মেধাস্বত্ব ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন

ওয়াশিংটন, ডিসি- মার্কিন  প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সম্প্রতি তার স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন বক্তৃতায় ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (ইউএস এবং ১১ টি প্যাসিফিক দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক চুক্তি) সম্পন্ন করার কথা পূনর্ব্যক্ত করেছেন। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং চীন ,এশিয়া ও অন্যান্য জায়গায় তাদের নিজেদের চুক্তি থেকে অব্যাহতি নিতে চাচ্ছে। যদি ক্রমবর্ধমান এই চুক্তিগুলো দ্বারা উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হয় তাহলে দেশগুলোকে শুধু বাণিজ্য বাঁধা প্রশমন করলে চলবে না। তাদের একটি আধুনিক অর্থনীতির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোও তৈরি করতে হবে। এবং এর মধ্যে থাকবে মেধাস্বত্ব রক্ষার বিষয়টিও।

কিছু অ্যাকটিভিস্ট এবং সরকারি কর্মকর্তা মেধাস্বত্ব রক্ষণব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক অনুন্নয়নের মধ্যে একটি সম্পর্ক খুঁজে পান। তারা দাবী করেন মেধাস্বত্ব অধিকার উন্নয়নের জন্য একটি বাঁধা, কোন দেশ উচ্চ আয় সম্পন্ন না হওয়া  পর্যন্ত এটি কার্যকর করা উচিত নয়। বিশেষ করে এই দৃষ্টিভঙ্গি ভারতের ক্ষেত্রে দেখা যায়। এ কারণেই ইইউ এর সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি থেমে গেছে। বৈশ্বিক বাণিজ্য সম্মেলন এর দোহা রাউন্ড ব্যর্থ হওয়ার পেছনে এটিই ছিল মূল কারণ। ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রী আনন্দ শর্মা বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অবশ্যই স্বাভাবিক নমনীয়তা (মেধাস্বত্বের বিষয়ে) থাকা দরকার‌।

কিন্তু আসল কথা হলো মেধাস্বত্ব অধিকারের মাধ্যমে রক্ষিত আইডিয়াগুলো উন্নত এবং উন্নয়নশীল উভয় ধরনের দেশের জন্য অর্থনৈতিক উন্নয়নের চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। মেধাস্বত্ব অধিকারকে খর্ব করার পরিবর্তে ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর বোঝা উচিত মেধা স্বত্ব অধিকার শক্তিশালীকরণ বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের একটি পূর্বশর্ত। অর্থনৈতিক অগ্রগতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নাগরিকদের ভোগের সামর্থ্য বাড়াতে বিদেশি বিনিয়োগ তাদের একান্ত প্রয়োজন।

আজকের এই যুগে বড় কোম্পানিগুলোতে মেধাস্বত্ব খুব মূল্যবান জায়গা করে নিয়েছে। ২০০৯ সালের একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, এউএস এর বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রিতে মেধাস্বত্ব- প্যাটেন্ট, কপিরাইট, ডেটাবেজ, ব্র্যান্ড এবং সংগঠনের অভ্যন্তরীণ জ্ঞান ফার্মের মোট বাজারমূল্যের ৪৪ শতাংশ অধিকার করে থাকে। এ ধরনের কোম্পানি কোনভাবেই  তাদের মেধাস্বত্বকে অপচয় বা সম্পূর্ণ চুরির ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে চাইবে না। তারা এমন জায়গায় ব্যবসা করতে চায় যেখানে তাদের মেধাস্বত্ব নিরাপদে থাকবে।

বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে আকর্ষণ করার মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলো অনেক লাভবান হতে পারে। এ ধরণের কোম্পানিগুলো উচ্চ প্রযুক্তি সম্পন্ন সামগ্রি আমদানি করে এবং নতুন ম্যানেজমেন্ট কৌশল নিয়ে আসে যা দেশের শিল্পের আধুনিকায়নে ভূমিকা রাখে এবং দেশীয় ফার্মগুলোর উন্নয়ন ত্বরান্বিত করে। এর ফলে স্থানীয়ভাবে অনেক নতুন কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয় যেগুলো এই সব বহুজাতিক কোম্পানির সাপ্লায়ার হিসেবে থাকে। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, কর্মীদের দক্ষতা বাড়ে, উৎপাদনশীলতা বাড়ে এবং সর্বোপরি সরকারি আয় বৃদ্ধি পায়।

বর্তমানে, বৈশ্বিক গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যয়ের মাত্র ২.৭ শতাংশ ভারতে বিনিয়োগ হয়। চীনে মেধাস্বত্ব অধিকার রক্ষার কঠোর ব্যবস্থা থাকায় সেখানে বিনিয়োগ হয় ১৮ শতাংশ; আমেরিকায় বিনিয়োগ হয় ৩১ শতাংশ। জাতিসংঘের তথ্য বলছে, ২০১০-২০১২ সালে ভারতের ফরেন ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট (এফডিআই) এর পরিমাণ ছিল জিডিপির ১১.৮ শতাংশের সমান – যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর গড় ৩০ শতাংশের চেয়ে অনেক কম।

অর্থনীতিবিদ রবার্ট সাপিরো এবং অপর্ণা মাথুর-এর এক নতুন গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, যদি ভারত চীনের মত মেধাস্বত্ব রক্ষণব্যবস্থা জারি রাখে তবে বার্ষিক এফডিআই ৩৩ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাবে। ফার্মাসিউটিক্যাল খাতে বিশেষ করে মেধাস্বত্ব খর্ব হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। আরও শক্তিশালী মেধাস্বত্ব রক্ষণব্যবস্থা নির্মাণ করা সম্ভব হলে এই খাতে এ বছর এফডিআই ১.৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ৮.৩ ডলারে পৌঁছাত। একই সময়ে এই খাতে গবেষণা এবং উন্নয়ন বিনিয়োগ দ্বিগুণ হয়ে ১.৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাত। বর্ধিত এই এফডিআই ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিতে নতুন ১৮,০০০ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করত।

যদি ভারত তার মেধাস্বত্ব রক্ষণব্যবস্থা এউএস এর মানে (যা চীনের চেয়েও শকিশালী) করতে পারত তাহলে এর লাভ আরও অনেক বেশি হত। ২০২০ সালের মধ্যে এফডিআই প্রবাহ ৮৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেত; শুধু ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পেই এফডিআই আসত ৭৭ বিলিয়ন ডলারের মত, গবেষণা ও উন্নয়ন বিনিয়োগ ৪.২ বিলিয়ন ডলারে উপনীত হত এবং ৪৪,০০০ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হত। ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিতে মেধাস্বত্বের বিষয়টিতে ভারত সরকারে সিদ্ধান্ত এই গবেষণাগুলোকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। গত দু বছরে ভারত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ১৫ টি ঔষধের মেধাস্বত্বকে আক্রমণ করেছে। দেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য জায়গা করে দিতেই ভারত এই কাজ করেছে । তাদের দাবী, একচেটিয়া ব্যবসা (মনোপলি) কোম্পানিগুলোকে বেশি দাম নির্ধারণ করতে উদ্বুদ্ধ করে যা ভোক্তাদের জন্য ক্ষতিকর। সরকার স্থানীয় উৎপাদনকারীদের প্যাটেন্ট করা ঔষধ নকল করার অনুমতি দিয়েছে। কর্মকর্তারা বলছে এতে ঔষধের দাম কমবে এবং আরও বেশি সংখ্যক মানুষ এই ঔষধ কিনতে পারবে।

কিন্তু ভারতে রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের পথে ঔষধের প্যাটেন্ট প্রধান কিংবা বড় কোনো বাঁধা নয়। আইএমএস কনসালটেন্সি নামের একটি প্রতিষ্ঠান দেখিয়েছে প্রধান ইস্যু হলো ডাক্তার, ক্লিনিক এবং হাসপাতালের অভাব, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলগুলোতে। সরকারি ক্লিনিক এবং হাসপাতালগুলো অব্যবহৃত হয়ে পড়ে থাকে ডাক্তারদের উচ্চহারে অনুপস্থিতির কারণে। যদি প্রেসক্রিপশন দেয়ার মত মানুষ না থাকে তাহলে ঔষধের কোন মূল্য থাকে না। এমনকি তা ক্রয়সীমার মধ্যে থাকলেও।

অধিকন্তু, ভারতে বীমা ব্যবস্থারও অভাব রয়েছে বিশেষ করে বহির্বিভাগের রোগীদের জন্য। বীমাহীনতা এবং নিরাপত্তা বেষ্টনীর অভাব স্বাস্থ্যসমস্যাকে একটি বড় অর্থনৈতিক সমস্যায় পরিণত করেছে। এমনকি মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর ক্ষেত্রেও এটি সত্য। এমনিতেই নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার বিষয়টিতে তেমন কোন উন্নতি পরিলক্ষিত হচ্ছে না, অন্যদিকে দূর্বল মেধাস্বত্ব রক্ষণব্যবস্থা ভারতের স্বাস্থ্যসেবা খাতের চ্যালেঞ্জগুলোকে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ভারতীয় নেতাদের স্বীকার করার সময় এসেছে যে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং নাগরিকদের কল্যাণের জন্য মেধাস্বত্ব ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে । বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যিক চুক্তি যারা করছে তাদেরও এই মতামত প্রত্যাখ্যান করার সময় এসেছে যে মেধাস্বত্ব রক্ষা একটি বিলাসিতা যা শুধু ধনী দেশগুলোই রক্ষা করতে পারে। বাস্তবতা হলো যে মেধাস্বত্ব রক্ষা একটি অর্থনৈতিক ইঞ্জিন যা উন্নয়শীল দেশের নাগরিকদের উপেক্ষা করা উচিত নয়।

অননূদিত প্রবন্ধটি পড়তে ক্লিক করুন :www.project-syndicate.org/commentary/rod-hunter-emphasizes-the-importance-of-strong-ip-protections-for-sustained-gdp-growth-and-job-creation

কর্মক্ষেত্রে ‘ক্রিয়েটিভ ডিসট্রাকশন

অক্সফোর্ড- ইতিহাসের পরিক্রমায় প্রযুক্তিগত অগ্রগতি বিশাল সম্পদ সৃষ্টি করেছে কিন্তু সাথে সাথে বড় বিপত্তিরও কারণ হয়েছে। উদাহরণস্বরুপ, ১৯৬০ সালের দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টিল ইন্ডাস্ট্রি  একটি বড় ধরণের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গিয়েছিল । তখন বড় বড় স্টিল মিলগুলো ছোটো ছোটো মিলগুলোর কাছে ব্যবসায় মার খেয়েছিল। এর ফলে পিটসবার্গ, পেনসিলভানিয়া এবং ইয়ংস্টাউন, ওহাইও শহরগুলো অর্থনৈতিক ভিত ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু অন্যদিকে,  ছোট মিলগুলো তাদের উৎপাদনশীলতা ব্যাপকমাত্রায় বৃদ্ধি করেছিল এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে নতুন ধরণের কাজ সৃষ্টি করেছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের স্টিল ইন্ডাস্ট্রির এই গল্প গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। অর্থনীতিবিদ যোসেফ সুমপিটার যাকে বলেছেন, ক্রিয়েটিভ ডিসট্রাকশন। এর মানে হল দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শুধু বিদ্যমান কারখানাগুলোর ক্রমবর্ধমান উৎপাদশীলতাই নির্দেশ করে না, কর্মসংস্থানের কাঠামোগত পরিবর্তনও করে।

বর্তমানে তথ্য ও যোগাযাগ প্রযুক্তি আধুনিক কর্মপরিবেশের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত । এমনকি কম্পিউটার প্রোগ্রামিং এবং সফটওয়ার প্রকৌশলের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট নয় এমন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে । তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লবের এ যুগেও আমরা একই ধরনের পরিস্থিতি দেখতে পাই। কম্পিউটার প্রযু্ক্তি নতুন নতুন ব্যবসা সৃষ্টি করছে, এমনকি ব্যবসার ক্লাস্টার তৈরি করছে। এবং একই সাথে এখানে কিছু কিছু পেশার কর্মীকে অপ্রয়োজনীয় করে দিচ্ছে এবং পুরনো শিল্প -শহরগুলোকে পতনমুখী করে তুলছে।

কিন্তু ডেট্রয়েট, লিলি এবং লিডস এর মত শহরগুলোকে শিল্পোউৎপাদন কমার কারণে খুব একটা ভুগতে হয় নি। এমনকি, এই শহরগুলোতে গত দশকগুলোতে উৎপাদন আরো বেড়েছে। উৎপাদন বাড়লেও শহরগুলোর পতন হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি কারণে। সেটি হলো- ভিন্ন ধরণের পেশা সৃষ্টির ব্যর্থতা। বড় পরিসরে দেখলে এটা মূলত পলিসি পর্যায়ের ব্যর্থতা। সরকারি কর্মকর্তাদের  পুরনো শিল্পগুলোকে সংরক্ষণের চেষ্টা না করে  নতুন ধরণের পেশা বা কাজ সৃষ্টির বিষয়টি ম্যানেজ করার দিকে মনোযোগ দেয়া উচিত ছিল। এজন্য অবশ্য নতুন নতুন প্রযুক্তি সম্পন্ধে ভালো জানাশোনা থাকতে হয় । যার জায়গা দখল করে নেবে -নতুন প্রযুক্তিগুলো সেগুলোর থেকে কতটুকু আলাদা সে সম্পর্কেও থাকতে হবে সম্যক ধারণা।

শিল্প বিপ্লবের প্রথমদিকের শিল্প প্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল।  তা হলো প্রযুক্তিগুলো তুলনামূলকভাবে দক্ষ কারিগরদের জায়গাটি দখল করে নিয়েছিল। এর কারণে অদক্ষ কারখানা শ্রমিকের চাহিদা বেড়ে যায়। একইভাবে কার উৎপাদনের জন্য ১৯১৩ সালে হেনরি ফোর্ড এর অ্যাসেম্বলি লাইন- এর উদ্ভব হয়। এটি যন্ত্রপাতি পরিচালনার জন্য অদক্ষ শ্রমিকদের জন্যই ডিজাইন করা হয়েছিল। এর ফলে কোম্পানির সেই জনপ্রিয় টি মডেল কার উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছিল । এই টি মডেলই প্রথম কার যা আমেরিকার মধ্যবিত্তদের কেনার সামর্থ্য ছিল।

গত শতাব্দীতেও শিল্পবিপ্লবের মত অনেক গল্প তৈরি হয়েছে। সেখানে ক্রমবর্ধমান শিক্ষিত কর্মীবাহিনী এবং তাদের দক্ষতা প্রতিস্থাপনকারী প্রযুক্তির মধ্যে প্রতিযোগিতা হয়েছে। আমরা এর পরিণাম ও দেখেছি। শুধু কার ইন্ডাস্ট্রিতে নয়। আমরা দেখেছি রোবট কিছু রুটিন কাজ খুব ভালো ভাবেই সম্পন্ন করছে । এই কাজগুলো আগে হাজার হাজার মধ্য আয়ের অ্যাসেম্বলি লাইন শ্রমিকরা করত। কর্মপরিবেশে এরচেয়েও বড় আঘাত আসে আরেকটু দেরিতে।

ইতিহাস আমাদেরকে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের গতিপ্রকৃতি বিষয়ে ভবিষ্যৎবাণী করতে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেয়। তবে এসম্পর্কে আমাদের কিছু যুক্তিসংগত ধারণা জন্মেছে। কারণ প্রযু্ক্তিগুলো বিকশিত হওয়ার পর্যায়গুলোর সাথে আমরা ইতিমধ্যেই পরিচিত হয়েছি। যেমন আমরা জানি যে বিভিন্ন ধরণের দক্ষতা সমৃদ্ধ কাজ বিগ ডেটা এবং উন্নতমানের অ্যালগরিদম ব্যবহার করে তুলনামূলকভাবে সহজে করা সম্ভব।

এ বিষয়ে সিমানটেক ক্লিয়ারওয়েল এর উদাহরণ অনেক সময়ই দেয়া হয়। এটি একটি ই-ডিসকভারি প্ল্যাটফর্ম যা ভাষা বিশ্লেষণ করে ডকুমেন্টের সাধারণ কনসেপ্টগুলোকে চিহ্নিত করে এবং মাত্র দুদিনে ৫,৭০,০০০ ডকুমেন্ট বিশ্লেষণ এবং সাজাতে পারে। ক্লিয়ারওয়েল কম্পিউটারের সাহায্যে ট্রায়ালপূর্ব গবেষণা এবং প্যারালিগাল , এমনকি চুক্তি বা প্যাটেন্ট বিষয়ে আইনজ্ঞদের কাজগুলো সুষ্ঠুভা্বে সম্পন্ন করে এই পেশার খোলনলচে বদলে দিচ্ছে।

একইভাবে উন্নত সেন্সরি প্রযুক্তির কারণে পরিবহন এবং লজিস্টিক্স সংক্রান্ত কাজ সম্পূর্ণ অটোমেটেড বা স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাবে। এটি চিন্তা করা অসমীচীন হবে না যে গুগলের সেল্ফ-ড্রাইভিং কারের মত বাস এবং ট্যাক্সির জন্য আর চালকের  প্রয়োজন হবে না। এখন পর্যন্ত নিরাপদ থাকলেও স্বল্প-দক্ষতা প্রয়োজন এমন সেবাধর্মী পেশাগুলো স্বয়ংক্রিয়তার হাত থেকে রক্ষা নাও পেতে পারে।যেমন ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক প্রয়োজনে রোবটের চাহিদা প্রতিবছর ২০ শতাংশ হারে বাড়ছে।

শ্রম বাজার আবারও প্রযুক্তির উত্তাল হাওয়া এবং মজুরি বৈষম্যের মধ্যে প্রবেশ করতে পারে। এটি একটি বড় প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে- নতুন ধরনের কাজগুলো কোথায় এবং কিভাবে সৃষ্টি হবে? ভবিষ্যতে কি হবে তার কিছু চিহ্ন আমরা অবশ্য দেখতে পাচ্ছি। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন বিগডেটা আর্কিটেক্ট  অ্যানালিস্ট, ক্লাউড সার্ভিস বিশেষজ্ঞ, সফটওয়্যার ডেভেলপার এবং ডিজিটাল মার্কেটিং পেশাজীবীদের মত কিছু পেশার চাহিদা সৃষ্টি করছে। পাঁচ বছর পূ্র্বে এই পেশাগেুলোর তেমন কোনো অস্তিত্বই ছিল না।

একটি শহর বা দেশকে প্রযুক্তির বিকাশের সাথে কিভাবে খাপ খাইয়ে নিতে হয় তার একটি মূল্যবান শিক্ষা ফিনল্যান্ড এর নিকট থেকে পাওয়া যায়। সেদেশের সবচেয়ে বড় কোম্পানি নকিয়া স্মার্টফোন প্রযুক্তির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে ব্যর্থ হচ্ছিল। ফলে সেদেশের অর্থনীতিতেও এর বিরূপ প্রভাব পরে। তবে বেশকিছু ফিনিশ স্টার্টআপ স্মার্টফোন প্ল্যাটফর্ম ভিত্তিক ব্যবসা শুরু করে। ২০১১ সালের মধ্যে প্রাক্তন নোকিয়া কর্মকর্তারা এমন ২২০ টি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছিল। যেমন ফিনল্যান্ডের প্রতিষ্ঠান ‘রভিও’  তার স্মার্টফোন ভিত্তিক ভিডিও গেম ‘অ্যাংরি বার্ড’ ১ কোটি ২০ লক্ষ কপি বিক্রি করে। রভিও’র বেশিরভাগ কর্মকর্তাই পূর্বে নকিয়ায় কাজ করতেন।

এই পরিবর্তন কোন কাকতালীয় ঘটনা নয়। ফিনল্যান্ড শিক্ষা খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। এর ফলে তাদের নিবিড় শ্রম শক্তি তৈরি হয়েছে। তারা কোনো নির্দিষ্ট ব্যবসা বা ইন্ডাস্ট্রিতে সীমাবদ্ধ নয় বা কম্পিটারাইজেশনের ফলে অস্তিত্বের হুমকির মধ্যে পড়বে না এমন স্থানান্তরযোগ্য দক্ষতাসমূহের মধ্যে বিনিয়োগ করেছে। ফিনল্যান্ড এভাবেই প্রযুক্তির এই অভ্যুত্থানের সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার নীলনকশা সারাবিশ্বের সামনে উপস্থাপন করেছে।

 

গবেষণা জানাচ্ছে বিগডেটা প্রভাবিত প্রযুক্তির উৎকর্ষের এ যুগেও শ্রম সামাজিক দক্ষতা এবং সৃজনশীল খাতে তুলনামূলকভাবে উৎকৃষ্ট অবস্থানে থাকবে। তাই রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন কৌশলে এইসব দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য মনোযোগ দিতে হবে যাতে তারা কম্পিউটার প্রযুক্তির সাথে প্রতিযোগিতা না করে সম্পূরক শক্তি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারে।

অননূদিত প্রবন্ধটি পড়তে ক্লিক করুন :www.project-syndicate.org/commentary/carl-b–frey-assesses-how-technological-change-is-transforming-the-structure-of-employment

ধনী দেশগুলো কেন গণতান্ত্রিক

মাত্র বাইশ বছর বয়সে অ্যাডাম স্মিথ দাবি করেছিলেন, “অতি দরিদ্র একটি  রাষ্ট্রকে সম্পদশালী হিসেবে গড়ে তুলতে শান্তি, সহজ কর ব্যবস্থা এবং একটি সহনীয় বিচার ব্যবস্থার বাইরে খুব কম জিনিসেরই প্রয়োজন হয়। বাকি জিনিসগুলো প্রকৃতির নিয়মেই চলে আসে।” প্রায় ২৬০ বছর পর এখন আমরা জানি যে কথাটি সত্য নয়।

মালেশিয়ান এয়ারলাইনস ফ্লাইট ৩৭০ এর অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রের মধ্যকার জটিল সম্পর্কের গুরুত্ব বোধগম্য হয়। আমরা বুঝতে পারি স্মিথ এই সম্পর্কের উপর গুরুত্বারোপ না করে কতটা ভুল করেছিলেন। বিমান ভ্রমণকে আরামদায়ক এবং নিরাপদ করার জন্য রাষ্টগুলো নিশ্চিত করে যে, পাইলটেরা বিমান চালাতে জানে এবং সেই বিমানকে সবরকমের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। রাষ্ট্রগুলো এয়ারপোর্ট নির্মাণ করে এবং রাডার ও স্যাটেলাইটের যোগান দেয় যা বিমানগুলোকে ট্র্যাক  করতে পারে, আকাশ পথ নিয়ন্ত্রণকারীদের দ্বারা বিমানগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ এড়ায় এবং সিকিউরিটি সার্ভিসের মাধ্যমে সন্ত্রাসীদের দমিয়ে রাখে। যখন কোন বিপদ হয়,তখন সমাধানের জন্য পেশাদার সুদক্ষ সরকারী কর্মচারীদের সাহায্য নেয়া হয়। শান্তি, সহজ কর ব্যবস্থা কিংবা ন্যায়বিচার তখন  কোন কাজে লাগেনা।

তরুণ  স্মিথ যা ধারণা করেছিলেন, সকল উন্নত অর্থনীতিতে এখন তার চেয়ে অনেক বেশি উপকরণ বিবেচনায় নেয়ার প্রয়োজন হয়।  আধুনিক সরকারগুলো শুধু আকারে বড় এবং জটিল নয়, বরং তা হাজার হাজার সংস্থা নিয়ে গঠিত এবং  লক্ষ লক্ষ পৃষ্ঠার আইন-কানুন এর উপর প্রতিষ্ঠিত। তারা গণতান্ত্রিকও, তবে তা একারণে নয় যে তারা প্রায়ই নির্বাচনের ব্যবস্থা করে । তাহলে কেন?

৪৩ বছর বয়সে তার ‘ওয়েলথ অব নেশন’ বইটি প্রকাশ করার পর,স্মিথ অর্থনীতিতে প্রথম কমপ্লেক্সিটি সায়েন্টিস্ট (Complexity Scientist) হিসেবে আবির্ভূত হন। তিনি বুঝেছিলেন, অর্থনীতি এমন একটি জটিল পদ্ধতি যেখানে শুধুমাত্র খাওয়া-পরার মত সাধারণ ব্যাপারগুলোর ব্যবস্থা করতে হাজার হাজার লোকের কাজের মধ্যে সমন্বয় সাধন করার প্রয়্জেন হয়।

কিস্তু স্মিথ এটা ও বুঝেছিলেন, অর্থনীতির এই অতি জটিলতা যেমন কারো দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন, তেমনি নিজেকে সংগঠিত করার ক্ষমতাও তার আছে। তিনি বলেছেন, অর্থনীতির একটি অদৃশ্য হাত রয়েছে। এই অদৃশ্য হাত কাজ করে বাজারমূল্যের মাধ্যমে যা একটি তথ্যব্যবস্থা তৈরি করে। কোন একটি সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সাধনের ক্ষেত্রে  সম্পদ ব্যবহার করা লাভজনক হবে কিনা , সেই হিসেবের জন্য এই তথ্যব্যবস্থা ব্যবহার করা যেতে পারে।

মুনাফার আকর্ষণ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিকে বাজারমূল্য বিষয়ে তথ্য ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত করে। অন্যদিকে পুঁজি বাজারগুলো হচ্ছে সম্পদ বিনিয়োগ ব্যবস্থা (Resource Mobilization) , এটি সেসব কোম্পানী এবং প্রজেক্টে অর্থ সরবরাহ করে, যেগুলোর লাভজনক  হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে।  এভাবেই ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি বাজারমূল্যের প্রতি তাদের প্রতিক্রিয়া দেখায়।

আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থার এমন অনেকগুলো উপাদান দরকার হয়, বাজারব্যবস্থা  যার যোগান দেয় না। এয়ারলাইনের ক্ষেত্রে এই উপাদানগুলো যেমন- নিয়মাবলি, স্ট্যান্ডার্ড, সার্টিফিকেশান, অবকাঠামো, স্কুল এবং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বিজ্ঞান গবেষণাগার, নিরাপত্তা সেবা, এবং অন্যান্য সেবাগুলো প্রয়োজন হয়। বাজারে না পাওয়া এই উপকরণগুলো বাজারে সুলভ এমন উপকরণগুলোর পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। এই উপকরণগুলো বাজারব্যবস্থা সম্পর্কিত কার্যক্রমগুলোর সাথে গভীরভাবে জড়িত থাকে।

তাই এখন প্রশ্ন হল,রাষ্ট্রকর্তৃক সরবরাহকৃত উপকরণগুলোর নিয়ন্ত্রণ করে কে? প্রধানমন্ত্রী? আইনসভা? কোন দেশের শীর্ষ বিচারকেরা কি প্রণীত আইনসমূহের লক্ষ লক্ষ পৃষ্ঠা পড়ে দেখেছেন? কিংবা আইনগুলো একটা আরেকটার সাথে কতটা সম্পূরক বা পরষ্পর বিরোধী তা বিবেচনা করেছেন? কিংবা অর্থনীতির সাথে জড়িত বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রমের ক্ষেত্রে এই আইন কতটুকু প্রয়োগ করেছেন? এমনকি একজন প্রেসিডেন্সিয়াল এক্সিকিউটিভও, হাজার হাজার সরকারী সংস্থা কি কাজ করছে আর কি কাজ করছে না এবং সমাজে তার কি প্রভাব পড়ছে, এসব ব্যাপারে পুরোপুরি সচেতন থাকতে পারেনা।

এটা তথ্য-আধিক্যজনিত( Information-rich) সমস্যা। বাজার দ্বারা নির্ধারিত সামাজিক সমন্বয়ের চ্যালেঞ্জের মত এটাকেও কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।  এটা তাই কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকে পাত্তা দেয় না । এজন্য এক্ষেত্রে বাজারের অদৃশ্য হাতের মত নিজেই নিজেকে  সংঘটিত করতে পারে এমন একটি ম্যাকানিজমের দরকার।  স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুধু নির্বাচনগুলোই  যথেষ্ট নয়, কারণ সেগুলো গতানুগতিকভাবে দুই থেকে চার বছর পরপর অনুষ্ঠিত হয়, এবং প্রত্যেক ভোটার সম্পর্কে খুব কম তথ্য সংগ্রহ করা যায়।

এজন্য সফল রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে একটি বিকল্প অদৃশ্য হাত তৈরি করতে হয়েছে। এটি এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করতে, তার সমাধান দিতে এবং পর্যবেক্ষণ করার জন্য ক্ষমতাকে  বিকেন্দীকরণ করা হয়। এতে করে পর্যাপ্ত তথ্যের উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব হয়  ।

শুধুমাত্র একটি উদাহরণ দেয়া যায়, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকার দেশের প্রায় ৫ লাখ নির্বাচিত আসনের মধ্যে শুধুমাত্র ৫৩৭ টি আসনের দায়িত্ব নেয়। স্পষ্টত অন্য পদগুলোর দায়িত্ব অন্য কোনভাবে পালন করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ১০০ জন সিনেটরের প্রত্যেকের ৪০ জন করে সহযোগী রয়েছে। ৪৩৫ জন প্রতিনিধির প্রত্যেকের ২৫ জন করে সহযোগী রয়েছে।  তারা ৪২ টি কমিটি, এবং ১৮২ টি সাবকমিটিতে সংগঠিত, এর মানে , সেখানে সমান্তরালভাবে একইসাথে ২২৪ টি আলোচনা  সংঘটিত হচ্ছে। এবং ১৫০০০ হাজারেরও বেশি সংখ্যক মানুষের এই গ্রুপটিই শুধু নয়। ২২০০০ মত নিবন্ধিত লবিস্ট তাদের সঙ্গে রয়েছে , যাদের মূল লক্ষ্য (অন্যান্য লক্ষ্যের মধ্যে) আইনপ্রণয়নকারীদের সাথে বসা এবং আইনের খসড়া তৈরিতে সহায়তা করা।

এই ফেডারেল সরকার ব্যবস্থা এবং স্বাধীন সংবাদপত্র মিলে একটি কাঠামো তৈরি করে। এই কাঠামোই আইনের লক্ষ লক্ষ পৃষ্ঠা পড়ে এবং সরকারী সংস্থাগুলো কি করছে, না করছে তা পর্যবেক্ষণ করে। এই কাঠামোই তথ্য উৎপাদন করে এবং এর প্রতি প্রতিক্রিয়া দেখাতে উৎসাহিত করে। এটা বাজেটে সম্পদ বরাদ্দের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে। এটা হচ্ছে একটি উন্মুক্ত ব্যবস্থা। এখানে যে কেউ খবর তৈরি করতে পারে অথবা তার মামলার জন্য একজন লবিস্ট নিয়োগ করতে পারে , এটা তিমিমাছ  শিকার করা অথবা তা রক্ষা করার মত যেকোন কারণে হতে পারে।

এরকম একটি প্রক্রিয়া ছাড়া, আধুনিক অর্থনীতির জন্য যেরকম পরিবেশের দরকার, রাজনৈতিক ব্যবস্থা তা দিতে পারবেনা। একারণেই সব  ধনী দেশগুলো গণতান্ত্রিক, এবং আমার নিজের দেশের মত (ভেনিজুয়েলা) কিছু দেশ দিন দিন গরীবতর হচ্ছে। যদিও এসব দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তবে তারা খুব সাধারণ সমস্যার সমন্বয় করতে গিয়েও হোঁচট খায়। আসলে ভোটের জন্য লাইনে দাঁড়ালেই, নাগরিকদের টয়লেট পেপারের জন্য লাইনে দাঁড়াতে হবেনা এই নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না।

অননূদিত প্রবন্ধটি পড়তে ক্লিক করুন : www.project-syndicate.org/commentary/ricardo-hausmann-on-the-market-like-mechanism-in-advanced-economies–political-systems

লিঙ্গ বৈষম্য বিষয়ে অমর্ত্য সেন।

নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন; তিনি দ্যা কান্ট্রি অফ ফার্স্ট বয়েজঃ এন্ড আদার অ্যাসেস এর লেখক। এই সাক্ষাৎকারে তিনি সংস্কৃত সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ, শিক্ষাজীবনের অভিজ্ঞতা এবং সমাজে বৈষম্য কেন বিরাজ করে- এইসব বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন  দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এর সাংবাদিক অমৃত দত্ত।

সংস্কৃত সাহিত্যের প্রতি আপনার অনুরাগ বিষয়ে বলুন। প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতি আপনাকে কীভাবে নাড়া দেয়?

সংস্কৃত ও গণিত ছিল স্কুলে আমার সবচেয়ে প্রিয় বিষয়। যখন নোবেল কমিটি আমাকে তাদের জাদুঘরের জন্য দুটি জিনিস দান করতে বলল, আমি তাদের দিলাম আর্যভট্টের গণিতের বই, যেটি আমি স্কুলে পড়েছিলাম এবং আমার বাইসাইকেল, যা দিয়ে আমি দুর্ভিক্ষের সময়কার তথ্য সংগ্রহ করতাম।আমি বাংলার ফার্মগুলোতে এই সাইকেলে চড়ে পরিদর্শনে যেতাম এবং তাদের ধুলিজমা রুমগুলো যেখানে সব রেকর্ড রাখা হত সেগুলো  খোলাতাম। এর চেয়েও বেশি আমি সাইকেলটিকে ব্যবহার করেছি লিঙ্গ বৈষম্যবিষয়ে গবেষণার সময়ে। আমি  শান্তিনিকেতনের আশেপাশের গ্রামগুলোতে পাঁচ এর কম বয়েসি ছেলে মেয়েদের ওজন মাপতে যেতাম ( ঐ বয়সেই মেয়ে শিশুদের ওজন ছেলেদের তুলনায় কমে যাওয়া শুরু হয়)।  আমি ভেবে গর্ববোধ করি যে আমি বাচ্চাদের ওজন পরিমাপ করার কাজটি খুব ভালোভাবে রপ্ত করেছিলাম। আমার গবেষণার সহযোগী ছিলেন একজন অসাধারণ নারী, যিনি তার গ্রামের প্রথম সাঁওতাল হিসেবে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। একবার তিনি  নতুন দাঁত উঠছে একটি শিশুর ওজন মাপতে সাহায্য করার জন্য আমাকে ডাকলেন এবং আমি কোন কামড় না খেয়েই কাজটি সম্পন্ন করেছিলাম।

অতীত আমাকে ইতিবাচকভাবে উদ্দীপিত করে। আমি প্রবলভাবে আলোড়িত হই, যখন আমি দেখি আমার মননশীল সংস্কৃতি  পর্যবেক্ষণীয় বিজ্ঞানে চীনের মতো প্রভাবশালী না হলেও বিজ্ঞানের দর্শন এবং এর স্বরূপ উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, বিশেষ করে ব্যবহারশাস্ত্রের দর্শন নির্ণয়ে।সত্যিকার অর্থে, আমার বই আইডিয়া অফ জাস্টিস সংস্কৃত পণ্ডিতগণ কর্তৃক নির্ণীত নীতি ও ন্যায় এর প্রভেদের উপর ভিত্তি করে রচিত। আমি মনে করি কালিদাসের মেঘদুতম ভারতীয় সংস্কৃতি বোঝার একটি অপরিহার্য মাধ্যম। কিন্তু আমার সবচেয়ে ভালো লাগে শুদ্রক রচিত নাটক মৃচ্ছকটীকা, আমার ন্যায়শাস্ত্রবোধ এই বইটি দ্বারা প্রবলভাবে অনুপ্রাণিত। বেদশাস্ত্রও আমার ভালো লাগে, আমি মনে করি এই বইটিকে ভালো লাগানোর জন্য কাউকে হিন্দুধর্মে বিশ্বাসী না হলেও চলবে, এটি অসাধারণ একটি গ্রন্থ। মানুষ অজ্ঞতাবশতঃ ভাবে এটি শুধুমাত্র একটি ধর্মগ্রন্থ, বস্তুত এটি মানুষের আচরণবিধি সংক্রান্ত গ্রন্থ। বেদের কিছু কিছু স্তোত্র অসম্ভব শক্তিশালী। কিন্তু গণিত বিষয়ে বেদের অবস্থান আমাকে পীড়া দেয়। কিছু ধাঁধাঁ ব্যাতিত গণিতশাস্ত্রের কোন কিছুকেই এখানে তুলে ধরা হয়নি।

১৯৬০ এর দশকে যখন আপনি নারীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বিষয়ে নিরীক্ষণ শুরু করলেন, আপনার প্রতিক্রিয়া কি ছিল?

আমি যখন কোলকাতায় প্রেসিডেন্সি কলেজে ছিলাম তখনই আমি লিঙ্গ বৈষম্য নিয়ে আগ্রহী হই। আমি ভাবতাম কার্ল মার্ক্সের কৃত্রিম চেতনা তত্ত্বটি নারীদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায়। যখন আমি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করাচ্ছিলাম তখন এই বিষয়ে আমি কিছু গবেষণাপত্র তৈরি করি। বৈষম্য আমাকে ততোটা অবাক করেনি, যতটা করেছে এই বিষয়টিকে মানুষ যেভাবে মেনে নিয়েছে তা। আপনি যখন এ সম্পর্কে তাদের জানাতে চাইবেন, তারা আপনাকে সংস্কৃতির দোহাই দিবে। আমাকে বলা হয়েছিলো এটা একটা পশ্চিমা ভাবনা এবং ভারতীয় নারীরা কখনো তাদের পরিবার গণ্ডি পেরিয়ে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের কথা ভাবতে পারেননা। ১৯৬০ সালে দিল্লি স্কুল অব ইকোনমিকসে এই বিষয়ে আমি বিতর্ক করেছিলাম, আমি বলেছিলাম ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে অস্বীকার করার মাধ্যমে আমরা আমাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সম্পদকে হারাচ্ছি। এবং এভাবেই সমাজে বঞ্চিত এবং শৃঙ্খলিত শ্রেণিকে অবলম্বন করে বৈষম্য বেঁচে থাকে।

আপনি সারা জীবন বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে কাটালেন, কীভাবে এটাকে দেখেন?

আমার পিতা এবং পিতামহ দুজনেই শিক্ষক ছিলেন। ৮১ বছর বয়সে পৌঁছেও আমি শিক্ষকতা ত্যাগ করিনি, কারণ আমি ছাত্রদের পছন্দ করি এবং তারা আমাকে পছন্দ করে। এখন যখন আমি পিছনে ফিরে তাকাই, যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দেয় সেটি হল আমার শিক্ষক পরিচিতি।

আপনি ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কয়েক দশক ধরে লিখছেন। আপনার নিজের শিক্ষা জীবন কীরকম ছিল?

আমি অনেক সৌভাগ্যবান কারণ আমি শান্তিনিকেতনের কাছে চমৎকার একটা স্কুলে যাবার সুযোগ পেয়েছিলাম। এর আগে বছরখানেকের মত আমি ঢাকায় সেইন্ট গ্রেগরি স্কুলে পড়েছিলাম, যেটি ছিল শিক্ষার্থীদের ফলাফলের ব্যাপারে বেশ সচেতন । নোবেল পুরষ্কার পাবার পরে আমি স্কুলটি পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। প্রধান শিক্ষক আমাকে বললেন যে তারা আমার নামে বেশ কিছু বৃত্তি চালু করেছেন। তিনি আমাকে আরও বললেন যে আমার পুরনো পরীক্ষার খাতাগুলো তিনি শিক্ষার্থিদের দেখিয়েছেন যাতে করে তারা অনুপ্রাণিত হয়। আমি অবাক হলাম, কীভাবে এটা সম্ভব? প্রধান শিক্ষক আমাকে বললেন তার উদ্দেশ্য এটাই ছিল। এর পরে তিনি ক্লাসে আমার অবস্থান চেক করলেন এবং দেখলেন ৩৬ জনের মধ্যে আমার অবস্থান ছিল ৩৩ তম। আমার মনে হল তিনি এরপরে একটু দ্বন্দ্বে পড়ে গেলেন এই ভেবে যে ক্লাসে এটা দেখানো ঠিক হবে কিনা।

সত্যি বলতে গেলে আমি তুলনামূলক ভালো ছাত্র হয়ে উঠি শান্তিনিকেতনে যাবার পরে, যেখানে আমার গ্রেড নিয়ে কেউ চিন্তিত ছিলনা। বরঞ্চ সেখানে এটা নিয়ে ভাবাটাকে লজ্জাজনক মনে করা হত। আমার একজন শিক্ষক আমারই এক সহপাঠী সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন, গ্রেড ভালো হওয়া সত্ত্বেও তার  চিন্তা ভাবনায় স্বকীয়তা আছে। সেখানে প্রথম হবার জন্য কোন চাপ ছিল না, এই ব্যাপারটি আমার ভালো লেগেছিল।

সেখানে তখন আমার সাথে মেয়েরাও পড়তো (আমি ১৯৪০ সালে স্কুলে গিয়েছিলাম), শুধু তাই নয়- এর আগে আমার মাও সেখানে পড়ে গেছেন। তিনি গর্ব করে বলতেন যে ৯০ বছর আগে তিনি স্কুলে জুডো খেলেছেন। তিনি প্রথম ভারতীয় নারীদের মধ্যে একজন যিনি জুডো শিখেছিলেন। তার শিক্ষক ছিলেন একজন জাপানী, যিনি প্রথম সপ্তাহে তাদের শুধুমাত্র কীভাবে ব্যাথা না পেয়ে পড়তে হয় তাই শিখিয়েছিলেন। জুডো খেলায় যারা পড়ে যায় তাদের পরিণতি থেকে খেলার বাইরের সমগ্র মানবজাতি  এবং এর সামাজিক রীতিনীতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

অননূদিত প্রবন্ধটি পড়তে ক্লিক করুন:http://blog.oup.com/2015/11/amartya-sen-education-gender-equality/

উদীয়মান ভারতের সাথে কাজঃ নতুন শতাব্দীর জন্য একটি যৌথ উদ্যোগ

(ওয়ার্কিং উইথ আ রাইজিং ইন্ডিয়াঃ এ জয়েন্ট ভেঞ্চার ফর দ্যা নিউ সেঞ্চুরি )

প্রধানঃ চার্লস আর ক্যায়ে-সহকারী প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ওয়ারবার্গ পিনকাস এবং জোসেফ এস নাই জুনিয়র- সম্মানিত সার্ভিস অধ্যাপক, জন এফ কেনেডি স্কুল, হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি।

প্রোজেক্ট ডিরেক্টরঃ এলিসা আইরিস- ভারত, পাকিস্তান এবং দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো

প্রোগ্রাম ডিরেক্টরঃ ক্রিস্টোফার এম টাটল- নির্বাহী ব্যবস্থাপক, ওয়াশিংটন ও ইন্ডিপেনডেন্ট টাস্ক ফোর্স প্রোগ্রামস।

 

আগামী দুদশকে, আমেরিকার জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় একটি উন্নয়নশীল ভারত  সবচেয়ে জোরালো ভুমিকা রাখবে, এমনটি মনে করছেন কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স এর সাথে সংযুক্ত একটি স্বাধীন টাস্ক ফোর্স এর রিপোর্ট; (ওয়ার্কিং উইথ আ রাইজিং ইন্ডিয়াঃ এ জয়েন্ট ভেঞ্চার ফর দ্যা নিউ সেঞ্চুরি।)

বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ ভারত বিগত দশ বছরে ১৩০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষকে দারিদ্র থেকে মুক্তি দিয়েছে, সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে উঠেছে এবং একইসাথে চীনকে সরিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। টাস্ক ফোর্সের মতে, দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি অর্জন না করেও ভারত যদি  শুধুমাত্র তার বর্তমান প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে পারে, তাহলেও তার সামনে সুযোগ থাকবে আগামী দুই থেকে তিন দশকের মাঝে চীনের অনুসরণে আরেকটি  ১০ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে উঠতে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উপরে গুরুত্ব প্রদান এবং পররাষ্ট্রনীতি পুনরুজ্জীবিতকরণের মাধ্যমে দেশটির সামনে সম্ভাবনার নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়েছে। দেশটি এখন প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এর পথে হাঁটবে, নতুবা তাকে পিছিয়ে পড়তে হবে। ভারতকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, একটি বৈশ্বিক বাণিজ্যপ্রবাহ এবং সমন্বিত জোগান প্রক্রিয়ার সে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে কি না। এর ফলে দেশটির উৎপাদন খাত এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের প্রক্রিয়া তরান্বিত হবে। কিন্তু এটা না হলে, সেই উচ্চাশা অর্জন এর পথ কঠিন হয়ে পড়বে।

যেহেতু ভারত আমেরিকার মিত্রতা চায়না এবং দেশটি নিজেদের সিদ্ধান্ত-নীতিমালার স্বাধীনতায় বিশ্বাসী, ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক, ওয়াশিংটনের পরিচিত মিত্রদের তুলনায় ভিন্নতর হবে। একারণে টাস্ক ফোর্সের পরামর্শ হল, মার্কিন নীতি নির্ধারকের উচিত নিজেদের সম্পর্ককে একটি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যনীতির মতো করে রুপ দেয়া যেখানে পারস্পরিক চাহিদা এবং আগ্রহের ক্ষেত্রগুলোতে জোর দেয়া হবে এবং নিজেদের মতবিরোধ ও পার্থক্যের বিষয়গুলোকে সুনির্দিষ্টভাবে প্রকাশ করা হবে।

দ্বিদলীয় এই টাস্ক ফোর্সের প্রধান চার্লস আর ক্যায়ে- ব্যক্তিমালিকানাধীন ইকুইটি ফার্ম ওয়ারবার্গ পিনকাস এর সহকারি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং ভারত-মার্কিন বিজনেস কাউন্সিল এর চেয়ারম্যান এবং জোসেফ এস নাই জুনিয়র –সম্মানিত সার্ভিস প্রফেসর এবং হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের সাবেক ডীন। এই টাস্ক ফোর্সটি  সরকারি, শিক্ষা, অলাভজনক প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন সেক্টরের  ১৬ জন সুপরিচিত বিশেষজ্ঞ দ্বারা গঠিত, তাদের ডিরেক্টর হচ্ছেন ভারত, পাকিস্তান এবং দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিএফআর এর সিনিয়র ফেলো এলিসা আইরিস। এই টাস্ক ফোর্সের মতে ভারত-মার্কিন নীতিনির্ধারকদের উচিত উল্লেখিত বিষয়ে নজর দেয়াঃ

  • ভারতের বৈশ্বিক অগ্রগতিতে বাঁধা সৃষ্টি করতে পারে এরূপ বিরোধের সম্ভাবনা নিরসনে আমেরিকার উচিত ভারতকে পাকিস্তানের সাথে তার সম্পর্কের উন্নতিতে উৎসাহিত করা। এতে দেশটি নিজেদের উত্থানেই বিনিয়োগ করবে, বিশেষ করে এর মাধ্যমে আরো বাণিজ্যিক সম্পর্কের সৃষ্টি হবে।
  • আফগানিস্তানে মার্কিন এবং এর সহযোগী দেশগুলোর সেনা উপস্থিতি ভারতের আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা নিয়ে দুশ্চিন্তার একটি বড় কারণ। টাস্ক ফোর্সের নীতিনির্ধারকেরা বলেন, আফগানিস্তান বিষয়ে আমেরিকাকে তার দেয়া পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রেসিডেন্ট ওবামার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০১৭ সালের মধ্যে আফগানিস্তানে মার্কিন সেনা সংখ্যা ৫০০০ এ কমিয়ে আনা হবে। এর বাইরেও এই অঞ্চলে ভারতের স্বার্থ রক্ষায় আমেরিকার ভুমিকা রাখা উচিত বলে তারা মনে করেন।
  • টাস্ক ফোর্স মনে করে ভারত যদি সামাজিকব্যবস্থা এবং অর্থনীতি বিষয়ে তার উচ্চাকাঙ্ক্ষাসমূহ বাস্তবায়ন করতে চায়, তাহলে তাকে মেয়েশিশু এবং নারী অগ্রগতির পথে প্রতিবন্ধকতাসমূহ দূর করতে হবে। ম্যাককিন্সি গ্লোবাল ইন্সটিটিউটের এক সাম্প্রতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, অর্থনীতিতে নারীর সমান অংশগ্রহণের ফলে ভারতের জন্য ০.৭ ট্রিলিয়ন থেকে ২.৯ ট্রিলিয়ন ডলারের সুযোগ সৃষ্টি করবে।

টাস্ক ফোর্সের মতে, ভারত যে সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে তা অর্জনে ওয়াশিংটন এবং নয়া দিল্লীকে সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে নজর দিতে হবে- ভারত-আমেরিকা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক বন্ধুত্বকে সর্বাগ্রে বিবেচনা করতে হবে, ভারতের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় মার্কিন সহায়তা বৃদ্ধি করতে হবে এবং লক্ষ্য পূরণে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করতে হবে। বিগত দশকগুলোতে দুটি দেশ প্রতিরক্ষা এবং কৌশলগত বিভিন্ন বিষয়ে যেভাবে একসাথে কাজ করেছে, অর্থনৈতিক সম্পর্ককেও একইভাবে পরিচালিত করতে হবে।

বৈশ্বিক বিভিন্ন বিষয়ে আমেরিকা এবং ভারতের মিলিত স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ৪টি নির্দিষ্ট ক্ষেত্র টাস্ক ফোর্স চিহ্নিত করেছে যেখানে দেশদুটি একসাথে কাজ করতে পারে। এগুলো হল সাইবার ডোমেন, বিশ্বস্বাস্থ্য, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানী, গণতন্ত্র। সাইবার নিরাপত্তা এবং বিশ্বস্বাস্থ্য বিষয়ে ভারত ইতিমধ্যে কারিগরি সক্ষমতা অর্জন করেছে। দেশটিতে একটি বিশাল কর্মীবাহিনী আছে যেটি একইসাথে মেধাবী ও অভিজ্ঞ । এরা নিরন্তরভাবে তাদের আমেরিকান সহযোগীদের সাথে কাজ করে যাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে প্রাইভেট সেক্টর, আই টি এবং মেডিকেল ইন্ডাস্ট্রির নাম করা যায়।

এর সাথে টাস্ক ফোর্স মনে করে, যেহেতু বিগত বছরগুলোতে পরামর্শ ও সহযোগিতার ক্ষেত্র বহুদূর প্রসারিত হয়েছে আমেরিকান সরকারের উচিত নিরাপত্তা বিষয়ে ভারত সম্পর্কে আরও গুরুত্ব আরোপ করা। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে দেশদুটির একসাথে কাজ করা উচিত।

অননূদিত প্রবন্ধটি পড়তে ক্লিক করুন: http://www.cfr.org/india/working-rising-india/p37233

চীনা কমিউনিস্ট পার্টি

বেইনা জু এবং এলিনর আলবার্ট, অনলাইন লেখক

ভূমিকাঃ

চীনা কমিউনিস্টঃ পার্টি আধুনিক চীনের প্রতিষ্ঠাতা এবং ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল যার সদস্যসংখ্যা ছিয়াশি মিলিয়ন বা আট কোটি ষাট লক্ষ। দলটি এক দশক অন্তর অন্তর তার নেতৃত্বে পরিবর্তন আনে এবং ২০১২ সালে এর পঞ্চম প্রজন্মের নেতৃবৃন্দ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশটির জন্য ভবিষ্যৎ দিক নির্দেশনা নির্ধারণের দায়িত্ব গ্রহণ করে। চীনের সূচনালগ্ন থেকেই এই দল দেশটির রাজনীতিতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে আসছে। দ্রুত অর্থনৈতিক অগ্রগতির ফলস্বরূপ বর্তমানে দেশটিতে সামাজিক অস্থিরতা এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সৃষ্টি হয়েছে যা বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে চীনের জন্য হুমকিস্বরূপ। রাজনৈতিকভাবে অস্বচ্ছ দলটিতে বিভিন্ন স্ক্যান্ডাল তীব্র ক্ষমতা দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করেছে।

 

সূচনা এবং ক্ষমতা কাঠামোঃ

রাশিয়ান বিপ্লবে উদ্বুদ্ধ হয়ে, ১৯২১ সালে মার্ক্সিজম ও লেনিনিজম কে ভিত্তি করে বিরোধী ক্যুমিন্টাং এর সাথে দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের শেষে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির (সিসিপি)জন্ম হয়। যদিও ১৯৭০ এর শেষে এসে চীন তার বাজার ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনে; আধুনিক চীন এখন কিউবা, উত্তর কোরিয়া এবং লাউসের মতো লেনিনিস্ট ধারণা মেনে চলে। ক্ষমতার উপরে দলটির আধিপত্য তিনটি মূলদণ্ডের উপরে ভিত্তি করেঃ ১/ সদস্যদের উপরে নিয়ন্ত্রণ ২/ প্রোপাগান্ডা ৩/ পিপলস লিবারেশন আর্মি, যার ৭৭% সদস্যই পুরুষ এবং কৃষকেরা যার এক তৃতীয়াংশ সদস্যপদ পূরণ করে।

সিসিপি পাঁচ বছর পরপর ন্যাশনাল কংগ্রেস আহ্বান করার মাধ্যমে দেশ পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ নীতি গ্রহণ এবং কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করে। এই কমিটির সদস্যসংখ্যা ৩৭০, যার মধ্যে আছেন মন্ত্রী, উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকর্তা, আঞ্চলিক নেতা এবং সামরিক অফিসার। কেন্দ্রীয় কমিটি মূলত সিসিপি এর জন্য পরিচালনা পরিষদ হিসেবে কাজ করে। এই কমিটির প্রধান কাজ হল পঁচিশ সদস্যের পলিটব্যুরো নির্বাচন।

এর পরের ধাপে পলিটব্যুরো আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সাত সদস্যের স্থায়ী কমিটি নির্বাচন করে যেটিই সিসিপির ক্ষমতা ও নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করে। ক্ষমতার সর্বোচ্চ পর্যায়ে বর্তমানে আছেন শি জিনপিং যিনি ২০১২ সালে হু জিনতাও এর পরে দলের মহাসচিব হিসেবে অভিষিক্ত হন। প্রেসিডেন্ট এবং সেনাবাহিনীর প্রধাণ হিসেবে তিনি সরকারের কর্ম পরিকল্পনা নিরূপণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।  বর্তমান প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং স্টেট কাউন্সিল বা মন্ত্রী পরিষদের প্রধান হিসেবে দায়িত্বপালন করেন। শি জিনপিং ক্ষমতায় আসার পালাবদলে তাঁর পূর্বসূরির তুলনায় অধিক ক্ষমতাশালী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।  একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দলের একমাত্র নেতা হিসেবে তাঁর সিদ্ধান্ত দলের অন্যদের মতামতের ভিত্তিতে নেয়া সিদ্ধান্তের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

 

অষ্টম জাতীয় কংগ্রেসঃ

২০১২ সালে অষ্টম জাতীয় কংগ্রেসের সবচেয়ে দৃশ্যমান সিদ্ধান্ত হল এতে নতুন স্থায়ী কমিটির সদস্য সংখ্যা নয় থেকে সাত এ কমিয়ে আনা হয়েছে। এতে চীনের পরবর্তী প্রজন্মের নেতৃবৃন্দের নাম ঘোষণা করা হয়। তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, প্রেসিডেন্ট হু জিনতাও এর পদে অভিষিক্ত হোন এবং উপ প্রধানমন্ত্রি লি কেকিয়াং, প্রধানমন্ত্রী ওয়েন জিয়াবাও এর পদে আসীন হোন। নেতৃত্বের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ- স্থায়ী কমিটি, স্টেট কাউন্সিল তথা মন্ত্রি পরিষদ এবং কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশন- এর ৭০% আসনে নতুন সদস্যদের নিয়োগ দেয়া হয়। এটি গত তিন দশকে দলটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পালাবদল।

ক্ষমতার পালাবদল একটি জটিল প্রক্রিয়া, যেখানে গোপন আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সকল শীর্ষ নেতা সবগুলো স্থান নির্ধারণ করেন। কোন কোন বিশেষজ্ঞ সিসিপি’র ক্ষমতার গঠনকে দুটি ভাগে ভাগ করেন, যার এক ভাগে থাকে প্রিন্সলিং- শীর্ষ নেতৃবৃন্দের সন্তানেরা এবং অপরভাগে থাকে টুয়ানপাই- হু জিনতাও এর মতো যারা সাধারণ পরিবেশ থেকে কমিউনিস্ট ইয়ুথ লিগের মাধ্যমে উঠে আসেন। আবার কোন কোন বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিগত আনুগত্য এবং মিত্রতার ভিত্তিতে সৃষ্ট আরও জটিল একটি প্রবাহের কথা বলেন, যে চক্রে তিনটি দলের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই চলে। প্রথম দলে আছেন অবসরপ্রাপ্ত নেতারা, যেমন ডেং জিয়াওপিং যিনি হু জিনতাও কে সমর্থন দিয়েছেন। দ্বিতীয় দলে চীনের শীর্ষ সরকারী কর্মকর্তা এবং তৃতীয় দলে আছেন অর্থ আয়কারী ধনী সমাজ।  মিনক্সিন পেই, ক্লেরমন্ট ম্যাকানা কলেজের একজন চীন বিশেষজ্ঞের মতে সিসিপির সকল নেতারই কিছু না কিছু ব্যক্তিস্বার্থ আছে এবং প্রায়শ সেগুলোর মাঝে সংঘর্ষ বাঁধে। ত্রিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদল সম্পন্ন করা যায়।

ক্ষমতার পালাবদল প্রক্রিয়ায় বিশৃঙ্খলা এবং শি জিনপিং এর দুর্নীতি বিরোধী অভিযান এর মাধ্যমে এরূপ জটিল ঘটনা প্রবাহের পর্যবেক্ষণ করা যায়। এই অভিযানের ফলাফল অভূতপূর্ব।  ২০১৩ সাল থেকে এই অভিযান একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যক্তিত্বকে আইনের আওতায় এনেছে, এদের মধ্যে আছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট হু জিনতাও এর উপদেষ্টা লিং জিহুয়া, তার ভাই চোংকিং পার্টির প্রধান বো জিলাই এবং তার স্ত্রী, সামরিক বাহিনীর সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা শু চাইহোউ , গো বশিওং-যিনি পলিটব্যুরো স্থায়ী কমিটির সাবেক সদস্য এবং সিসিপির আইন ও রাজনীতি বিষয়ক কমিটির প্রধান।

দল থেকে বোকে বহিষ্কার এবং পরবর্তীকালে তার বিচার পার্টির মধ্যে তীব্র ক্ষমতার লড়াই এর বহিঃপ্রকাশ। অভিজাত রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গকে লক্ষ্য করে চালানো দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শি জিনপিঙের রাজনৈতিক অভিসন্দির অংশ বলে অনেকে মনে করেন। এটা তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীদের নির্মূল করার একটি ব্যাপক উদ্দেশ্য বলে মন্তব্য করেন প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যারন ফ্রিডবার্গ। তিনি এও মন্তব্য করেন, এই ঘটনা এটারই জানান দেয় যে উঁচু মহলের দুর্নীতি দেশটিতে আর সহ্য করা হবে না।

 

সুশাসনের পথে অন্তরায়সমূহঃ

গত কয়েক দশকজুড়ে সংঘটিত বৈশ্বিক ঘটনাপ্রবাহ এবং দলের মধ্যে অন্তর্কলহ বেশ কয়েকবারই সিসিপির সামনে শক্তিশালী বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৯৮৯ সালে গণতন্ত্রের দাবিতে তিয়েনআনমেন স্কয়ারে বিক্ষোভ এবং ১৯৯০ এর সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙ্গন দলটির মধ্যে অস্তিত্বের সঙ্কট সৃষ্টি করে। এর ফলে সিসিপি বাধ্য হয় তার ম্যান্ডেট পুনর্বিবেচনা করে দেখতে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের কারণ খুঁজে বের করতে দলটি পর্যায়ক্রমিক অনুসন্ধান চালায় এবং নিজেদের পুনর্গঠিত করে। তারা এটা বুঝতে পারে যে একটি গৎ বাঁধা পার্টিকেন্দ্রিক রাষ্ট্র, প্রাচীন ধ্যান ধারণা, একগুঁয়ে অভিজাত সমাজ, সুপ্ত রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং স্থবির অর্থনীতি দেশটিতে ধ্বংসের সূচনা ঘটাবে। সুত্রঃ  চীনা কমিউনিস্ট পার্টি, ডেভিড শাম্বাউ, ২০০৮।

সেসময় থেকেই সিসিপি দেশটির চোখধাঁধানো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে সামাজিক অগ্রগতির সামঞ্জস্য রাখতে বিভিন্ন টেকনোক্রেটিক পদ্ধতি অবলম্বন করে আসছে। আজকে দলের মূল উদ্দেশ্য হল, বিশ্বায়নের পথে অগ্রসর হওয়া, যা বিনিময়ে দেশটিতে দেবে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, অধিক মুনাফা এবং রাজনৈতিক নিরাপত্তা, এমনটি রিচার্ড ম্যাকগ্রেগর ২০১০ সালে তাঁর বই দ্যা পার্টিতে লিখেন।

১৯৮০ সালে ডেং জিয়াওপিং  যে দূরদর্শিতা দেখিয়েছেন, আজও চীনের প্রথম সারির রাজনৈতিক নেতারা তার অভাবে ভুগেন। সিসিপির এই সাবেক মহাসচিব দলটিতে স্বচ্ছতার প্রণয়ন করেন এবং চীনকে মুক্ত বাজার অর্থনীতির সাথে যুক্ত করেন।

চীনা সরকারের প্রতিনিধি পেই বলেন, তারা (বর্তমান রাজনীতিবিদেরা) মূলত প্রতিক্রিয়াশীল। সিসিপি আজ পর্যন্ত টিকে আছে শুধুমাত্র ৩০ বছর পূর্বের নেতাদের জন্য। আজকের নেতারা শুধু তাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবেন।

দলটিতে সামাজিক অরাজকতার ভয় সদা বিরাজমান। ২০১৩ এর বসন্তে ডকুমেন্ট নম্বর ৯ নামে একটি প্রচারপত্র সিসিপির মাঝে বিতরণ করা হয় যেখানে পার্টির জন্য বিপদজনক এরকম সাতটি  উপাদানকে চিহ্নিত করা হয়, যার মধ্যে আছে পশ্চিমা ধারণার গণতন্ত্র, মানবাধিকার, মার্কেটমুখী নিওলিবারিলিজম, পশ্চিমা মদদপুষ্ট প্রচারমাধ্যম এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতা। এই ডকুমেন্ট পার্টির মধ্যেকার ভয়ের বিষয়গুলোকে তুলে ধরে, যেমন অর্থনৈতিক মন্দা এবং দুর্নীতির মতো গণরোষ সৃষ্টিকারী উপাদান।

পেই বলেন, চীনের শাসনব্যবস্থা প্রকৃতপক্ষে যথেষ্ট বিকেন্দ্রীভূত হতে পারে। পলিটব্যুরোর সদস্যদের মূল দায়িত্ব শুধু পলিসি নির্ধারণ এবং মন্ত্রিদের নিয়োগ প্রদান। তারা মন্ত্রিসভার সদস্যদের মতো দৈনিক কাজের হিসাব রাখেন না। চীনের প্রদেশগুলো সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন পায় এবং কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত উপপ্রাদেশিক নেতৃবৃন্দ শাসন ব্যবস্থার সম্পূর্ণটাই নিয়ন্ত্রণ করেন। এরূপ আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পলিটব্যুরো কমিটির মাঝে, উপদেষ্টামণ্ডলী এবং চিন্তাবিদদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্নভাবে নীতিমালার উদ্ভব হতে পারে।

জবাবদিহিতার অভাবে সমাজে আয় বৈষম্য, ভোক্তাঅধিকারে বাঁধা, ভুমি দখল এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো অপরাধের সৃষ্টি হয়েছে।  এর অনেকগুলোই ইন্টারনেটের বদৌলতে সবার কাছে প্রকাশ পেয়ে গেছে এবং এর ফলে সিসিপি রাজনৈতিক যোগাযোগের উপরে তাদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। ঋণগ্রস্ত স্থানীয় সরকার কর্তৃক ডেভেলপারদের কাছে জমি বেঁচে মূলধন উঠানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। চেন গুয়াংচেং, একজন অন্ধ আইনজীবী যিনি জোরপূর্বক বন্ধ্যাকরণ এর অপরাধ ফাঁস করে দিয়েছেন। তিনি স্থানীয় সরকারের দুর্নীতি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো বিষয়গুলোর প্রতিবাদে নাগরিক পতাকা উত্তলনের ডাক দিয়েছেন। ভোক্তারা যখন নষ্ট হয়ে যাওয়া দুধ ও মাংস নিয়ে তাদের ক্ষোভের প্রকাশ ঘটালেন, কেন্দ্রীয় সরকার তখন চীনা খাদ্য পণ্যের ব্যাপারে তাদের দীর্ঘদিনের নীতিমালাপ্রয়োগে বাধ্য হল।

 

স্বরাষ্ট্র এবং পররাষ্ট্রনীতিঃ

দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট ব্যাপক আয়বৈষম্য সমাধানে  সিসিপির ভূমিকাকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়। ২০১২ সালের মাঝামাঝি আয় বৈষম্য কমিয়ে আনতে দলটি একটি নতুন আয়বণ্টন পরিকল্পনা প্রণয়ন করে। অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভাবের ফলে চীনে একটি বিস্তৃত মধ্যবিত্ত সমাজের সৃষ্টি হয়েছে, এর ফলে সুশাসনের পথে দৃশ্যমান বাঁধাগুলো  সরকারের সামনে এখন পরিষ্কার। পিউ রিসার্চ সেন্টারের মতে, দ্রুত প্রবৃদ্ধির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে দেশটিতে ধনী দরিদ্রের ব্যবধান, দ্রব্যমূল্য ,পরিবেশ দূষণ ইত্যাদি বেড়েছে, পশ্চিমা সংস্কৃতির আগ্রাসনে সাংস্কৃতিক অবনমন হচ্ছে এবং রাজনৈতিক দুর্নীতি বিষয়ে জনরোষ বাড়ছে।

২০০০ সালের শুরুতে দেশটির প্রবৃদ্ধি ছিল দুই অঙ্কের যা বর্তমানে কমে এক অংকের ঘরে এসে দাঁড়িয়েছে। নীতিমালা প্রণয়নকারীদের জন্য চীনের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সংকোচন অনেক বড় একটি মাথাব্যাথা। দেশের মানুষকে ব্যয় বৃদ্ধিতে উদ্বুদ্ধ করতে এবং প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর জন্য আমদানি নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে তারা নীতিমালা পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।  ২০১৩ সালে কমিউনিস্ট পার্টির গুরুত্বপূর্ণ একটি মিটিঙে (থার্ড প্লেনাম) রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে বাজারব্যবস্থায় প্রভাব ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কিন্তু একাধিক বিশ্লেষকের মত হচ্ছে, বাস্তবে চীনের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা খাত হুমকির সম্মুখীন। ২০১৫ সালের গ্রীষ্মে চীনা স্টক মার্কেটে ব্যাপক দরপতন, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে দলটির সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। স্টক বিক্রি বন্ধে সরকারের হস্তক্ষেপ এবং একই বছরে দ্বিতীয়বারের  মতো মুদ্রামানের অবনমন সত্ত্বেও চীনের বাজারে অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে।

অর্থনীতিতে চাঙ্গাভাব জাগাতে বেশ কিছু ক্ষুদ্র প্রকল্প হাতে নিলেও,২০১৪ সালে চীন তার ৭.৫% প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে শতাংশের দশ ভাগের এক ভাগ পর্যন্ত ব্যর্থ হয় যা দেশটির চব্বিশ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ধীর অর্জন। প্রবৃদ্ধির নিম্নমুখী আচরণ হিসাব করে, ২০১৫ সালে বেইজিং ৭% প্রবৃদ্ধি অর্জনের সাধারণ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

দলটি স্বাস্থ্যখাতেও ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, কারণ তার সামনে বিশাল একটি বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য ইনস্যুরেন্স সুবিধা প্রদান করার পরিকল্পনা রয়েছে। কন্সাল্টিং সংস্থা ম্যাকিন্সি এন্ড কোম্পানির হিসাবে, স্বাস্থ্য খাতে দেশটির ব্যয় ২০১১ সালের $৩৫৭ বিলিয়ন থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২০ সালে $১ ট্রিলিয়ন হতে পারে।

আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ কমাতে চীন তার প্রণীত নীতিমালা নিয়ে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করেছে। এতে ক্লিন এনার্জি বিষয়ে দেশটির পরিকল্পনা বিবৃত আছে। চীনের আকাশে ভারী ধোঁয়া (স্মগ) এর স্তর দেশটিকে বায়ুর মান বাড়াতে এবং দূষণমুক্ত শক্তির উৎস খুঁজতে বাধ্য করেছে। ২০১৩ সালের জুনে দেশটির সরকার বায়ুমান বৃদ্ধিতে আগামী পাঁচ বছরের জন্য $ ২৭৫ বিলিয়ন বিনিয়োগের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে যার মধ্যে আছে দেশটির প্রথম কার্বন মার্কেট নির্মাণের পরিকল্পনা। বায়ু মান বিষয়ে স্থানীয় জনগণের মাঝে সচেতনতা বাড়াতে এবং পরিবেশ দূষণ বিষয়ক মামলাগুলোর বিচার দ্রুত নিষ্পন্ন করতে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং শক্তি সঞ্চয় নিশ্চিত করতে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে বেইজিং কয়লার মানের পরিবর্তে দামের উপরে কর নির্ধারনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এর মধ্যে চীনের ক্রমবর্ধমান ক্ষমতা বিশ্বজুড়ে দেশটিকে একটি আগ্রাসী, প্রভাববিস্তারকারী শক্তির তকমা জুটিয়ে দিচ্ছে। বেইজিং, পীতসাগরে যুক্তরাষ্ট্র এবং দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়ার পরিকল্পনা এবং যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রয়ের ঘোর প্রতিবাদ জানিয়েছে। পূর্ব এবং দক্ষিণ চীন সাগরের অনেক দ্বীপে দেশটি তার মালিকানা দাবি করেছে, যার ফলে ঐ এলাকায় জাপান এবং এর পার্শ্ববর্তী চারটি দেশের সাথে চীনের কূটনৈতিক দ্বন্দ্বের অবতারণা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং তার এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় মিত্রদেশ জাপান, ফিলিপাইন এবং ভিয়েতনামের মধ্যে সামরিক সম্পর্ক জোরদারের জবাবে চীনও এই এলাকায় তার নৌশক্তি বৃদ্ধি করেছে।

নভেম্বর ২০১৩ সালে চীন, পূর্বচীন সাগরে আকাশ প্রতিরক্ষা চিহ্নিতকরণ অঞ্চল ঘোষণা করেছে, ঐ এলাকায় তেল এবং গ্যাস অনুসন্ধান চালিয়েছে এবং অমীমাংসিত জলসীমায় অনেকগুলো দ্বীপের মালিকানা দাবী করেছে। অন্যদিকে চীন তার প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। ২০১৪ আসিয়ান সামিটে চীন একটি মিত্রতা চুক্তির প্রস্তাবনা এনেছে এবং দক্ষিণপূর্ব এশিয়ান দেশগুলোর জন্য  $২০ বিলিয়নের একটি ঋণ প্রস্তাব পেশ করেছে। ২০১৪ সালের অর্থনৈতিক কর্পোরেশন সামিটে চীন এবং জাপানের নেতৃবৃন্দ বিগত দুই বছরের মধ্যে প্রথমবার কূটনৈতিক আলোচনায় অংশ নিয়েছেন, এরফলে নতুন করে চীন-জাপান সম্পর্ক উন্নয়নের একটি সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

কোন কোন বিশেষজ্ঞের মত হল অর্থনৈতিক প্রগতির সাথে সাথে চীনের বহুবিধ ক্ষমতার বৃদ্ধি হলেও এর পররাষ্ট্রনীতি মূলত এখন রক্ষণশীলঃ বাহ্যিক প্রভাব থেকে দেশকে মুক্ত রাখা, স্থলসীমা সুরক্ষিত রাখা এবং অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা চালু রাখা। ফরেন অ্যাফেয়ার্সের অ্যান্ড্রু জে নাথান এবং অ্যান্ড্রু স্কোবেল বলেন, পূর্বের তুলনায় বর্তমানে চীন বিশ্বঅর্থনৈতিক প্রক্রিয়ার সাথে আরও উতোপ্রোতভাবে জড়িত। একারণে এর আঞ্চলিক এবং প্রাদেশিক চাহিদাগুলো এখন বেশি করে দেশটির বৃহত্তর লক্ষ্য অর্জনের সাথে সম্পর্কিত।এই বৃহত্তর লক্ষ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এমন একটি বৈশ্বিক ভূমিকা পালনের স্বপ্ন যা একি সাথে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে এবং অন্যান্য পরাশক্তির সমর্থন আদায়ে সফল হয়।

সাদা চোখে বলতে গেলে চীনের নতুন নেতৃত্বের লক্ষ্য হওয়া উচিত যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি বিদ্বেষপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি থেকে বিরত থাকা। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের অভিমত, চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক ততদিন পর্যন্ত শীতল থেকে যাবে যতদিন চীনের পররাষ্ট্র ও রাজনীতিতে আমূল  পরিবর্তন না আসবে এবং এর সূচনা হবে প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে তার সম্পর্ক উন্নয়নের দ্বারা।

ফরেন অ্যাফেয়ার্সের মতে, এরপরেও যুক্তরাষ্ট্রের উচিত চীনের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্পর্ক তৈরি হতে বিরত থাকা। কারন এতে শি জিনপিং এর পশ্চিমা বিরোধী মতই জোরালো সমর্থন পাবে, অথচ এতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এবং যারা চীনকে নিরন্তর মধ্যপন্থা অবলম্বনের পথে ঠেলছে তাদের কোন লাভ হবে না।

 

অননূদিত প্রবন্ধটি পড়তে ক্লিক করুন : http://www.cfr.org/china/chinese-communist-party/p29443

ওবামা, সিরিয়াকে রুবিকন ভাববেন না।

অতিথি লেখাঃ বোগডান বেলেই কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স এর সেন্টার ফর প্রিভেনশন অ্যাকশন এ একজন খণ্ডকালীন কর্মী হিসেবে কাজ করছেন।

 জুলিয়াস সিজার ৪৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে যখন রোম আক্রমণে অগ্রসর হচ্ছিলেন, তখন রুবিকন অতিক্রম করার আগে তাঁকে থামতে হয়েছিলো। তাঁর অধীনে কেবল একটি মাত্র সৈন্যদল ছিল এবং তারা পম্পেই এর সৈন্যদলের তুলনায় সংখ্যায় ছিল অর্ধেক। রোম অভিমুখে অভিযান অব্যাহত রাখায় সিজারের সামনে পরাজয়ের সম্ভাবনা ছিল প্রকট। কিন্তু এরপরেও সিজার তাঁর সৈন্যদলকে নিয়ে রোম বিজয় করেন এবং রোমান সাম্রাজ্যকে সুসংহত করেন। প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই করার অনুপ্রেরণা সিজার বাস্তবতার মধ্যে খুঁজে পেয়েছিলেন, কারণ তাঁর সামনে বিজয়ের একটি মাত্র বিকল্প ছিল, সেটি হল আত্মসমর্পণ।

বর্তমানে ওবামা প্রশাসন সিরিয়াতে অনুরূপ একটি অবস্থার সম্মুখীন হয়েছে যার পিছনে মূল কারণ স্বঘোষিত ইসলামিক স্টেট বা আই এস’কে ধ্বংস করার জন্য তাদের কৌশলগত অবস্থান। একইসাথে প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের অপসারণের দাবিতে তাদের অনড় অবস্থান, সিরিয়া বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কার্যকরী ভূমিকা রাখার পথে প্রধান অন্তরায়। ওবামা যখন ২০১১ সালে প্রথম বাশার আল আসাদের অপসারণ দাবি করেছিলেন, এর পর থেকে ঘটনার প্রেক্ষাপট ও মূল নিয়ামকে অনেক পরিবর্তন এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র আই এস বা আসাদের অপসারণ, কোনটির জন্যই প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক বা আর্থিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমেরিকার  কৌশল সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ থামানোর পক্ষে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারছেনা। যুক্তরাষ্ট্র যদি প্রকৃতপক্ষেই সিরিয়ার অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে চায়, তার সামনে বেশ কিছু পদক্ষেপ আছে যার মাধ্যমে দেশটিতে গৃহযুদ্ধের অবসান এবং প্রতিপক্ষ দেশগুলোর সাথে অপ্রয়োজনীয় সংঘাত থামানো সম্ভব।

প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত আসাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত বিদ্রোহীদের কাছে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করা । এইসাথে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত হবে উপসাগরীয় দেশগুলো যেমন কাতার ও সৌদি আরবকেও বিদ্রোহীদের কাছে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করতে উদ্বুদ্ধ করা। গত ৪ বছরে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা যত বিদ্রোহীদের প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্র সরবরাহ করেছে তারা আই এস কিংবা আসাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তাদের ভূমিকা রাখতে পারেনি। পেন্টাগনের “ট্রেইন এন্ড ইকুইপ” – প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্রসরবরাহকরণ কর্মসূচির ফলস্বরূপ জুলাই  ১২ এবং সেপ্টেম্বর ২০ এ যেসব আমেরিকাপন্থি বিদ্রোহী সিরিয়ায় গিয়েছে, তারা সেখানে পৌঁছেই আক্রমণের শিকার হয়েছে এবং নিরস্ত্র হয়ে গেছে।এমনকি কিছু বিদ্রোহী আল কায়েদা ও আই এস’এ যোগদান করেছে। এই কৌশল যুক্তরাষ্ট্রকে তার অভীষ্ট লক্ষ্যের কাছাকাছিও নিয়ে যেতে পারেনি। বরঞ্চ এর প্রতিপক্ষ দেশগুলো এই সঙ্ঘাতে তাদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করেছে।

ওবামা প্রশাসনের এখন উচিত হবে একটি রাজনৈতিক সমাধানের পথে হাঁটা। জেনেভায় সাম্প্রতিক আলোচনা বর্তমান সামরিক অচলাবস্থার কারণে কোন অগ্রগতি ব্যতীতই শেষ হয়েছে। আলোচনার টেবিলে যুক্তরাষ্ট্রকে আবার ফিরে আসতে হবে এবং রাশিয়া ও ইরানের সাথে সরাসরি আলোচনায় অংশ নিতে হবে। এটা সত্যি যে, সিরিয়ার আকাশে রাশিয়ার বিমান হামলা এবং আসাদের পক্ষে ইরানের রেভুলিউশনারি গার্ডের অবস্থান গ্রহণের ফলে সঙ্কট আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। সিরিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে রাশিয়া এবং ইরান উভয় দেশেরই কৌশলগত স্বার্থ আছে। এ ক্ষেত্রে মস্কো কিংবা তেহরান, কেউই রাজনৈতিকভাবে আত্মঘাতী নয়।

রাশিয়ার আক্রমণের পিছনে কারণ হল, তারতুস এবং লাটাকিয়া বন্দরে নিজেদের দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থরক্ষা এবং দামেস্কে নিজেদের মিত্রকে রক্ষা করা। দুটি স্বার্থই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার উপরে নির্ভরশীল এবং যুক্তরাষ্ট্র যদি সিরিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে নমনীয় আচরণ দেখায় তবে রাশিয়া সামরিক হস্তক্ষেপ গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতে রাজি আছে। হেগ সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডি এর বিশ্লেষক সিজব্রেন ডি জং বলেন, আসাদ থাকবে কি থাকবে না সে বিষয়ে রাশিয়ার কোন মাথাব্যাথা নেই। তারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে চায় এবং ভূমধ্যসাগরে তাদের নিয়ন্ত্রণ চায়।

ইরান আসাদ ইস্যুতে রাশিয়ার চেয়ে বেশি আগ্রহী। কারণ মিত্রতার পাশাপাশি সিরিয়া ইরান ও হিজবুল্লাহ’র অন্যতম স্থলপথ এবং এই অঞ্চলে সৌদি আরবের সাথে দ্বন্দ্বে আসাদ বাহিনী ইরানের সহচর। কিন্তু ২০১১ সালের পর থেকে আসাদকে সহায়তা করার মূল্য ক্রমশ বেড়ে চলেছে এবং ইরান এর থেকে একটু হলেও মুক্তির প্রস্তাবকে স্বাগত জানাবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি সৌদি আরবকে সফলভাবে নিজেদের অস্ত্র কমানো ও সুন্নি বিদ্রোহীদের সহায়তা প্রদান করা থেকে বিরত রাখতে পারে, ইরানও সিরিয়া বিষয়ে নিজেদের সম্পৃক্ততা কমাতে রাজি হবে।

তৃতীয়ত, যেকোনো আলোচনার মূল বিষয় মানবিক বিবেচনার দিক থেকে দেখতে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত হবে সিরিয়ার উত্তরপশ্চিমে তুরস্ক সীমান্তে একটি নিরাপদ এলাকা  তৈরি করা। এই নিরাপদ এলাকা বা “সেফজোন” বেসামরিক জনগণের জন্য মানবিক করিডর হিসেবে ব্যবহৃত হবে এবং এটাকে সফল করার জন্য স্থল ও আকাশ নিরাপত্তা বাহিনী, মানবিক সাহায্যকারী সংস্থা এবং বিবাদমান দেশগুলোর সহায়তা দরকার। এই উদ্যোগ তখনি নেয়া সম্ভব হবে যখন সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিহতকরণে কূটনৈতিক আলোচনা কার্যকরী ভূমিকা রাখবে। এই নিরাপদ এলাকায় সিরিয়া কিংবা রাশিয়ার বিমান চলাচল বন্ধ থাকবে, যাতে করে সাধারণ বেসামরিক জনগণ শুধু বিমান হামলা থেকেই নয়, স্থলবাহিনীর আক্রমণ, রকেট কিংবা মিসাইল হামলা থেকে নিরাপদ থাকে এবং তাদের মানবিক সহায়তা প্রদান করা যায়।

একটি সেফ জোনের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হল বিভিন্ন পক্ষের সম্মতিপ্রদান। এই প্রক্রিয়া তখনি সফল হবে যখন পর্যাপ্ত মানবিক সাহায্য এবং স্থল বাহিনীর সাহায্য পাওয়া যাবে। ১৯৯২ সালের ঘটনা থেকে আমরা দেখি, সার্বরা যখন  স্রেব্রেনিকাতে জাতিসংঘের নিয়ন্ত্রণাধীন সেফহেভেন দখল করে, সামরিক সহায়তার অভাবে বেসামরিক জনগণকে রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। একটি নিরাপদ এলাকা ( সেফ জোন) গঠনে ফ্রান্স ও তুরস্ক  ইতিমধ্যে সামরিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কারণ সিরিয়ার শরণার্থী সমস্যার জন্য ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এবং তুরস্কই সবচেয়ে বেশি ভুগছে। বহুজাতিক সম্মতিক্রমে গঠিত একটি নিরাপদ এলাকা তথা সেফজোনের ভিতরে কিংবা আশে পাশে কোন সংঘাতময় ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে বিতর্কের ঝড় তুলবে এবং এতে করে ইরান ও রাশিয়ার দায়ভার আরও বেড়ে যাবে।

সিরিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠা করার জন্য  মার্কিন কৌশলকে বর্তমান লক্ষ্য থেকে সরে আসতে হবে। কারণ এর জন্য যে সম্পদ ও সামরিক সক্ষমতা প্রয়োজন তা বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সম্ভব নয়। ফলে বিদ্রোহী গ্রুপগুলোকে সহায়তা প্রদান বন্ধ করতে হবে, রাজনৈতিক সংলাপ চালিয়ে যেতে হবে এবং শরণার্থীদের মানবিক আবেদনে  সবগুলো দেশকে সাড়া দিতে হবে। সিরিয়ার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিরূপণে এছাড়া কোন বাস্তবসম্মত উপায় নেই। সিজারের সৈন্যবাহিনী দুটি কারণে রুবিকন অতিক্রম করেছিল, পরাজয়ের আশংকা এবং রোমান সাম্রাজ্য দখলের স্বপ্ন। সিরিয়াতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এর কোনটিই অপেক্ষা করছে না।

অননূদিত প্রবন্ধটি পড়তে ক্লিক করুন : blogs.cfr.org/zenko/2015/11/20/guest-post-obama-dont-cross-the-rubicon-in-syria/

পুনর্বন্টন নাকি অন্তর্ভুক্তি ?

রিয়াদ- আয় বৈষম্য বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি দাভোসে অনুষ্ঠিত এবারের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। এটা জানা কথা যে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি গত তিন দশকে যথেষ্ট উন্নতি করেছে। কিন্তু সেখানে মধ্যবিত্ত পরিবারের আয় তেমন বাড়েনি। অধিকাংশ সম্পদ ১ শতাংশ মানুষের (আসলে উচ্চবিত্ত ০.১ শতাংশ) হাতে। তবে সমাজের মানুষ এই অবস্থা আর বেশিদিন সহ্য করবে না।

অনেকে এটাকে একটা বৈশ্বিক অবস্থা ভেবে উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে, সর্বত্র এটি একই কারণে ঘটছে। এটিই থমাস পিকেটির জনপ্রিয় বই “ক্যাপিটাল ইন টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি”র প্রধান দাবি । কিন্তু এই প্রস্তাব মারাত্নক বিভ্রান্তিকর হতে পারে।

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে উৎপাদনশীলতায় অসমতা আর একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে আয় বন্টনে অসমতা, এদুটোর পার্থক্য নির্ণয় করা খুবই জরুরি। শ্রম আর পুঁজির গতানুগতিক লড়াইটি মূলত দ্বিতীয়টি কেন্দ্রিক অর্থাৎ শ্রমিক আর মালিকের প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ভাগাভাগির লড়াই । কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদনশীলতায় এখনো গভীর অসমতা রয়ে গেছে। তার মানে সম্পদের পরিমাণ বিবেচনায় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ব্যাপক তারতম্য রয়েছে । এটা বিশেষ করে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রে সত্য। সেখানকার প্রদেশ বা রাজ্যগুলোতে একটি উপকরণের উৎপাদনশীলতার মধ্যে পার্থক্য খুঁজে পাওয়া খুবই স্বাভাবিক, পৌর এলাকাগুলোতে এই পার্থক্য অনেক বেশি হয়।

অসমতার সম্পূর্ণ ভিন্ন এই দুটো উৎসকে প্রায়ই এক করে ফেলা হয়। ফলে একটিকে বোঝার ক্ষেত্রে আরেকটি প্রতিবন্ধক হয়ে উঠে । অবশ্য বিষয় দুটি আধুনিক উৎপাদনব্যবস্থার কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্যের সাথে সম্পর্কিত। তা হল উৎপাদনব্যবস্থায় অনেকগুলো সম্পূরক উপকরণ দরকার হয়। এর মধ্যে যে শুধু স্থানান্তরযোগ্য কাঁচামাল আর মেশিন থাকে তা নয়। কিছু বিশেষায়িত দক্ষতা, অবকাঠামো এবং নিয়ম-কানুনও প্রয়োজন হয়। সেগুলো খুব সহজে স্থানান্তর যায় না এবং সেজন্য সেগুলোকে একটু অন্যভাবে সংস্থাপন করতে হয়। এসব উপকরণের যেকোন একটির অভাব উৎপাদনব্যবস্থায় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

আধুনিক উৎপাদনব্যবস্থার এই সম্পূরক চরিত্র অনেক উন্নয়নশীল দেশকে এর জন্য অনুপযুক্ত করে ফেলে। কারণ কিছু প্রধান উপকরণ সেখানে অনুপস্থিত। এমনকি শহরের অভ্যন্তরে অনুন্নত অঞ্চলগুলো অনেক বেশি বিচ্ছিন্ন এবং সেখানকার সুযোগ-সুবিধা অপর্যাপ্ত থাকার কারণে উৎপাদনক্ষমতা বিপর্যস্ত হয়। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দক্ষতায় বিশাল অসমতা বিরাজ করে এবং এর ফলে আয়বন্টনের ক্ষেত্রেও অসমতা দেখা যায়।

উৎপাদনশীলতায় এই সীমাবদ্ধতা রেখে পুনর্বণ্টনে সাময়িক সমাধান হবে কিন্তু সমস্যার প্রতিকার হবে না। সমস্যা সমাধানে প্রয়োজন অন্তর্ভুক্তিতে বিনিয়োগ করা, মানুষকে দক্ষ করে তোলা এবং তাদেরকে উপকরণ ও নেটওয়ার্কের সাথে সম্পৃক্ত করা যা তাদেরকে উৎপাদনশীল করে তুলবে ।

সঙ্কটের মূল জায়গাটি হলো দরিদ্র দেশগুলো উৎপাদনের সকল উপকরণকে সর্বত্র পর্যাপ্ত পরিমাণে রাখতে পারে না । তারা দুটি বিকল্পের যেকোনো একটি গ্রহণ করতে পারে। হয়ত তারা অল্প জায়গায় সবগুলো উপকরণ ব্যবহার করছে এবং সেখানে অনেক বেশি উৎপাদন করছে। অথবা অল্প কিছু উপকরণকে সর্বত্র ব্যবহার করছে এবং সব জায়গায় খুবই অল্প পরিমাণে উৎপাদন করতে পারছে। একারণেই উন্নয়ন অসম হয় ।

আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থার আরেকটি সমস্যা হচ্ছে, উৎপাদনের সবগুলো উপকরণের মাধ্যমে অর্জিত আয় বন্টন করা। বর্তমানে উৎপাদন প্রক্রিয়া শুধু ব্যক্তির দ্বারা সম্পন্ন হয়না, এমকি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের একটি দল দ্বারাও নয় বরং সম্মিলিতভাবে অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান বা পুরো ভ্যালু চেইনের দ্বারা সম্পন্ন হয়। সমসাময়িক কোন সিনেমার শেষে তার কৃতিত্ব তালিকার দিকে তাকালেই এটা বোঝা যায়। সম্পূরকতা এভাবে এক ধরণের বরাদ্দের সমস্যা তৈরি করে । একটি পরিপূর্ণ পণ্যের জন্য কাকে কতটা কিভাবে স্বীকৃতি দেয়া উচিত?

অর্থনীতিবিদদের প্রচলিত বিশ্বাস যে , দলের প্রত্যেক সদস্যকে তার সুযোগ ব্যয়ের সমান মজুরি দেয়া হয়। এর অর্থ হলো যদি তাকে দল থেকে বের করে দেয়া হত তবেই তিনি তার সর্বোচ্চ আয় করতেন। বাজার যদি প্রতিযোগিতাপূর্ণ (পারফেক্ট কম্পিটিশন) হয় , তাতে যদি সকল উপকরণের সুযোগ ব্যয় পরিশোধ করা হয়, তাহলে বন্টন করার জন্য আর কিছু বাকি থাকে না । কিন্তু বাস্তবে দল সম্মিলিতভাবে অনেক বেশি মূল্য ধারন করে- একটি দলের সদস্যদের সুযোগ ব্যয়ের চেয়ে অনেক বেশি।

এই ‘দলগত উদ্ধৃত্ত’ কার পকেটে যাচ্ছে? প্রথাগতভাবে এটা ধরে নেয়া হয় যে, শেয়ারহোল্ডাররা এর ভাগ পাচ্ছেন। কিন্তু পিকেটি এবং অন্যান্যরা এটা দেখিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রে সিইওদের বেতন ও কর্তৃত্ব অত্যাধিক বেড়ে গিয়েছে। যদি তারা এই উদ্বৃত্তের ভাগ না পান তাদের দক্ষতা দল ভাঙার ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হতে পারে। সর্বোপরি, চাকরিচ্যুত সিইওদের আয়ের ধারায় আকষ্মিক পতন এটাই নির্দেশ করে যে , তাদেরকে তাদের সুযোগ ব্যয়ের চেয়েও অনেক বেশি মূল্য দেয়া হয়।

সফল স্টার্টআপগুলোর ক্ষেত্রে, এগুলোকে যখন কেউ কিনে নেয় অথবা স্টার্টআপগুলো যখন পাবলিক লি: কোম্পানিতে পরিণত হয় তখন এর থেকে প্রাপ্ত অর্থ সাধারণত উদ্যোক্তার হস্তগত হয়। গতানুগতিক ভ্যালু চেইনে বাজারে যার ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি উদ্বৃত্ত তার কাছেই যায় । বিজনেস স্কুলগুলো তাদের শিক্ষার্থীদের সেই সব উপকরণগুলোতে পারদর্শিতা অর্জন করতে শেখায় যা অন্যদের জন্য সরবরাহ করা কঠিন। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদেরকে ভ্যালু চেইনের সর্বোচ্চ উদ্বৃত্ত হস্তগত করতে শেখায়। অন্যান্য উপকরণগুলো যাতে কমোডিটাইজড হয় এবং সেগুলো তাদের সুযোগ ব্যয়ের বেশি হস্তগত করতে না পারে তা নিশ্চিত করতেও শেখায় ।

সম্পদ যার প্রাপ্য তিনি পাচ্ছেন না। পিকেটি দেখিয়েছেন, ফ্রান্স ও অন্যান্য দেশগুলোতে ‘পুঁজি’র উত্থান হয়েছে প্রধানত ভূমি এবং স্থাবর সম্পত্তির দাম বাড়ার ফলেই , শুধু নেটওয়ার্ক ভিত্তিক অর্থনীতিতে ভাল জায়গাগুলো অনেক মূল্যবান হয়ে উঠেছে বলে । ভূমির মত, বর্তমানে মেধাস্বত্ব অধিকারের আমলে পুরনো আইডিয়ার ব্যাপারে অতি-সংরক্ষণবাদী হলে সেগুলো বাজার ক্ষমতা পেতে পারে। পুরনো আইডিয়ার এই বাজার ক্ষমতা বৈষম্যকে শুধু বাড়াবেনা বরং উদ্ভাবনী শক্তিরও ক্ষতি করবে।

এর মানে হচ্ছে সমতা নিশ্চিত করতে যে উপকরণগুলো দলগত উদ্বৃত্ত হস্তগত করে সেগুলোকে নিজের অধীনে রেখে বা সেগুলোর উপর কর বসাতে হবে। এই বিষয়টি মাথায় রেখেই সমতা নিশ্চিত করার নীতি গ্রহণ করতে হবে। স্বল্প কর ব্যবস্থা সত্ত্বেও সিঙ্গাপুরে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী একটি সরকার রয়েছে। এর একটি কারণ হচ্ছে সরকারের সফল নীতি গ্রহণ, যা ভূমি ও স্থাবর সম্পত্তির মূল্য বাড়িয়েছে এবং সরকার তার অধীন সম্পত্তিগুলো থেকে বড় রকমের রাজস্ব আয় করেছে।

একইভাবে কলাম্বিয়ার সিটি অব মেডেলিন তাদের নিজস্ব ইউটিলিটি কোম্পানির লাভ থেকে অর্থসংস্থান করে। এটি এখন একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে। অর্থনীতিবিদ দানি রডরিক সম্প্রতি পরামর্শ দিয়েছেন যে, সরকারের উচিত পাবলিক ভেঞ্চার ফান্ডগুলোতে বিনিয়োগ করা এবং এর লাভ থেকে নিজেদের খরচ চালানো। এতে করে উদ্ভাবন থেকে প্রাপ্ত আয়ের সামাজিকীকরণ ঘটবে।

অনেকেই বলেন, হস্তগত এই উদ্বৃত্ত আয়ের পুনর্বণ্টনে সাহায্য করে। অন্তর্ভূক্তিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে এর চেয়ে অনেক বেশি এবং স্থায়ী সফলতা অর্জন সম্ভব। পরিশেষে, এই অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন সমৃদ্ধ এবং সমতাভিত্তিক সমাজ নির্মাণ করতে পারে। অন্যদিকে পুনর্বণ্টন অন্তর্ভূক্তি বা প্রবৃদ্ধি দুটি ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হতে পারে।

অননূদিত প্রবন্ধটি পড়তে ক্লিক করুন : www.project-syndicate.org/commentary/income-inequality-opportunity-costs-by-ricardo-hausmann-2015-01

দারিদ্র্য থেকে মুক্তির ডিজিটাল পন্থা

কোপেনহেগেন- আগামী ১৫ বছরের মধ্যে বিশ্বনেতৃত্বকে কোন বিষয়ের প্রতি মনোযোগ দেওয়া উচিত? এ-প্রশ্নের উত্তরে সবার আগে আসতে পারে স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও শিক্ষার মত বিষয়; তবে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো – ব্রডব্যান্ডের সংযোগ সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পেতে পারে। এর পেছনে শক্ত যুক্তিও রয়েছে।

শুধু এই সহজ বিষয়টি ভাবুন, আগামী ১৫ বছরের মধ্যে মোবাইল ইন্টারনেট সংযোগ যদি তিনগুন করা যায় তবে উন্নয়নশীল দেশগুলো আরও ২২ ট্রিলিয়ন ডলার পরিমাণ সম্পদ অর্জনে সক্ষম হবে। দরিদ্র জনসাধারণের জীবনমান এবং আয়ের ক্ষেত্রে এ-ধরনের উন্নয়ন অন্যান্য চ্যালেঞ্জগুলো পরোক্ষভাবে মোকাবেলা করতে সাহায্য করবে। এটা তো জানা কথা, ধনী মানুষেরা তুলনামূলকভাবে অধিকতর স্বাস্থ্যবান, উদ্যমী এবং উচ্চ শিক্ষিত হবে।

এ-মুহূর্তে ব্রডব্যান্ডের বিষয়টি প্রাসঙ্গিক । কারণ আগামী সেপ্টেম্বর মাসে ১৯৩টি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিগণ জাতিসংঘে একত্রিত হবেন। তাঁরা ২০৩০ সালের মধ্যে পূরণ করতে হবে- এমন কিছু উন্নয়ন লক্ষ্যের একটি তালিকা প্রস্তুত করবেন। আমার চিন্তাশালা, কোপেনহেগেন কনসেনসাস-এর গবেষকরা অর্থনীতিবিদদের ৬০টি দলের (যাঁদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত) সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন। কোন খাতে বিনিয়োগ করলে ডলার প্রতি কল্যাণ সবচেয়ে বেশি হবে তা জানতে এবং জাতিসংঘের এই সম্মেলনকে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট লক্ষ্য বাছাইয়ে সহায়তা করতেই এই সাক্ষাৎকার নেয়া হয়।

নতুন একটি গবেষণায় দেখা যায় যে, টাওলূউস স্কুল অব ইকোনমিকস্ এর ইমানুয়েল অ্যরিয়্যাল ও অ্যালিক্সিয়া লী গনজালেজ ফ্যানফ্যালনি -এর মতে, ব্রডব্যান্ড ভবিষ্যতের জন্য সর্বোৎকৃষ্ট বিনিয়োগের ক্ষেত্রগুলোর একটি হতে পারে। এটা সুস্পষ্ট যে,দ্রুত ব্রডব্যান্ডের সেবা শিল্পায়িত বিশ্বের মানুষের জীবনকে বদলে দিয়েছে ব্যাপকভাবে। ব্রডব্যান্ডের এই সুযোগ-সুবিধা উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও পরিবর্তন নিয়ে আসবে। অনেক কারণেই আমরা এমন আশা করতে পারি।

বাজার বিষয়ক তথ্য পেলে কৃষক তার উদ্বৃত্ত পণ্য বিক্রি করতে গিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীর কাছে প্রতারিত হবেন না; জেলে তার আহরিত মাছ র্সবোচ্চ দামে বন্দরে বিক্রি করতে পারবেন। ম্যাকিনজি একটি গবেষণায় দেখিয়েছে , উন্নত দেশগুলোর মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও মোবাইল ব্রডব্যান্ড সুবিধা প্রদান করলে বছরে বৈশ্বিক জিডিপি-তে আরও ৪০০ বিলিয়ন ডলার যোগ হবে এবং ১ কোটির বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

একইভাবে, বিশ্ব ব্যাংক একটি পরিসংখ্যানে দেখিয়েছে, ব্রডব্যান্ড সংযোগ ১০ শতাংশ বৃদ্ধির ফলে নিম্ন- মধ্য আয়ের দেশগুলোর জিডিপি ১.৪ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই তথ্য ইঙ্গিত দেয় যে, উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের মধ্যকার ডিজিটিাল বৈষম্য নিরসন করতে পারলে বিশ্বের উন্নয়নের গতি ব্যাপকভাবে ত্বরান্বিত হবে । যেমন- মোবাইল ব্রডব্যান্ড সংযোগের হার উন্নত দেশে যেখানে ৮৩ শতাংশ সেখানে উন্নয়নশীল দেশে তা মাত্র ২১ শতাংশ।

ইউরোপ ও অন্যান্য দেশের সরকারগুলো দ্রুততর এবং উন্নততর ব্রডব্যান্ড সংযোগে নিয়মিত বিনিয়োগ করছে। ইন্টারনেট থেকে সবচেয়ে বেশি উপকার পাওয়া যাবে যদি তা সেইসব মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া যায় যারা পূর্বে ইন্টারনেট ব্যবহার করে নি। এরা অধিকাংশই উন্নয়নশীল ও উদীয়মান দেশের বাসিন্দা । এভাবেই উন্নয়নশীল দেশগুলো ব্যয়বহুল ফাইবার-অপটিক ক্যাবলস ও নেটওয়ার্ক এর অ্যাকসেস পয়েন্ট এড়িয়ে  সরাসরি মোবাইল ব্রডব্যান্ডের সুযোগ গ্রহণ করে উন্নত দেশগুলোকেও পেছনে ফেলতে পারে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ইতোমধ্যে মোবাইল ফোন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, অপ্রয়োজনীয় করে দিচ্ছে পুরনো আমলের স্থির অবকাঠামোকে। ডেটা সার্ভিসের ক্ষেত্রে একই সিস্টেম ব্যবহার করা যায়। চীনে তিন-চতুর্থাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী মোবাইলের মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহার করছে, যেখানে ইথোপিয়া ও উগান্ডায় করছে পাঁচভাগের চারভাগ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। মোবাইল ফোনের দ্রুত প্রসার ও মোবাইল নেটওয়ার্কের সাম্প্রতিক প্রযুক্তিগত উন্নতির ফলে মোবাইল ব্রডব্যান্ড সংযোগ স্বল্প ব্যয়-সাপেক্ষ সেবায় পরিণত হয়েছে।

অ্যরিয়্যাল ও ফ্যানফালনির গবেষণা দেখিয়েছে , উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মোবাইল ব্রডব্যান্ড সংযোগের হার ২১ শতাংশ থেকে ৬০ শতাংশে, এই তিনগুণ বৃদ্ধির জন্য ব্যয় হবে প্রায় ১.৩ ট্রিলিয়ন ডলার। এই অর্থ ব্যয় হবে আরো তিন বিলিয়ন ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে । তবে এই ব্যয়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধিও বেড়ে যাবে। ইন্টারনেট সংযোগের অবকাঠামো গড়তে এই পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হলে ২০২০ সালের মধ্যে বছরে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার পরিমাণ উপকার পাওয়া যাবে এবং এর মাত্রা প্রতি বছর বৃদ্ধি পেতে থাকবে। আগামী দশকে মোট উপকার পাওয়া যাবে প্রায় ২২ ট্রিলিয়ন ডলার এর সমান । এর ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মোবাইল ব্রডব্যান্ডে প্রতি ডলার খরচে আয় হবে ১৭ ডলার, যা অত্যন্ত লাভজনক বিনিয়োগ বলেই মনে হয়।

ব্রডব্যান্ড এত গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবশালী প্রযুক্তি যে অর্থনীতিতে এর অবদান কেমন হবে তা পুরোপুরি অনুমান করা দুষ্কর। স্থানীয় বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রেক্ষিতে এর অবদানও ভিন্ন হবে। অ্যরিয়্যাল ও ফ্যানফালনি-এর গবেষণা দেখিয়েছে, ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপনে ব্যয় হওয়া অর্থ ভালোভাবেই ব্যয় হচ্ছে। নেটওয়ার্ক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রত্যক্ষভাবে এবং এর সাপ্লাই চইেনে পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে । ব্রডব্যান্ড অর্থনীতির বৃহৎ পরিসরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সহায়তা করে। এর ফলে কোম্পানিগুলো অধিকতর দক্ষ ও উদ্ভাবনী ক্ষমতাসম্পন্ন হয়ে ওঠে। এইসব বিষয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি বাড়িয়ে দেয়।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রত্যক্ষ অবদান ছাড়াও ব্রডব্যান্ড স্বল্পন্নোত দেশগুলোতে কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপকার সাধন করতে পারে। লন্ডনের ইমপেরিয়্যাল কলেজ-এর প্যানটেলিস কৌটরোমপিস দেখিয়েছেন যে, স্বল্পন্নোত দেশগুলোতে নয় হাজার মিলিয়ন মানুষ বাস করে এবং এই দেশগুলোতে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হার মাত্র ৬.৭ শতাংশ । অন্যদিকে, এসব দেশে ৬০ শতাংশ মানুষ মোবাইল ব্যবহার করে। এই মোবাইল ব্যবহারকারীরা স্মার্টফোনে কিছু সাধারণ এপ্লিকেশন ব্যবহার করে হরেক রকম স্বাস্থ্য পরীক্ষা (কার্ডিওভাসকিউলার রোগ, এইচআইভি, প্যাথোজেন্স অথবা ম্যালেরিয়া) করতে পারেন। স্মার্টফোন ব্যবহার করে তারা এই টেস্টগুলোর ফলাফল দ্রুত হাসপাতালে প্রেরণ করতে পারেন। এভাবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে দ্রুততম সময়ে সেবা নিতে পারেন।

স্বল্পন্নোত দেশগুলোতে মোবাইল ব্রডব্যান্ডের সুবিধা আরো প্রসারিত করা যায় । ইন্টারনেট সংযোগ শিক্ষাসংক্রান্ত বিষয়গুলোকে সহজলভ্য করে স্কুলিং এর মান উন্নত করতে পারে । ব্রডব্যান্ড দূরবর্তী যে কোনো জায়গায় রিয়েল টাইমে পরিবহন সেবা সরবরাহে সহায়তা করবে।

আধুনিক বিশ্বে ইন্টারনেট এবং ব্রডব্যান্ড অতীব গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিতে পরিণত হয়েছে যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য দূরীকরণ, সুস্বাস্থ্য রক্ষায়, পুষ্টি সাধন এবং শিক্ষার উন্নয়নের অপরিহার্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই সরকারগুলো যখন পরবর্তী বৈশ্বিক উন্নয়ন লক্ষ্য নির্ধারণ করবেন তখন ব্রডব্যান্ডের সংযোগের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা উচিত।

অননূদিত প্রবন্ধটি পড়তে ক্লিক করুন : http://www.project-syndicate.org/commentary/broadband-access-lower-poverty-by-bj-rn-lomborg-2015-01

ভর্তুকির ফাঁদ

রাজনৈতিক বিবেচনায় গৃহীত কোন ভাল নীতিও একটি শক্তিশালী অর্থনীতিকে সরাসরি বিপাকে ফেলতে পারে। যেমন- খাদ্য ও এনার্জি খাতে ভর্তুকি। সাধ্যাতীত এই ভর্তুকির প্রশ্নই বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নতুন তিনজন রাষ্ট্রনায়ক- মিশরের রাষ্ট্রপতি আবদুল ফাত্তাহ আল সিসি, ইন্দোনেশিয়ার নির্বাচিত-রাষ্ট্রপতি জকো ‘জকভি’ উইদদো ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্য প্রধান মাথাব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পূর্বানুমান মিথ্যে প্রমাণিত করে সিসি ভর্তুকি কমানোর কাজটা ভালভাবেই করছেন। মোদিই বরং প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি।   তিনি এমনকি দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত বিশ্ব বানিজ্য সংস্থার (ডব্লিওটিও) একটি চুক্তিও বাতিল করে দিচ্ছেন। জকোভির ব্যপারে এখনো কোন মন্তব্য করার সময় আসেনি।

উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ কিছু রাষ্ট্রের নীতি অনুসরণ করে গত জুলাই মাসে সিসি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা তেলের উপর ভর্তুকি কমিয়ে দিয়েছেন, যার ফলে তেলের দাম ৪১ থেকে ৭৮% পর্যন্ত বেড়ে গিয়েছে। তবে অবাক করার মত বিষয় হল, এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোন জোরালো প্রতিবাদ গড়ে উঠেনি।

মিশরের পাঁচ বিলিয়ন ইউএস ডলারেরও বেশি বাজেটের ফুড সাবসিডি প্রোগ্রামের সংস্কারও এখন আশু প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। খ্যাদ্যে ভর্তুকি দিয়ে রুটির দাম এত কম রাখা হয়েছিল যে তা প্রায়ই পশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হত। উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোতে এরকম সংস্কারের ফলে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে, এমনকি কোন দেশে সরকারের পতন পর্যন্ত হয়েছে। কিন্তু সিসির সরকার এই চ্যালেঞ্জ বেশ সাফল্যের সাথে মোকাবেলা করেছে বলে মনে হচ্ছে। তারা রুটিতে ভর্তুকির পরিমাণও ১৩% কমিয়ে দিয়েছে।

সিসির সামনে এর কোন বিকল্পও ছিল না। ভর্তুকি কমানোর পরেও আগামি অর্থবছরে বর্তমান সরকার জিডিপির ১০% (ভর্তুকি না কমালে হত ১৪%) ঘাটতি নিয়ে বাজেট পরিকল্পনা করছে। তারপরও খুব কম লোকই আশা করছেন, ভঙ্গুর রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ক্ষমতা গ্রহণকারী সিসি আমূল অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রত্যাশার মধ্যে বিপুল গণতান্ত্রিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসা মোদির চেয়ে দ্রুত উন্নয়ন করতে পারবেন।

অক্টোবরে জকভি যখন ইন্দনেশিয়ার ক্ষমতা গ্রহন করেছেন, তাঁর পেছনে ছিল তেলে ভর্তুকি দেয়ার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। বার্ষিক ২১ বিলিয়ন ইউএস ডলার তেল ভর্তুকির ভার (কখনো তা সরকারি ব্যায়ের ২০%) দেশটি আর বহন করতে পারছে না। বিদায়ী রাষ্ট্রপতি সুশীলো বামবাং ইয়ধুনো এক বছর আগে তেলের দাম বাড়িয়ে প্রথম সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। জকভির উপদেষ্টাগণ বাকি ভর্তুকি কমানোর পক্ষে মত দিয়েছেন। তিনি অবশ্য চার বছর মেয়াদে ক্রমান্বয়ে তা কমানোর ঘোষণা দিয়ে দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন।

অর্থনীতিবিদগণ পণ্যে ভর্তুকি দেয়ার বিরোধিতা করতে দ্বিধাবোধ করেন না। কারণ বিশাল সংখ্যক ভোক্তার চাহিদা ও যোগানদাতার যোগান-সমৃদ্ধ বাজারকেই উৎকৃষ্ট প্রতিযোগিতার আদর্শ ধরা হয়। যেখানে প্রতিযোগিতা উৎকৃষ্ট নয়, সেখানে বৃহৎ প্রাইভেট মনোপলিসমূহ নয়, সরকারকেই তার কারণ বলে বিবেচনা করা হয়।

অদৃশ্য হাতের সমালোচকদের যুক্তি হল, বেসরকারি বাজারকে অনিয়ন্ত্রিত রাখলে বিভিন্ন কারনে তা ব্যর্থ হতে পারে। যেমন, সরকারি হস্তক্ষেপের পক্ষে সবচেয়ে বিখ্যাত দুটি যুক্তি হল আয় বৈষম্য ও পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতি।

সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যপার হল, পরিবেশ ও ন্যায্যতার (ইকুইটি) দোহাই দিয়ে খাদ্য ও জীবাশ্ম-জ্বালানীতে ভর্তুকির পক্ষাবলম্বন করা হয়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই লক্ষ্য অর্জিত হয় না, বরং কখনো কখনো তার ফলাফল হয় বিপরীত। মিশরের খাদ্য ভর্তুকির ২০% এরও কম দরিদ্র জনগণের উপকারে আসে। অধিকাংশ দেশে গ্যাসোলিনে ভর্তুকির ফলে লাভবান হয় মধ্যবিত্ত শ্রেণি। দরিদ্ররা বরং হেঁটে যাতায়াত করেন কিংবা গনপরিবহন ব্যবহার করেন। তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের ক্ষেত্রে ভারতের গ্রামীণ ভর্তুকির ০.০১% এরও কম চরম দরিদ্রদের ভাগে পড়ে, যেখানে সম্পদশালীদের ভাগে পড়ে ৫২.৬%। পৃথিবীব্যাপি জীবাশ্ম-তেল খাতে দেয়া ভর্তুকির ২০% এরও অনেক কম পরিমাণ সারা পৃথিবীর দরিদ্রতম ২০% মানুষের উপকারে আসে।

খাদ্য ও জ্বালানী খাতে ভর্তুকিও জননীতিকে পথভ্রষ্ট করতে পারে। ভারতের কৃষি ভর্তুকি বাঁচিয়ে রাখতে মোদি সরকারের গৃহীত নীতির ক্ষেত্রে তাই হয়েছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার দেয়া আপোষমূলক প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভেটো দিয়ে ভারত গত দশ বছরের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বহুপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির অগ্রগতিকে ব্যাহত করেছে।

কৃষি ভর্তুকি দরিদ্র দেশে কখনো কখনো উৎপাদনকারীর ক্ষতির বিনিময়ে ভোক্তার উপকারে আসে। আবার ধনী দেশে কখনো কখনো তা ভোক্তার ক্ষতির বিনিময়ে উৎপাদনকারীর জন্য লাভজনক হয়। ভারতে গৃহীত নীতিগুলোতে দুই উপায়ই অবলম্বনের চেষ্টা করা হয়েছে। ফলে, ভারত কৃত্রিমভাবে নির্ধারিত কম মূল্যে অস্বাভাবিক পরিমাণ খাদ্যশস্য রেশন দিচ্ছে, আবার একই সাথে কৃষককে উচ্চ মূল্য দেয়ার ফলে অতিরিক্ত যোগান সমস্যায় ভুগছে (পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতি উপেক্ষা করে বিদ্যুৎ, পানি, সার ইত্যাদি কৃষি অবকাঠামো খাতেও কৃষকদের ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে)। সরকার প্রচুর পরিমাণ পচনশীল চাল ও গম কিনে মজুদ করেছে, কিন্তু দরিদ্রদের সহায়তা করার ঘোষিত লক্ষ্যের সাথে সামঞ্জস্যহীন ও দুর্নীতিগ্রস্ত বণ্টন-প্রক্রিয়ার ফলে তার স্বল্প পরিমাণই ভোক্তাদের নাগালে পৌঁছতে পারছে।

সরকার তার এই ভর্তুকি ও মজুদ নীতি অব্যাহত রাখতে চায় । কিন্তু তারা জানে তা হবে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নীতিবিরুদ্ধ। এই নীতিতে চিরস্থায়ী কোন পরিবর্তন সাধনে ব্যর্থ হয়েই মোদি ডব্লিওটিওর ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন এগ্রিমেন্ট- এর প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভেটো প্রদান করেছে।

একবার ভর্তুকির প্রচলন হলে, তা বাতিল করা খুবই দুরূহ হয়ে পড়ে। যখন বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম বাড়ে, গত দশকে যা প্রায়শ ঘটেছে, তখন বাজার নির্ধারিত মূল্যে অভ্যস্ত নাগরিকরা এই বাস্তবতা মেনে নিতে প্রস্তুত থাকে যে সরকার তাদের এই সংকট থেকে সুরক্ষা দিতে পারবে না। কিন্তু প্রশাসনিকভাবে নির্ধারিত খাদ্যদ্রব্য ও জ্বালানী মূল্যে অভ্যস্ত জনগন এরকম সংকটে সরকারকেই দায়ী করেন।

প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে এরকম ভর্তুকির নীতি গ্রহন না করার পক্ষে এটাই সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, ভর্তুকি প্রচলন করার পর তা চালিয়ে যাওয়া কোন ধূর্ত রাজনীতিবিদের জন্য সর্বোৎকৃষ্ট উপায়। যদি মূল্যবৃদ্ধির বিকল্প হয় ঘাটতি কিংবা রেশনিং, তাহলে ক্ষুব্ধ জনগন যে কোন মুহূর্তে প্রতিবাদী হয়ে উঠতে পারে। আবার চাহিদা ও ক্রয়ক্ষমতার অপ্রত্যাশিত ব্যবধানের ফলে খুচরা মূল্য অস্বাভাবিক রকম বেড়ে যায়, চূড়ান্ত বিচারে তাও কালক্ষেপণকারী নেতার জন্য সুবিধাজনক পরিস্থিতি তৈরি করবে না।

আদর্শ ব্যবস্থা হল, খাদ্য ও জ্বালানী খাতে ভর্তুকি কমানোর পাশাপাশি নিচুতলার মানুষের আয় বৃদ্ধির জন্য সহায়ক অন্যান্য উপায় উদ্ভাবন করা। উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলো মেক্সিকোর ‘প্রগ্রেসা-অপরতুনিদাদেস’ প্রোগ্রাম ও ব্রাজিলের ‘বলসা ফ্যামিলিয়া’র মত কন্ডিশনাল ক্যাশ ট্রান্সফার পদ্ধতি কিংবা ভারতের উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ইউনিক আইডেন্টিটিফিকেশন সিস্টেমের মত অভিনব নীতি থেকে কার্যকর ট্রান্সফার মেকানিজম সম্পর্কে অনেক কিছুই আয়ত্ব করেছে। কিন্তু যেখানে বাজেট সংকট বাধ্য করার আগে কোন সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় না, সেখানে সংকট উত্তরণে স্থানান্তরের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ নাও থাকতে পারে। বুদ্ধিমান রাজনীতিবিদের উচিত হবে ক্ষমতা গ্রহণের পর যত দ্রুত সম্ভব এই অস্বস্তিকর সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে দেয়া। জকভি ও সিসি এই নীতিই গ্রহন করেছেন। কিন্তু বাজারব্যবস্থা সংস্কারের পক্ষে বিপুল নির্বাচনী সমর্থন ও উদ্দীপনা স্বত্বেও মোদি এই সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয়েছেন।

অননূদিত প্রবন্ধটি পড়তে ক্লিক করুন : www.project-syndicate.org/commentary/jeffrey-frankel-explains-why-it-is-politically-wise-to-remove-price-supports-for-food-and-energy