নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা- সমস্যাগুলো কি?

মাঠ পর্যায় থেকে পাওয়া তথ্য, গবেষক এবং বিশ্লেষকদের মতামত,  নারীদের অগ্রযাত্রায় নতুন গবেষণা-ভাবনা-পদক্ষেপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ে স্বার্থ

নারীরাই প্রথমে লক্ষ্য করেছিলেন যে তাদের এলাকায় সন্দেহজনক কিছু ঘটছে। দক্ষিণ আফগানিস্তানে তাদের সম্প্রদায়ের ভিতরে অদ্ভুত সব কার্যকলাপ সংগঠিত হচ্ছিল। উজবেক মহিলারা সেই এলাকায় বিদেশী বিনিয়োগ আনার নাম করে প্রত্যেক বাড়িতে কড়া নেড়ে তাদের পরিবার এবং পুরুষ সন্তানদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করছিলেন। কিন্তু স্থানীয় মহিলারা ভাবলেন তাদের এলাকার মতো আফগানিস্তানের প্রত্যন্ত দুর্গম এলাকায় বিদেশী বিনিয়োগ মোটেও স্বাভাবিক নয়। তারা ঘটনাটি ভালোভাবে অনুসন্ধান করে জানতে পারলেন যে তাদের এলাকার ছেলেদের সাথে এমন একটি ঘটনা ঘটছে যা মোটেও কাম্য নয়। তারা জঙ্গি বাহিনীগুলোতে ভর্তির জন্য লক্ষ্যে পরিণত হচ্ছে।

সেইসব মহিলাদের মধ্যে ১২ জন কাবুলে গেলেন ঘটনাটি সম্পর্কে সবাইকে সতর্ক করতে। তারা সরকারের একজন মন্ত্রীর কাছে গেলেন এবং সবকিছু খুলে বললেন। কিন্তু যথেষ্ট গুরুত্ব দেবার বদলে মন্ত্রী সেইসব মহিলাদের কথাকে উপহাস করলেন এবং  তাদেরকে হতাশ ও শূন্য হাতে বাসায় পাঠিয়ে দিলেন। এর এক মাসের মাঝেই জঙ্গিরা তাদের এলাকায় একটি বাসে আক্রমণ চালালো এবং ডজনখানেক মানুষ নিহত হল।

বৈশ্বিক শান্তি এবং সুরক্ষা প্রচেষ্টায় নারীদের অন্তর্ভুক্তিকরণ সিদ্ধান্তের ১৫ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে সম্প্রতি ওয়াশিংটন ডিসি তে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে আফগান কর্মী ওয়াযমা ফ্রঘ এই সত্য কাহিনীটি বর্ণনা করেন । এই বিষয়টি নিয়ে পুর্বে অসংখ্য অনুষ্ঠানে আলোচনা হলেও, গল্পটি ছিল অনুষ্ঠানের মূল আলোচ্য বিষয় থেকে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি থাকা সত্তেও এবং সংঘাতের মুহূর্তে কোন একটি এলাকায় শৃঙ্খলা রক্ষা প্রচেষ্টায় নারীদের মুখ্য ভূমিকা থাকার পরেও, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যখন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়,  আলোচনার টেবিলে নারীরা কদাচিৎ উপস্থিত থাকেন।

নিউইয়র্কে একইরকম একটি বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে কঙ্গোলিজ নারী ফান্ডের প্রেসিডেন্ট জুলিয়েন লুসেঞ্জ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সামনে বক্তৃতা দেন। সেখানে তিনি বলেন, “আমি অনেকবার ভেবেছি আমি কি সত্যি এখানে এসে সেই একই নৃশংসতার বর্ণনা দিতে চাই? আমি কি বলতে চাই যে, কঙ্গোতে নারীদের অবস্থার প্রায় কিছুই পরিবর্তিত হয়নি। তিনি আরও বলেন, আপনারা নিপীড়িত নারীদের মর্মন্তুদ আর্তনাদ আগেও অনেকবার শুনেছেন। কিন্তু আপনাদের নেয়া কোন পদক্ষেপ সেই অবস্থার পরিবর্তন আনতে আনতে পারেনি। আজকে কঙ্গোর নারীদের কান্নার শব্দকে আপনারা উপেক্ষা করবেন না”।

লুসেঞ্জ বর্ণনা করেন কিভাবে কঙ্গোতে নারীরা শান্তি আলোচনায় অংশ নিতে আগ্রহী ছিল, কিন্তু কেউই আলোচনায় তাদের অংশগ্রহণ করতে দেয়নি। “ সেখানে কেবল দুটি দলই আছে যারা সংঘাতে লিপ্ত। হয় আপনি সরকারের পক্ষে, নতুবা এম২৩ ( বিদ্রোহী দল) এর পক্ষে”- নারীদের দাবীর প্রতিউত্তরে কি জবাব পেয়েছেন তা বলতে গিয়ে লুসেঞ্জ বলেন।

নারীদের আলোচনা থেকে বর্জনের বিপরীতে আমরা প্রচুর প্রমাণ দেখতে পাই যেখানে নারীদের অংশগ্রহণে শান্তি আলোচনা আরো সাফল্য অর্জন করেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গবেষকেরা স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী শান্তিকরণ প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে দেখেছেন যেসব ক্ষেত্রে নারীরা অংশ নিয়েছেন বা ভূমিকা রেখেছেন সেখানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আলোচনা একটি শান্তিপূর্ণ মতৈক্যে উপনীত হয়েছে। একটি বিশ্বব্যাপী অনুসন্ধানে দেখা যায়, যখনি কোন আলোচনা থমকে গেছে অথবা সংলাপে কোন সিদ্ধান্ত আসেনি, নারীর ভূমিকা সেসব ক্ষেত্রে নতুন করে আলোচনাকে এগিয়ে নিতে অথবা কার্যকরী সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছে।

শান্তির পথে নারীরা যে গুরুত্বপূর্ণ একটি পাথেয় তার এতো প্রমাণ থাকা সত্তেও কেন বারবার আলোচনার টেবিলে তাদের উপেক্ষা করা হচ্ছে?

একটা সমস্যার কথা আমি প্রায়ই শুনি, সেটা হল “আগে-তবে” পূর্বশর্ত। কেউ বলতে চায় না যে নারীরা আলোচনায় অংশ নিতে পারবে না, কিন্তু তারা এর সাথে দ্রুতই শর্ত জুড়ে দেয়, “আগে” জঙ্গিদের একসাথে আসতে হবে অথবা জটিল নিরাপত্তা সমস্যাগুলোর “আগে” সমাধান করতে হবে। যদি এটা করা যায় “তবে” নারীরা সংলাপে অংশ নিতে পারবে।

এই পদ্ধতিটি যোদ্ধাদের উপরেই অধিক নির্ভরশীল। নারীরা স্থানীয় পর্যায়ের অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তা সমস্যাগুলো সবচেয়ে ভাল জানেন এবং তারা এটা বেশ ভালো করে বুঝতে পারেন যে প্রাথমিক কিকি কারণে একটি সহিংসতা বা সংঘাত শুরু হয়েছে। যদি শান্তি প্রক্রিয়া থেকে তাদের সরিয়ে দেয়া হয় তাদের এই মূল্যবান জ্ঞান থেকে আমরা বঞ্চিত হব। শুধু তাই নয়, এতে করে রাজনীতি, ন্যায় বিচার এবং নিরাপত্তা বিষয়ক স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভিত্তি দুর্বল হয়ে যাবে, কেননা এই প্রতিষ্ঠানগুলো তখনই সবচেয়ে ভালো কাজ করে যখন এতে ওই অঞ্চলের সব ধরণের মানুষের কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হয়।

নারীদের যদি আলোচনার টেবিলে অংশ নেবার সুযোগ দেয়া হয়, তবে শান্তি প্রক্রিয়ায় অংশ নেবার জন্য তাদের প্রস্তুত করতে হবে, বিশেষ করে তাদের অংশগ্রহণ যদি অন্য কোন দল বা অংশগ্রহণকারী দ্বারা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় স্থানীয় পুলিশ বাহিনীতে অথবা রাজনৈতিক দলের সাথে কাজ করার মাধ্যমে নারীরা ভবিষ্যতের জন্য প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে। এই ধারণাটি প্রত্যেক সমাজ ও এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে কাজ করবে। নেতাদের উচিত সরকারে নারীদের নিয়োগ নিশ্চিত করা, বেসামরিক প্রশাসনে তাদের কাজের সুযোগ করে দেয়া অথবা নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নিয়োগ দেয়া। এতে করে শান্তি আনয়নে নেতৃত্ব দিতে কিংবা সংঘাত প্রতিরোধে মাঠপর্যায়ে ভূমিকা রাখতে তারা আরও বেশি সক্ষম হবে।

কিন্তু পরিশেষে এই উদ্যোগগুলো একটা তিক্ত সত্যকেই সামনে তুলে আনে, তা হল স্থানীয়, জাতীয় অথবা আন্তর্জাতিক পর্যায় সবক্ষেত্রেই রীতিনীতি পুরুষদের অধিক সুবিধা দেয়। সহিংসতামুক্ত জীবন যাপন করা, শিক্ষা অর্জন করা, ভালোভাবে বেঁচে থাকা, নেতৃত্ব দিয়ে সমাজের সেবা করা- এসব ক্ষেত্রে নারীর ক্ষমতা সীমিত।  এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় সরকারী কর্মচারী, পুলিশ, সৈনিক, আইন আদালত এবং সমাজের প্রত্যেকেই তাদের কণ্ঠকে অবহেলা করতে সাহস পায়।

বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় নারী ও মেয়ে শিশুদের সমাজের সব ক্ষেত্রেই সক্ষম করে তুলতে হবে। একারণেই গত সপ্তাহে, জাতিসঙ্ঘে আমেরিকার দূত সামান্থা পাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন, বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় নারীদের সমান ভূমিকা নিশ্চিতকরণে  যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে যার আর্থিক মূল্য ৩১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

কিন্তু এটা আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, নিরাপত্তা ব্যবস্থার মতো বিষয়ে নারীর ভূমিকা নিরূপণে সরকারের উদ্যোগ কিংবা সম্পদই শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমাদের মানুষের মানসিক অবস্থারও পরিবর্তন ঘটাতে হবে। বিশ্বে, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও অনেক রাজনৈতিক, সামরিক এবং নিরাপত্তা বিষয়ক নেতা লিঙ্গ বৈষম্যকে একটি মৃদু সমস্যা হিসেবে দেখেন যার সমাধান পরেও করা যাবে।

সমস্তকিছুর প্রমাণ আমাদের সামনে আছে। এগুলোকে গ্রাহ্য না করার ঝুঁকি কিন্তু আমাদেরকেই নিতে হবে।

অননূদিত প্রবন্ধটি পড়তে ক্লিক করুন: http://blogs.cfr.org/women-around-the-world/2015/10/26/whats-the-problem-with-women-peace-and-security/

সামাজিক অগ্রগতি যে কারণে জরুরি

ক্যামব্রিজ- গত পঞ্চাশ বছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে কোটি কোটি মানুষের দারিদ্র্য দূরীভূত হয়েছে এবং জীবনমান উন্নত হয়েছে। তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ভিত্তিক মানব উন্নয়নের মডেলটি যে অসম্পূর্ণ তা দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে। যে সমাজ মানুষের মৌলিক প্রয়োজনগুলো মেটাতে , নাগরিকদের জীবনমান উন্নয়নে, পরিবেশ রক্ষায় এবং নাগরিকদের উন্নয়নের সুযোগ প্রদান করতে ব্যর্থ – সেই সমাজকে সফল সমাজ বলা যায় না। অন্তর্ভূক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি করতে অর্থনৈতিক এবং সামাজিক দুই ধরণের অগ্রগতিই সাধন করতে হয়।

শুধু জিডিপির উপর গুরুত্ব দেয়া যে ভূল তা স্পষ্ট হয়েছে এ বছর ৯ এপ্রিলে চালু হওয়া ‘২০১৫ সোস্যাল প্রগ্রেস ইন্ডেক্স(এসপিআই)’-এ। এমআইটির স্কট স্টার্ন এবং অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ‘সোস্যাল প্রগ্রেস ইনডেক্স’ এর যৌথ উদ্যোগে তৈরি করা হয়েছে এই এসপিআই। এসপিআই বিভিন্ন সামাজিক এবং পরিবেশগত বিষয়ে ১৩৩ টি দেশের অর্জনগুলোকে পরিমাপ করে। এটি সামাজিক অগ্রগতি পরিমাপ করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট ফ্রেমওয়ার্ক বা কাঠামো । এটিই প্রথম ফ্রেমওয়ার্ক যা জিডিপি ছাড়াই সামাজিক অগ্রগতি পরিমাপ করতে সক্ষম।

 

এসপিআই-এ একটি দেশের সামাজিক অর্জনগুলো ৫২ টি সূচকের বিপরীতে বিচার করা হয়। এসপিআই সরকার এবং ব্যবসায়ী নেতাদের জন্য একটি সহজ এবং বাস্তবসম্মত পদ্ধতি সামনে এনেছে। এর মাধ্যমে তারা তাদের দেশের অর্জনগুলোকে পরিমাপ করতে পারবেন এবং যে জায়গাগুলোতে সামাজিক উন্নয়ন বেশি জরুরি সেগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সাজাতে পারবেন। এসপিআই এভাবে অন্তর্ভূক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনের কৌশল প্রণয়নে পদ্ধতিগত এবং গবেষণামূলক দিক-নির্দেশনা দিয়ে থাকে।

আমাদের গবেষণা দেখাচ্ছে সামাজিক অগ্রগতির অনেক দিকই আয় বৃদ্ধি পাবার সাথে সাথে বেড়ে যায়। সমৃদ্ধ দেশগুলো যেমন নরওয়ে (এবছর এসপিআই-এ সর্বোচ্চ স্থান অধিকারী), নিম্নতর আয়ের দেশগুলোর চেয়ে সামাজিক অগ্রগতি অর্জনে এগিয়ে আছে।

কিন্তু আমাদের গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে যে জিডিপিই সামাজিক অগ্রগতির একমাত্র নির্ধারক নয়। উদাহরণস্বরূপ,কোস্টারিকার মাথাপিছু জিডিপি ইতালির তিনভাগের একভাগ। কিন্তু দেশটি ইতালির চেয়ে অধিক হারে সামাজিক অগ্রগতি অর্জনে সক্ষম হয়েছে।

এবং কোস্টারিকা কোনো বিচ্ছিন্ন উদাহরণ নয়। ধনী থেকে দরিদ্র সবধরণের দেশেই আমরা এই উদাহরণগুলো দেখেছি । যেমন নিউজিল্যান্ড এবং সেনেগাল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সামাজিক অগ্রগতিতে রুপান্তর করতে যুক্তরাষ্ট্র ও নাইজেরিয়ার চেয়ে বেশি সফল হয়েছে। চীন এবং ভারতের মতো উচ্চপ্রবৃদ্ধিসম্পন্ন দেশগুলোর ক্ষেত্রেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যতটা সামাজিক অগ্রগতিতে অবদান রাখার কথা ততটা রাখছে না।

যেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সামাজিক অগ্রগতির মধ্যে অসামঞ্জস্য থাকে সেখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় যেমন হয়েছে রাশিয়ায় এবং মিশরে। সামাজিক অগ্রগতিতে পিছিয়ে থাকা এইসব দেশে অর্থনৈতিক উন্নয়নও বিঘ্নিত হয়। আসলে যেসব দেশ এর নাগরিকদের মানবিক প্রয়োজনগুলো মেটাতে, সমাজে পারস্পরিক আস্থা এবং এর নাগরিকদের জন্য সমৃদ্ধির যথেষ্ট সুযোগ সৃষ্টিতে ব্যর্থ হয় সেসব দেশে অর্থনৈতিক উন্নয়নও বিঘ্নিত হয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যথাযথ ভিত্তি তৈরিতে দেশগুলোর শুধু অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নয়, সামাজিক অগ্রগতিতেও বিনিয়োগ করতে হবে।

আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতায় দেখেছি রুয়ান্ডা অর্থনৈতিক উন্নয়নের কৌশলের সাথে সামাজিক অগ্রগতি খাত যেমন লৈঙ্গিক সমতা, শিশুমৃত্যু, প্রাথমিক খাতেও বিনিয়োগ করেছে। এর ফলে এক দশকের মধ্যে শিশু মৃত্যুর হার কমেছে ৬১ শতাংশ, প্রাথমিক শিক্ষার হার বেড়ে হয়েছে ৯৫% । সামাজিক উন্নয়নের এই দিকগুলোতে অগ্রগতি না হলে রুয়ান্ডার যে ইতিবাচক অর্থনৈতিক অর্জন তা সম্ভব হতো না।

সামাজিক অগ্রগতির দিকে এভাবে জোর দিলে দেশের উন্নয়ন কৌশল আরও বিকশিত হয় এবং উন্নয়নের স্বার্থে অনেক বিতর্কিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে রাজনৈতিক সমর্থনও পাওয়া যায়। তাই চিরাচরিত অর্থনৈতিক সূচকগুলোর পাশাপাশি সামাজিক উন্নয়নের সূচকও পরিমাপ করা জরুরি। যাতে একটি ইতিবাচক চক্র সৃষ্টি হবে এবং এর ফলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি সামাজিক এবং পরিবেশগত উন্নয়ন সাধন করবে। আবার সেই সামাজিক ও পরিবেশগত উন্নয়ন অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে। জিডিপি এবং আয়বৈষম্যর মতো সংকীর্ণ বিতর্ক এড়িয়ে এসপিআই এই চক্রটি সৃষ্টি করতে ভূমিকা রাখে।

২০১৩ সালে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হওয়ার পর থেকে এসপিআই এর উপর মানুষের আগ্রহ জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। এর মাধ্যমে পাওয়া নতুন তথ্যগুলো পৃথিবী ব্যাপী লক্ষ লক্ষ নাগরিক একে অপরের কাছে শেয়ার করছে। এটি নাগরিকদের কাছে তাদের নেতাদেরকে জবাবদিহি করানোর ক্ষেত্রে একটি হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

অধিকন্তু, ৪০ টিরও বেশি দেশে সামাজিক অগ্রগতি খাতে উন্নতি সাধনে কৌশলগত উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যেমন প্যারাগুয়ে তার ‘অন্তর্ভূক্তিমূলক জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা ২০৩০’ প্রণয়নে এসপিআই ব্যবহার করেছে। এসপিআই শুধু জাতীয়ভা্বে নয় আঞ্চলিক পর্যায়ে যেমন পৌরসভা কর্তৃপক্ষও এসপিআই ব্যবহার করছে। উন্নয়নে সফলতার একটি পরিমাপক হিসেবে ব্রাজিলের রাজ্য প্যারা, ল্যাটিন আমেরিকার বোগোতা এবং রিওডি জেনিরোতে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস রাজ্যের সামারভিল এসপিআই ব্যবহার করছে।

এবছর ইউরোপীয়ান কমিশন সারা ইউরোপে অঞ্চলভিত্তিক এসপিআই ব্যবহার করবে। কোকাকোলা এবং ন্যাচারা-র মতো কোম্পানিগুলো তাদের সামাজিক খাতে বিনিয়োগের কৌশল নির্ধারণের জন্য এসপিআই ব্যবহার করছে এবং এ লক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে পার্টনারশিপ করছে।

অর্ধ শতকেরও বেশি সময় ধরে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে জিডিপিই ছিল সবচেয়ে উৎকৃষ্ট পরিমাপক। এসপিআই জাতীয় অর্জনের একটি মূল পরিমাপক হিসেবে জিডিপির পরিপূরক (স্থলাভিসিক্ত নয়)হতে চায়। দেশ কিভাবে উন্নয়ন করছে তার পূর্ণচিত্র পেতে নাগরিকদের সাহায্য করবে এসপিআই। সমাজকে সাহায্য করবে আরও উৎকৃষ্ট বিকল্প বাছাই করতে, শক্তিশালী কমিউনিটি তৈরি করতে এবং নাগরিকদেরকে সহায়তা করবে একটি সম্পন্ন জীবনযাপন করতে।

অননূদিত প্রবন্ধটি পড়তে ক্লিক করুন : http://www.project-syndicate.org/commentary/economic-development-social-progress-index-by-michael-porter-2015-04

উন্নয়নের লক্ষ্যে জ্ঞান

লণ্ডন- প্রায় ২৩৬ বছর আগে, আমেরিকার ভার্জিনিয়ার এক তরুণ গভর্নর শিক্ষা সংস্কারের অচলাবস্থা নিরসন করেন। থমাস জেফারসন তাঁর ‘বিল ফর দ্য মোর জেনারেল ডিফিউশন অব নলেজ’ এ একটি সার্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থার কথা বলেন। ‘সবচেয়ে সম্পদশালী থেকে সবচেয়ে দরিদ্র’ -সকল নাগরিক এ শিক্ষাব্যবস্থার আওতাভূক্ত থাকবে। এটি ছিল আমেরিকার জনশিক্ষাব্যবস্থার প্রথম পদক্ষেপ। এই প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপের জন্যেই আমেরিকা দ্রুত বিশ্বব্যাপি প্রাধান্য অর্জন করেছে।

বিশ শতকের প্রথমভাগের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র জনশিক্ষায় বিশ্বের নেতৃত্বের স্থানে পৌঁছে গিয়েছিল। শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও সামাজিক গতিময়তা (সোশ্যাল মবিলিটি) র ক্ষেত্রে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। ক্লদিয়া গলডিন এবং লরেন্স কাট দেখিয়েছেন যে, শিক্ষা খাতে আমেরিকার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ দেশটিকে ইউরোপীয় দেশগুলোর তুলনায় একধাপ এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। কারণ ইউরোপ তখন মানবসম্পদে তুলনামূলক কম বিনিয়োগ করছিল।

এ সপ্তাহে ‘অসলো সামিট অন এডুকেশন ফর ডেভেলপমেন্ট’ এ বিশ্ব নেতৃবৃন্দ সমবেত হচ্ছেন। তাই আমেরিকার এই অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া শিক্ষা আমাদের জন্য এখন অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক । বস্তুত বিশ্বব্যাপি অর্থনীতি ক্রমে ক্রমে জ্ঞাননির্ভর হয়ে উঠছে। এর সঙ্গে কোনো দেশের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে এর জনগণের শিক্ষা ও দক্ষতা পূর্বের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। অন্তর্ভূক্তিমূলক শিক্ষাকাঠামো তৈরি করতে ব্যর্থ দেশগুলোতে মন্থরগতির উন্নয়ন, ক্রমবর্ধমান বৈষম্য ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে সুযোগ হারাতে দেখা যায়।

এমন অবস্থায় শিক্ষা সংক্রান্ত অনেক আলোচনাই পুরনো মনে হয় । হার্ভার্ড এর অর্থনীতিবিদ রিকার্ডো হাউসম্যান মনে করেন ‘এডুকেশন, এডুকেশন, এডুকেশন ক্রাউড’ মূলত ‘প্রবৃদ্ধির জন্য কেবলই শিক্ষা’- নীতির ওকালতি করছে । তাই সম্প্রতি তিনি এ মতের তীব্র সমালোচনা করেন। হাউসম্যানের সমালোচনাটি অসাধারণ ছিল । তবে আমার জানামতে এমন মত কেউ পোষণ করেন না ।

অবশ্যই শিক্ষা প্রবৃদ্ধির কোনো স্বয়ংক্রিয় উপায় নয়। প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা, দুর্বল প্রশাসন ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার কারণে অনেক দেশে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়। এ সব দেশে শিক্ষার প্রসার হলে মানুষ কম উৎপাদনশীল হয় ও বেকারত্বের হার বেড়ে যায়। উত্তর আফ্রিকায় , শিক্ষাব্যবস্থা ও চাকরির বাজারের অসামঞ্জস্যের কারণে শিক্ষিত তরুণরা সম্মানজনক সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এই বিষয়টি ‘আরব বসন্ত’ বিপ্লবগুলোতে ভূমিকা রেখেছে।

এ ঘটনাগুলোর কোনোটাই প্রকৃত শিক্ষা -যা কেবল কয়েক বছরের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, সত্যিকার জ্ঞানের মূল ভূমিকাকে খাটো করে না। প্রকৃত শিক্ষা প্রবৃদ্ধির অপরিহার্য উপাদান। অ্যাডাম স্মিথ থেকে রবার্ট সলো, গ্যারি বেকার এবং সম্প্রতি এরিক হানুসেক পর্যন্ত – এঁদের বিস্তৃত গবেষণা থেকে এটি নিশ্চিত যে, উৎপাদনক্ষম জনসম্পদ তৈরিতে শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। ওইসিডি এর ‘ প্রোগ্রাম ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট অ্যাসেসমেন্ট’ এ কোনো দেশের স্কোর স্ট্যান্ডার্ড ডেভিয়েশন এর একধাপ উপরে গেলে সেদেশের দেশের দীর্ঘমেয়াদে ২ শতাংশ মাথাপিছু প্রবৃদ্ধি হয়।

শিক্ষা হয়তো ধীরগতির প্রবৃদ্ধির জন্য কোনো দ্রুত সমাধান নয়। তবে এমন কোনো দেশের নাম চিন্তা করাও মুশকিল যেটি শিক্ষায় অগ্রগতি ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক উন্নতি করেছে।

বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদেরা শিক্ষাবিতর্কে কিছু দূর্বল যুক্তি উপস্থাপন করেছে। শিক্ষা একটি জনস্বার্থসম্পর্কিত বিষয় যার অর্থসংস্থানের এবং একে জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের – এই অভিমতের সমালোচনা করেন বিশ্বব্যাংকের শান্তা দেবারজন । তিনি এতে দ্বি-মত পোষণ করে বলেন যে, শিক্ষাকে একটি ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে বিবেচনা হওয়া উচিত। এটি বাজারের মাধ্যমে এর গ্রাহকের কাছে পৌঁছবে। তিনি মনে করেন শিক্ষা পিতা-মাতা ও সন্তানের ব্যক্তিগত লাভালাভের সঙ্গে জড়িত।

সমস্যা হলো , শিক্ষা সরাসরি জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় নয়। অবশ্য বাস্তবে খুব কম বিষয়ই সরাসরি জনস্বার্থের সঙ্গে জড়িত। শিক্ষা একটি মননধর্মী বিষয় যা সরকারের বিনামূল্যে প্রদান করা উচিত। কেননা পিতামাতা যদি সন্তানের শিক্ষায় কম বিনিয়োগ করে বা দরিদ্রতার জন্য কেউ বাদ পড়ে যায় , তাহলে দেশ বিশাল অঙ্কের ব্যক্তিক ও সামাজিক বিকাশ থেকে বঞ্চিত হবে। উদাহরণ হিসেবে , শিক্ষার, বিশেষ করে নারীশিক্ষার অগ্রগতির সঙ্গে শিশুর টিকে থাকা ও পুষ্টি/ শিশুস্বাস্থ্য ও পুষ্টি , মাতৃস্বাস্থ্য এবং মেয়েদের উচ্চতর বেতন ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।

সময় এসেছে খোঁড়া যুক্তির ওপর দাঁড়ানো নিস্ফল আলোচনা থেকে সরে এসে শিক্ষার প্রকৃত চ্যালেঞ্জের দিকে মনোযোগ দেয়ার। যদি আমরা টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য উন্নতমানের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা অর্জন করতে চাই, তাহলে এই চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড়াতেই হবে। অসলো শীর্ষসম্মেলন এই লক্ষ্য অর্জনের ভিত্তিনকশা স্থাপনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ করে দিয়েছে। যেখানে প্রাথমিক বিদ্যালয়পড়ুয়া বয়সী শিশুর সংখ্যা ৫৯ মিলিয়ন এবং বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া কিশোর-কিশেরীর সংখ্যা ৬৫ মিলিয়ন সেখানে এ সুযোগ দুহাতে লুফে নেয়া উচিত।

সম্মেলনটি সার্থক হবে যদি তাঁরা চারটি বিষয়কে অবশ্য কর্তব্য বলে বিবেচনা করে । প্রথমত, সরকারকে শিক্ষাখাতে আরো বেশি দেশিয় তহবিল বরাদ্দ করতে হবে। সম্মেলনের একটি নেপথ্য প্রবন্ধে শিক্ষাখাতে বিনিয়োগের ইস্যুতে পাকিস্তানের সরকারগুলোর ক্রমাগত ব্যর্থতার দিকে আলোকপাত করা হয়েছে। এ কারণে বর্তমানে পাকিস্তান সবচেয়ে বেশি বিদ্যালয়-বহির্ভূত জনসংখ্যা রয়েছে এমন দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় । সমস্যার মূলে রয়েছেন রাজনীতিবিদগণ। এরা দরিদ্রদের শিক্ষার সুযোগ করে দেওয়ার চেয়ে সম্পদশালীদের ট্যাক্স ফাঁকির সুযোগ করে দিতে বেশি উৎসাহী।

দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠীরা শিক্ষার জন্যে দিন দিন কম সাহায্য দিচ্ছেন। এই প্রবণতা পরিবর্তন করতে হবে। বিশ্বব্যাপি নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষা অর্জনের জন্য আরও প্রায় ২২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন। যা বর্তমানে যে পরিমাণ অর্থ দেওয়া হয় তার প্রায় পাঁচগুণ। সাহায্যের এই বিশাল ব্যবধান মেটাতে হবে। এর সাথে জাতিসংঘের শিক্ষা বিষয়ক বিশেষ দূত গর্ডন ব্রাউন যুদ্ধাক্রান্ত ও মানবেতর, জরুরি অবস্থার সম্মুখীন শিশুদের কাছে শিক্ষা পৌঁছে দেয়ার জন্য অর্থসংস্থানের কার্যকর পদক্ষেপ আহ্বান করেছেন।

তৃতীয়ত, অসমতার ব্যাপারে বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে সচেতন হতে হবে। প্রত্যেক সরকারকে নারী-পুরুষ, সম্পদ ও গ্রামীণ-শহুরে ভেদে বৈষম্য কমিয়ে আনার জন্য সুস্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। সেই লক্ষ্যের সাথে সংগতিপূর্ণ বাজেট প্রণয়ন করতে হবে । পৃথিবীতে এখনো বৈষম্যগুলো বেশ প্রকট। উদাহরণ হিসেবে, নাইজেরিয়ায়, শহুরে বিত্তবান ২০ শতাংশ পরিবারের ছেলেরা গড়ে প্রায় দশ বছরের শিক্ষা লাভ করে , অন্যদিকে উত্তর অঞ্চলের দরিদ্র গ্রামীণ মেয়েরা দুবছরেরও কম সময় বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করতে পারে। এছাড়া, অসলো সম্মেলনের আরেকটি নেপথ্য প্রবন্ধে দেখানো হয়েছে, বেশিরভাগ রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যয় পক্ষপাতিত্বমূলকভাবে বিত্তবানদের অনুকূলে।

সবশেষে, সরকার ও দাতা সংস্থাদের অবশ্যই বাজারভিত্তিক পরীক্ষণ বাদ দিয়ে পুরো ব্যবস্থার প্রকৃত পুনর্গঠন করার অঙ্গীকার করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রধান অগ্রাধিকার পাবেন শিক্ষকরা । তারা যেন যথাযথ পারিতোষিক পান সেদিকে নজর রাখা প্রয়োজন। যথাযথ শিক্ষা প্রদানের জন্য শিক্ষকদের কার্যকর প্রশিক্ষণ ও নির্ভরযোগ্য সহায়ক ব্যবস্থা রাখা জরুরি। কেননা কোনোদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ততটুকুই ভালো থাকে যতটুকু ভালো থাকেন শিক্ষকেরা।

অসলোতে যখন বিশ্বের নেতৃবৃন্দ সমবেত হয়েছেন তখন লক্ষ লক্ষ অভিভাবক তাদের সন্তানের প্রাপ্য শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য সংগ্রাম করছেন। সেই শিক্ষা তাদের নিজের ও পরিারের একটু উন্নততর জীবনযাপনে সক্ষম করবে। এই অভিভাবকদের কাছে বিদ্যালয় একটি আশার উৎস। আমরা তাদের এবং তাদের সন্তানদের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে দায়বদ্ধ।

অননূদিত প্রবন্ধটি পড়তে ক্লিক করুন : www.project-syndicate.org/commentary/oslo-public-education-development-by-kevin-watkins-2015-07

উন্নয়নের জন্য তথ্য

নিউইয়র্ক- তথ্য বিপ্লব সমাজের প্রতিটি অঙ্গকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে । সারাবিশ্বে বায়োমেট্রিক্স এর মাধ্যমে নির্বাচন সংগঠিত করা হচ্ছে, স্যাটেলাইট ইমেজারির মাধ্যমে বন-জঙ্গলগুলো দেখভাল করা হচ্ছে, ব্যাংকিং ব্রাঞ্চ অফিস থেকে ঢুকে গেছে স্মার্টফোন-এ এবং মেডিকেল এক্সরে পরীক্ষা করা যাচ্ছে দূর থেকে। ইউএন সাসটেইনেবল ডেভলপমেন্ট সল্যুশনস নেটওয়ার্ক (এসডিএসএন) কর্তৃক প্রকাশিত ‘ডেটা ফর ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক একটি রিপোর্টে দেখানো হয়েছে যে, কিছুটা দূরদর্শিতা এবং বিনিয়োগ নিশ্চিত করা হলে তথ্য বিপ্লব বিশ্বের টেকসই উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে পারবে। একই সাথে ভূমিকা রাখবে দারিদ্র্য বিমোচনে অগ্রগতি আনতে সামাজিক অন্তর্ভূক্তি এবং পরিবেশকে রক্ষা করতে।

সারা বিশ্বের সরকারগুলো আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের একটি বিশেষ সম্মেলনে ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য’ বা সাসটেইনেবল ডেভলপমেন্ট গোল(এসডিজি) গ্রহণ করবে। এই সম্মেলন বিশ্ব নেতৃবৃন্দের অংশগ্রহণে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সম্মেলনগুলোর একটি। কারণ এখানে ১৭০টি দেশের সরকারপ্রধান এবং নেতৃবৃন্দ সবার জন্য প্রযোজ্য এমন কিছু লক্ষ্য নির্ধারণ করবেন যা আগামী ২০৩০ পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী উন্নয়নকে দিক-নির্দেশনা দেবে। আমরা জানি, লক্ষ্য অর্জন করার চেয়ে লক্ষ্য নির্ধারণ করা সহজ।২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি বাস্তবায়নে আমাদের কিছু নতুন হাতিয়ার যেমন নতুন তথ্য ব্যবস্থা প্রয়োজন হবে। নতুন এই তথ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান এবং সিভিল সোসাইটিগুলোকে ৪ টি স্বতন্ত্র উদ্দেশ্যকে মাথায় রাখতে হবে।

প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণটি হলো সেবা প্রদানের জন্য তথ্য। তথ্য বিপ্লব সরকার এবং ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সেবা প্রদানে, দুর্নীতি দমনে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে, দুর্গম এলাকাগুলোতে গমনের নতুন এবং উন্নততর উপায় বাৎলে দিয়েছে। তথ্য প্রযুক্তি ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য সেবা, শিক্ষা, সুশাসন, অবকাঠামো (যেমন – প্রিপেইড বিদ্যুৎ), ব্যাংকিং সেবা, জরুরি সেবা ইত্যাদি প্রদানে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে।

দ্বিতীয় লক্ষ্য হলো পাবলিক ম্যানেজমেন্টের জন্য তথ্য। সরকারি কর্মকর্তারা এখন রিয়েল-টাইম ড্যাশবোর্ড ব্যবহার করছেন যা তাদেরকে সরকারি বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা, পরিবহন নেটওয়ার্ক, জরুরি ত্রাণ কার্যক্রম, জনস্বাস্থ্য জরিপ এবং অপরাধমূলক কার্যক্রমগুলো সম্পর্কে অবহিত রাখছে। নাগরিকদের কাছ থেকে মতামত নেয়ার মাধ্যমে এই ম্যানেজমেন্ট প্রক্রিয়াকে শানিত করা যায়। যেমন গাড়িচালকদের কাছ থেকে ক্রাউডসোর্সের মাধ্যমে ট্রাফিক-সম্পর্কিত তথ্য নেয়া যায়। জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম (জিআইএস)এর মাধ্যমে রিয়েলটাইমে দূরবর্তী অঞ্চলের স্থানীয় সরকার এবং জেলা প্রশাসনের কার্যক্রম দেখভাল করা যায়।

তৃতীয় উদ্দেশ্য হলো সরকার এবং ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে তথ্য। সরকারি আমলাতন্ত্র সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে অনেকসময় নামমাত্র সেবা দেয়, ফাঁকি দেয়, অর্জনগুলোকে বড় করে দেখায়, সবচেয়ে খারাপ যে বিষয়টি তা হলো তারা যদি সুযোগ পান তবে চুরিও করেন। ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলোও অনেক সময় এমন করে। তথ্য বিপ্লব সরকার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে সেবাপ্রত্যাশীদের এবং সাধারণ নাগরিকদের যাচাইযোগ্য তথ্য পাওয়া নিশ্চিত করতে পারে।   যখন সেবা সময়মত পাওয়া যাবে না (সেবা তৈরি প্রক্রিয়ায় দূর্বলতা বা সাপ্লাই চেইনে দুর্নীতির কারণে হতে পারে), তথ্য ব্যবস্থা তখন জনসাধারণকে সমস্যা নির্দিষ্ট করতে এবং সরকার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহি করাতে সহায়তা করবে ।

চতুর্থ ও শেষ উদ্দেশ্যটি হলো, বৈশ্বিক উন্নয়ন লক্ষ্যগুলো সঠিকভাবে অর্জিত হচ্ছে কিনা তা জনগনকে জানাবে এই তথ্য ব্যবস্থা। ২০০০ সালে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (মিলিনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল) ২০১৫ সালে অর্জন করতে হবে এমন কিছু সংখ্যাগত লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। আমরা আজ এমডিজির শেষবর্ষে উপনীত হয়েছি। কিন্তু উচ্চমানসম্পন্ন এবং সময়ানুগ তথ্যের অভাবে আমরা এখনো জানি না এমডিজির লক্ষ্যগুলো সঠিকভাবে অর্জিত হয়েছে কিনা। এমডিজির কিছু গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য অর্জন সম্পর্কে বেশ কয়েক বছর ধরে কোনো রিপোর্ট প্রকাশ করা হচ্ছে না। যেমন: বিশ্বব্যাংক ২০১০ এর পর এখনো দারিদ্র্য পরিস্থিতির উপর বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করে নি।

তথ্য বিপ্লব এই বিলম্বের অবসান করতে পারে এবং তথ্যের মানে নাটকীয়ভাবে উন্নতি সাধন করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, মৃত্যুহার হিসাব করতে কয়েকবছর পরপর খানাভিত্তিক জরিপের (হাউজহোল্ড সারভে) উপর নির্ভর না করে সিভিল রেজিস্ট্রেশন এবং ভাইটাল স্ট্যাটিসটিক্স ( জন্ম, মৃত্যু, স্বাস্থ্য, রোগ এবং বিয়ে সম্পর্কিত পরিসংখ্যান) এর মাধ্যমে রিয়েলটাইমে মৃত্যুহার বিষয়ক তথ্য পাওয়া সম্ভব। এর সাথে মৃত্যুর কারণও জানা যাবে।

অনুরূপভাবে, জরিপের ক্ষেত্রে কাগজ এর পরিবর্তে স্মার্টফোন ব্যবহার করে আজকের চেয়ে অনেক কম খরচে ঘন ঘন দারিদ্র্য সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ করা যাবে। বিশ্লেষকগন জানিয়েছেন, পূর্ব আফ্রিকার কিছু দেশে দশ বছরের মধ্যে মোবাইল ফোন ব্যবহারের মাধ্যমে জরিপের খরচ ৬০ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব। তথ্য সংগ্রহের গতিকে ত্বরান্বিত করতে গ্যালপ ইন্টারন্যাশনাল এর মত বেসরকারি কোম্পানিগুলো প্রথাগত সরকারি পরিসংখ্যান সংস্থার সাথে কাজ করতে পারে।

তথ্য বিপ্লব সেবা প্রদান, সেবা ব্যবস্থাপনা, সেবা প্রদানকারীদের জবাবদিহিতা এবং বৈধতা নিশ্চিত করতে অভূতপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি করেছে।প্রযুক্তির এই নিবিড় ইকোসিস্টেমকে ধন্যবাদ। কারণ এই ইকোসিস্টেম রিমোট সেন্সিং এবং স্যাটালাইট ইমেজারি, বায়োমেট্রিক ডেটা, জিআইএস ট্র্যাকিং, ফ্যাসিলিটি-ভিত্তিক ডেটা, হাউজহোল্ড সারভে, সোস্যাল মিডিয়া, ক্রাউড সোর্সিং এবং অন্যান্য চ্যানেলের মত বহুমাত্রিক উপায়ে তথ্য সংগ্রহ করতে পারে।

এসডিজি বাস্তবায়নে সহায়তা করতে এই তথ্যগুলো সবদেশের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া উচিত।মূল লক্ষ্য সংক্রান্ত তথ্যগুলো অন্তত একবছর পরপর প্রকাশ উচিত। এবং যে খাতগুলো অতীব গুরুত্বপূর্ণ,(স্বাস্থ্য, শিক্ষা) সেগুলোর জন্য থাকবে রিয়েল টাইম তথ্য। এই ডেটা ইকোসিস্টেমে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যেমন মোবাইল কোম্পানি, সোস্যাল মার্কেটিং কোম্পানি, সিস্টেম ডিজাইনার, জরিপকারী প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সকলকে একীভূত করা উচিত।

নতুন রিপোর্টটি প্রস্তুতকালে, এসডিএসএন এসডিজি’র জন্য কিভাবে তথ্য বিপ্লব প্রক্রিয়া শুরু করা যায় তার ‘প্রয়োজনীয়তা যাচাই’ করতে কয়েকটি পার্টনার প্রতিষ্ঠানের সাথে কাজ করেছে । রিপোর্টটি যে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে সেখানে জাতীয় পরিসংখ্যান প্রতিষ্ঠানের সাথে ব্যক্তিখাত এবং বেসরকারি খাতের তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের পার্টনারশিপ করার কথা বলা হয়েছে। রিপোর্টটি গুরুত্বের সাথে জানিয়েছে যে, নতুন তথ্য ব্যবস্থা সৃষ্টি করতে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোর আর্থিক সাহায্য প্রয়োজন হবে।

নতুন গবেষেণাটির প্রাথমিক হিসাবে দেখা গেছে প্রযুক্তি উদ্ভাবনের এই যুগে ৭৭ টি নিম্ন আয়ের দেশের সবগুলোতে এসডিজি বাস্তবায়নের জন্য যথাযথ তথ্য ব্যবস্থা নির্মাণ করতে বছরে ন্যূণতম ১০০ কোটি ডলার প্রয়োজন হবে। এই অর্থের অর্ধেক অফিসিয়াল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসিসটেন্স হিসেবে যাওয়া উচিত। এর মানে বর্তমানে যে পরিমাণ অর্থ সাহায্য দেয়া হচ্ছে প্রতিবছর তার চেয়ে ২ কোটি ডলার করে বর্ধিত সাহায্য দিতে হবে।

এখন সময় এসেছে এই অতিরিক্ত অর্থ সাহায্য প্রদানের অঙ্গীকার করার।জুলাইয়ে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাইনান্স ফর ডেভলপমেন্ট কনফারেন্স-এ যোগ দিতে আদ্দিস আবাবায় একত্রিত হবেন। এর কয়েক সপ্তাহ পর সেপটেম্বর এর শেষ দিকে এসডিজি গ্রহণ করতে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে একত্রিত হবেন। এই দুই সম্মেলনের পূর্বে বিশ্ব এসডিজি বাস্তবায়নের জন্য তথ্য ব্যবস্থা চালু করার প্রস্তুতি নেবেন।

অননূদিত প্রবন্ধটি পড়তে ক্লিক করুন : www.project-syndicate.org/commentary/sustainable-development-data-by-jeffrey-d-sachs-2015-05

সামাজিক নির্বাচন এবং সমৃদ্ধি

ক্যামব্রিজঃ মানুষ সবসময়ই চেয়েছে দলবদ্ধ হয়ে বাস করতে এবং তাদের ব্যক্তিজীবন নানাভাবে দলীয় সিদ্ধান্তের উপরে নির্ভরশীল। কিন্তু, দলীয় সিদ্ধান্তের বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা আছে, বিশেষ করে দলের সদস্যদের নানাবিধ স্বার্থ ও মনোভাব বিবেচনা করলে। তাহলে কীভাবে দলগত সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে?

একজন স্বৈরশাসক চান অন্যের মতের তোয়াক্কা না করেই মানুষের জীবনের প্রতিটি দিক নিজের মতো করে নিয়ন্ত্রণ করতে। কিন্তু এই পর্যায়ের ক্ষমতা সহজে অর্জন করা যায় না। তদুপরি, স্বৈরশাসন যেকোনো সমাজকে পরিচালনা করার জন্য একটি নিন্দনীয় মাধ্যম বলে বিবেচিত হয়। একারণে, নৈতিক এবং বাস্তবিক উভয় কারণেই সমাজবিজ্ঞানীরা দীর্ঘসময় ধরে অনুসন্ধান করেছেন কোন সমাজ যদি পুরোপুরি গণতান্ত্রিক নাও হয়, তবুও কীভাবে সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় সকল সদস্যের মতের কোন না কোনভাবে প্রতিফলন ঘটানো যায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় খ্রিষ্টপূর্ব ৪ অব্দে প্রাচীন গ্রিসে এরিস্টটল এবং ভারতে কৌটিল্য সামাজিক নির্বাচনের নানাদিক (যেমনঃ রাজনীতি ও অর্থনীতি ) তাদের কালজয়ী বইগুলোতে বর্ণনা করেছেন। ( কৌটিল্যের বইয়ের সংস্কৃত নাম হল অর্থশাস্ত্র, যার অর্থঃ বস্তুজাগতিক উন্নয়নের বিজ্ঞান)

একটি বিধিবদ্ধ বিষয় হিসেবে সামাজিক নির্বাচন আবির্ভূত হয় মূলত অষ্টদশ শতকের শেষ দিকে, ফরাসী গণিতবিদ জি সি বোর্দা এবং মার্কো ডি কন্ডোর্সের হাত ধরে। তৎকালীন জ্ঞান বিজ্ঞান ইউরোপীয় নবজাগরণ তথা রেনেসাঁ দ্বারা তীব্রভাবে অনুপ্রাণিত হয়। এই নবজাগরণের মূল উদ্দেশ্য ছিল নতুন একটি সামাজিক কাঠামো নির্মাণ করা এবং এমন একটি সমাজ ব্যবস্থা তৈরি করা যেখানে সব মানুষের মতেরই সমান গুরুত্ব থাকবে।

কিন্তু বোর্দা-কন্ডোর্সে এবং পরবর্তী সময়ে আরও অনেকের তাত্ত্বিক গবেষণায় এই বিষয়ে হতাশাজনক ফলাফল পাওয়া গেছে। উদাহরণ হিসেবে কোন্ডর্সের উপস্থাপিত ভোটিং প্যারাডক্স তত্ত্বের কথা বলা যায়, যেখানে দেখা গেছে নির্বাচনের ক্ষেত্রে মেজরিটি রুল এমন একটি অবস্থায় পৌঁছাতে পারে যেখানে প্রত্যেক সিদ্ধান্তই অন্য কোন না কোন সিদ্ধান্ত দ্বারা ভোটে পরাজিত হয়। এর ফলে একটি সিদ্ধান্ত কোনভাবেই অন্যসব সিদ্ধান্তের উপরে অবস্থান করতে পারে না। সামাজিক নির্বাচন তত্ত্ব আজকের আধুনিক ও পর্যায়ক্রমিক ভিত্তি অর্জন করার পিছনে সবচেয়ে বড় অবদান কেনেথ জে অ্যারো এবং ১৯৫০ সালে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্পন্ন করা তাঁর পিএইচডির গবেষণাপত্র এর। তাঁর এই গবেষণার মাধ্যমেই পৃথিবী পরিচিত হয় বিখ্যাত “অসম্ভাব্যতা তত্ত্বের” সাথে – যা একটি অসাধারণ বিশ্লেষণাত্মক ও অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার ফসল।

অ্যারো’র অসম্ভাব্যতা তত্ত্ব থেকে দেখা যায়, কোন প্রক্রিয়াতেই সমাজের সকল সদস্যের মতামতের উপরে ভিত্তি করে নেয়া সামাজিক সিদ্ধান্ত এবং যৌক্তিকতার মানদণ্ডকে সহবস্থানে রাখা যায়না। ১৯৫১ সালে তাঁর এই গবেষণাপত্রের উপরে ভিত্তি করে “সোশ্যাল চয়েজ এবং ইন্ডিভিজ্যুয়াল ভ্যালুস” প্রকাশিত হবার পর থেকেই এটি কালজয়ী একটি বই হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

অর্থনীতিবিদ, তাত্ত্বিক রাজনীতিবিদ, নৈতিক ও রাজনৈতিক দার্শনিক, সমাজবিজ্ঞানী, এমনকি সাধারণ মানুষও তাঁর এই গবেষণালব্ধ ভয়াবহ ফলাফলের সাথে অবগত হল। নবজাগরণ প্রক্রিয়া তথা রেনেসাঁর মাধ্যমে সামাজিক যৌক্তিকতার যে ধারণা ২০০ বছর আগে বিকাশ লাভ করেছিল, অ্যারোর গবেষণায় তা ব্যর্থ প্রমাণিত হল।

এটা জানা গুরুত্বপূর্ণ যে, অ্যারো’র গবেষণার এই ফলাফল কীভাবে পাওয়া গেল। যে যুক্তিতর্কের উপরে এই তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় তাতে দেখা যায়, শুধুমাত্র মানুষের মতের র‍্যাংকিং এর উপরে ভিত্তি করে দুটি পৃথক সামাজিক নির্বাচন বিষয়ক সমস্যার সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হয়না। তাছাড়া প্রচলিত মতবাদের বাইরেও বেশকিছু জনপ্রিয় মতবাদ থাকে যেগুলোর মিলিত প্রতিক্রিয়ায় প্রাপ্ত তথ্যসমূহের ব্যবহার্যতা হ্রাস পায়।

সামাজিক সমৃদ্ধির বিচার করতে গেলে বিভিন্ন ব্যাক্তির স্বতন্ত্র লাভ ক্ষতি এবং নির্বাচনে তার প্রভাব সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। কারন সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যক্তিমতের র‍্যাংকিং হতে এটা জানা কখনোই সম্ভব নয়। এর সাথে সাথে এটা জানাও দরকারি যে বিভিন্ন ভোটিং প্রক্রিয়ায় কোন জনমত বা জনমতগুলো সমস্যার সৃষ্টি করছে।

সবকিছুর পরেও গণতন্ত্র কি আশা করে এবং ভোট গণনার (যদিও তা গুরুত্বপূর্ণ) বাইরেও কি কি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ , তা জানতে অ্যারোর অসম্ভাব্যতা তত্ত্ব গঠনমূলক ভূমিকা পালন করছে। গণতান্ত্রিক তথ্য ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধকরণ, অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সামাজিক উন্নয়নের যৌক্তিক নিরীক্ষার সুযোগ প্রদানের মাধ্যমে গণতন্ত্র আরো ভালোভাবে কাজ করতে পারবে। এইভাবে অনেকগুলো পৃথক প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের মাধ্যমে সামাজিক নির্বাচন তত্ত্ব একটি আনুষ্ঠানিক- বিস্তৃত বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

কোন পরিস্থিতিতে মেজরিটি রুল নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য ফলাফল প্রদান করবে? বিভিন্ন ভোটিং মাধ্যম একটি স্বচ্ছ ফল প্রকাশে কতটুকু সক্ষম ? সদস্যদের নানাবিধ স্বার্থ থাকা সত্ত্বেও একটি সমাজকে আমরা কতটুকু অগ্রসর বিবেচনা করতে পারি? কীভাবে একটি সমাজ দলগত সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দেবার পাশাপাশি কোন ব্যক্তির অধিকার ও স্বাধীনতাকে সুযোগ দিতে পারে? সমাজের বিভিন্ন মানুষের সম্মিলিত দুর্গ্রহ এবং পরিবর্তনশীল প্রতিবন্ধকতার নিরিখে কীভাবে আমরা দারিদ্র্য পরিমাপ করতে পারি? কীভাবে জনমানুষের সম্পদ, যেমন প্রাকৃতিক পরিবেশকে আমরা সামাজিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারি?

একটি ন্যায়বিচার তত্ত্ব এই প্রশ্নগুলোর বাইরে গিয়েও সামাজিক নির্বাচন তত্ত্বকে বিশ্লেষণ এবং হিসাবিক ফলাফলের উপরে ভিত্তি করে এর উপরে নতুন আলোকপাত করতে পারে। ( যেমনটি ২০০৯ সালে আমি “দ্যা আইডিয়া অফ জাস্টিস” বইতে আলোচনা করেছি ) তাছাড়া এই বিষয়ে তাত্ত্বিকদের গঠনমুলক আলোচনা আরো কিছু বিষয়ে গবেষণায় সহায়ক ভূমিকা রেখেছে যেগুলো সামাজিক নির্বাচন তত্ত্বের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত নয়। যেমনঃ লিঙ্গবৈষম্যের স্বরূপ ও ফলাফল, দুর্ভিক্ষের কারণ ও প্রতিকারের উপায়।

সামাজিক নির্বাচন তত্ত্বের প্রসার ও প্রয়োগ শুধুমাত্র যুক্তিতর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর ক্ষেত্র আরো বিস্তৃত। অ্যারো’র অসম্ভাব্যতা তত্ত্ব এবং এর দ্বারা অনুপ্রাণিত আরো অনেক লেখা আমাদের যৌক্তিক চিন্তা করার এবং দলগত সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা বৃদ্ধি করছে যার উপরে আমাদের জীবনধারণ ও আনন্দলাভ নির্ভর করে।