেশি দেশে রাজনৈতিক স্বাধীনতার অবনতি ঘটেছে।

গণতান্ত্রিক পশ্চাদ্গামিতার প্রভাব বিস্তৃত ও তাৎপর্যপূর্ণ। মানবিক পর্যায়ে, গনতন্ত্রের পশ্চাদ্গামিতা বলতে বোঝায়, আগের দশকের তুলনায় এখন পৃথিবীর বেশি সংখ্যক মানুষ এমন সরকারের অধীনে বাস করছেন যা তাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকারকে সীমিত করে দিচ্ছে। মানব উন্নয়ন সূচকে দেখা গেছে,  কর্তৃত্বপরায়ণ সরকারের অধীনে বসবাসকারী মানুষের জীবন স্বল্পায়ু এবং কম স্বাস্থ্যকর হয়। যুগ যুগ ধরে এটা প্রমাণিত হয়েছে যে প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল ও শিশু মৃত্যুহার ইত্যাদি উন্নয়ন সূচকে অগ্রগতির ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অধিকতর কার্যকর। বৈশ্বিক গণতান্ত্রিক পশ্চাদ্গামিতা আরও বেশি আন্তঃদেশীয় সংঘর্ষের দিকে ঠেলে দেবে।

তাছাড়া, রাজনৈতিক নিষ্পেষণের ফলে চরমপন্থার উত্থান হতে পারে,  ইসলামিক স্টেট কিংবা মায়ানমারের বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদী চরমপন্থি গ্রুপ বা থাইল্যান্ডের হার্ডলাইন রয়ালিস্ট গ্রুপগুলোর মত অন্যান্য চরমপন্থি দলগুলোর সাথে যুক্ত বলে স্বঘোষিত গ্রুপগুলোর জন্য সহায়ক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। ইতোমধ্যে ইসলামিক স্টেটের সাথে সংশ্লিষ্ট দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বাইরের গ্রুপগুলো এমন দেশগুলোতে তাদের অবস্থান তৈরিতে অনেকটা অগ্রগামী হয়েছে যেখানে রাজনৈতিক স্বাধীনতা লঙ্ঘিত হয়েছে, কিংবা রাজনৈতিক স্বাধীনতা কখনো পুরোপুরি বিকশিত হয়নি এবং যেখানে মানুষজন মনে করে নিয়মনীতির মধ্যে থেকে তারা কোন রাজনৈতিক পরিবর্তন সাধন করতে পারবে না। যেমন মিশরের কথা বলা যায় যেখানে সামরিক সরকার মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতাদের কারাগারে পুরে রেখেছে এবং অন্যান্য উদারপন্থি রাজনৈতিক গ্রুপগুলোকে দমন করেছে। ফলে সেখানকার ইসলামিস্টরা ক্রমান্বয়ে সহিংসতার দিকে ঝুকে পড়ছে; সিনাই এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলে পুলিশ, সেনাবাহিনী ও সরকারকে লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে।  লিবিয়ার কথা ধরা যাক, সেখানে গাদ্দাফির স্বৈরশাসনের পতনের পর একধরণের বিশৃঙ্খল রাজনৈতিক পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে এবং ফলে ইসলামিক স্টেট সেখানে একটা শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। এখন  সাব-সাহারান আফ্রিকা থেকে যোদ্ধা সংগ্রহের লক্ষ্যে তারা আরও দক্ষিনের দিকে এগুচ্ছে ।

 

সার্বিকভাবে ইসলামিক স্টেটের আন্তর্জাতিক সদস্য সংগ্রহ প্রক্রিয়ার উপর দ্য আটলান্টিকের এডওয়ার্ড ডেলম্যানের করা এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ‘যেসব দেশ থেকে সার্বিকভাবে কিংবা মাথাপিছু হারে সিরিয়া ও ইরাকে বেশি সংখ্যক বিদেশি যোদ্ধা যাচ্ছে, সেসব দেশ হয়ত রাজনৈতিকভাবে দমনমূলক (সৌদি আরব, ২,৫০০ যোদ্ধা), রাজনৈতিক অস্থিরতার শিকার (তিউনিসিয়া, ৬,০০০ যোদ্ধা), মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রতি বৈষম্যমূলক (রাশিয়া, ২,৪০০ যোদ্ধা) কিংবা উপরের সবগুলো পরিস্থিতি বিদ্যমান।’ উল্লেখ করার মত বিষয় হল, সিরিয়া ও ইরাকে যে সব দেশ থেকে সবচেয়ে বেশি যোদ্ধা যাচ্ছে, সেসব দেশের তালিকায় দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো নেই।

কিন্তু দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো রাজনৈতিক সংস্কারকে উৎসাহিত করে না, যার ফলে ইসলামিক স্টেট সংশ্লিষ্ট চরমপন্থিদের কাছ থেকে বড় ধরণের হুমকির সম্মুখীন হতে পারে। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় আইএস সংশ্লিষ্ট গ্রুপগুলোর উত্থান ঠেকাতে হলে এই অঞ্চলের নেতাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কাজটি করতে হবে তা হল গণতান্ত্রিক পশ্চাদ্গমন প্রতিরোধ করা। এই অঞ্চলের নেতাদের বাস্তব সন্ত্রাসী হামলার হুমকির ব্যাপারে অতি প্রতিক্রিয়া দেখানোর চেয়ে বরং স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে জনবিচ্ছিন্নতার মৌলিক কারণগুলো চিহ্নিত করা উচিত। সবচেয়ে বড় কথা হল, যদিও ১,৫০০ থেকে ২,৫০০ দক্ষিণ এশিয়ান ইসলামিক স্টেট অধিকৃত অঞ্চলে গিয়েছে এবং সেখান থেকে ফিরে এসেছে, দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার সমগ্র জনসংখ্যার তুলনায় এই সংখ্যা নগণ্য। ডেলম্যান যেমন লক্ষ্য করেছেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় ইউরোপিয়ান দেশগুলো ইসলামিক স্টেটের জন্য অনেক বেশি সংখ্যক যোদ্ধা সরবরাহ করেছে।

যদি দক্ষিণপূর্ব এশিয়ান রাষ্ট্রগুলো জঙ্গি হুমকি সামাল দিতে গিয়ে আইনের শাসনের লঙ্ঘন করে এবং এমন আইন প্রণয়ন করে যা নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে আরও বেশি ক্ষমতাবান করে তোলে, তাহলে তাদের জনবিচ্ছিন্নতার ঝুঁকি বাড়বে এবং এরকম পরিস্থিতি আরও অনেক বেশি মানুষকে এরকম চরমপন্থি দলগুলোতে যোগ দিতে বাধ্য করবে। তারচেয়ে বরং, দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার নেতাদের উচিত আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামা। ইন্দোনেশিয়ায় এই মাসের আগ পর্যন্ত জকভি সরকার এমন কোন আইন পাস করেনি যা বিনা অভিযোগে কোন ব্যক্তিকে লম্বা সময় পর্যন্ত আটকে রাখার ক্ষমতা দিয়েছে, কিন্তু এই অঞ্চলের অন্য দেশগুলোতে এরকম আইন পাস হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার জঙ্গিবাদবিরোধী আইনে সম্ভাব্য যে পরিবর্তন বিষয়ে নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা এখনো পর্যন্ত নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে এই অঞ্চলের অন্যান্য  দেশগুলোর মত  sweeping powers  দেয়নি। তারপরও ইন্দোনেশিয়া কঠোরতার দিকে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। দেশটি নিবৃত্তিমূলক আটক (preventative detention) আইন পাস করতে যাচ্ছে, যে আইন অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ জঙ্গিবাদের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের ছয় মাস আটক করে রাখতে পারবে। এই আইন পাস হলে দ্বীপপুঞ্জজুড়ে আইনের শাসনের অবমাননার এক তাৎপর্যপূর্ণ বাঁক পরিবর্তন হবে।

আইনের শাসনের প্রতি আনুগত্যের ফলে জঙ্গিবাদবিরোধী কার্যক্রমের পক্ষে জনসমর্থন বৃদ্ধি করে  এবং আঞ্চলিক সরকারগুলো তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে গণহারে কারাগারে আটকে রাখার জন্য নিবৃত্তিমূলক আটকাদেশ অপব্যবহার করবে এই ঝুঁকিও থাকে না। জকভির সরকার অবশ্য ইঙ্গিত দিয়েছে যে, পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থা কর্তৃক কোন ধরণের আইন-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সহ্য করা হবে না। যদি ইন্দোনেশিয়ান নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর পরিচ্ছন্ন থাকার সুনাম নেই বললেই চলে, তবু জকভি উদ্যগ নিয়েছেন যে একটি স্বাধীন, দলনিরপেক্ষ তদন্ত সংস্থা গঠন করা হবে যার কাজ হবে নিরাপত্তা সংস্থাসমূহ কর্তৃক পাপুয়ার মত অঞ্চলে জনগণের অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তদন্ত করা। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য সরকারগুলোর উচিত জঙ্গিদের তদন্ত ও গ্রেফতার করার জন্য আইনি ও মানবিক কৌশল অবলম্বন করে এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর উপর আরও কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করার মাধ্যমে এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করা।

তাছাড়া, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর উচিত রাজনৈতিক বিবাদ নিরসন করতে পারে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করে তোলা যাতে বিবাদ নিরসনের জন্য তাদের কোন অগণতান্ত্রিক ও  সেকেলে প্রতিষ্ঠানসমূহের উপর নির্ভর করতে না হয়। থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় প্রায়শই রাজনৈতিক বিবাদ নিরসন করে সেনাবাহিনী; কম্বোডিয়া ও মালয়েশিয়ায় এরকম বিবাদসমূহ ব্যবসায়ি ও রাজনৈতিক এলিটদের ছোট কোন দল পেছনের কক্ষের সমঝোতার মাধ্যমে সমাধান করে থাকে। এই দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির ফলে রাজনৈতিক বিবাদ চক্রাকারে চলতে থাকে এবং জঙ্গিদের জন্য এটা দাবী করা সহজ হয় যে, গনতন্ত্র শান্তি ও নিরাপত্তা বিধানে ব্যর্থ হচ্ছে।

অননূদিত প্রবন্ধটি পড়তে ক্লিক করুন: http://blogs.cfr.org/asia/2016/02/17/democratic-regression-in-southeast-asia-and-the-islamic-state/

You might also be interested in