অতিথি লেখাঃ বোগডান বেলেই কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স এর সেন্টার ফর প্রিভেনশন অ্যাকশন এ একজন খণ্ডকালীন কর্মী হিসেবে কাজ করছেন।

 জুলিয়াস সিজার ৪৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে যখন রোম আক্রমণে অগ্রসর হচ্ছিলেন, তখন রুবিকন অতিক্রম করার আগে তাঁকে থামতে হয়েছিলো। তাঁর অধীনে কেবল একটি মাত্র সৈন্যদল ছিল এবং তারা পম্পেই এর সৈন্যদলের তুলনায় সংখ্যায় ছিল অর্ধেক। রোম অভিমুখে অভিযান অব্যাহত রাখায় সিজারের সামনে পরাজয়ের সম্ভাবনা ছিল প্রকট। কিন্তু এরপরেও সিজার তাঁর সৈন্যদলকে নিয়ে রোম বিজয় করেন এবং রোমান সাম্রাজ্যকে সুসংহত করেন। প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই করার অনুপ্রেরণা সিজার বাস্তবতার মধ্যে খুঁজে পেয়েছিলেন, কারণ তাঁর সামনে বিজয়ের একটি মাত্র বিকল্প ছিল, সেটি হল আত্মসমর্পণ।

বর্তমানে ওবামা প্রশাসন সিরিয়াতে অনুরূপ একটি অবস্থার সম্মুখীন হয়েছে যার পিছনে মূল কারণ স্বঘোষিত ইসলামিক স্টেট বা আই এস’কে ধ্বংস করার জন্য তাদের কৌশলগত অবস্থান। একইসাথে প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের অপসারণের দাবিতে তাদের অনড় অবস্থান, সিরিয়া বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কার্যকরী ভূমিকা রাখার পথে প্রধান অন্তরায়। ওবামা যখন ২০১১ সালে প্রথম বাশার আল আসাদের অপসারণ দাবি করেছিলেন, এর পর থেকে ঘটনার প্রেক্ষাপট ও মূল নিয়ামকে অনেক পরিবর্তন এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র আই এস বা আসাদের অপসারণ, কোনটির জন্যই প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক বা আর্থিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমেরিকার  কৌশল সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ থামানোর পক্ষে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারছেনা। যুক্তরাষ্ট্র যদি প্রকৃতপক্ষেই সিরিয়ার অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে চায়, তার সামনে বেশ কিছু পদক্ষেপ আছে যার মাধ্যমে দেশটিতে গৃহযুদ্ধের অবসান এবং প্রতিপক্ষ দেশগুলোর সাথে অপ্রয়োজনীয় সংঘাত থামানো সম্ভব।

প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত আসাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত বিদ্রোহীদের কাছে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করা । এইসাথে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত হবে উপসাগরীয় দেশগুলো যেমন কাতার ও সৌদি আরবকেও বিদ্রোহীদের কাছে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করতে উদ্বুদ্ধ করা। গত ৪ বছরে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা যত বিদ্রোহীদের প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্র সরবরাহ করেছে তারা আই এস কিংবা আসাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তাদের ভূমিকা রাখতে পারেনি। পেন্টাগনের “ট্রেইন এন্ড ইকুইপ” – প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্রসরবরাহকরণ কর্মসূচির ফলস্বরূপ জুলাই  ১২ এবং সেপ্টেম্বর ২০ এ যেসব আমেরিকাপন্থি বিদ্রোহী সিরিয়ায় গিয়েছে, তারা সেখানে পৌঁছেই আক্রমণের শিকার হয়েছে এবং নিরস্ত্র হয়ে গেছে।এমনকি কিছু বিদ্রোহী আল কায়েদা ও আই এস’এ যোগদান করেছে। এই কৌশল যুক্তরাষ্ট্রকে তার অভীষ্ট লক্ষ্যের কাছাকাছিও নিয়ে যেতে পারেনি। বরঞ্চ এর প্রতিপক্ষ দেশগুলো এই সঙ্ঘাতে তাদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করেছে।

ওবামা প্রশাসনের এখন উচিত হবে একটি রাজনৈতিক সমাধানের পথে হাঁটা। জেনেভায় সাম্প্রতিক আলোচনা বর্তমান সামরিক অচলাবস্থার কারণে কোন অগ্রগতি ব্যতীতই শেষ হয়েছে। আলোচনার টেবিলে যুক্তরাষ্ট্রকে আবার ফিরে আসতে হবে এবং রাশিয়া ও ইরানের সাথে সরাসরি আলোচনায় অংশ নিতে হবে। এটা সত্যি যে, সিরিয়ার আকাশে রাশিয়ার বিমান হামলা এবং আসাদের পক্ষে ইরানের রেভুলিউশনারি গার্ডের অবস্থান গ্রহণের ফলে সঙ্কট আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। সিরিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে রাশিয়া এবং ইরান উভয় দেশেরই কৌশলগত স্বার্থ আছে। এ ক্ষেত্রে মস্কো কিংবা তেহরান, কেউই রাজনৈতিকভাবে আত্মঘাতী নয়।

রাশিয়ার আক্রমণের পিছনে কারণ হল, তারতুস এবং লাটাকিয়া বন্দরে নিজেদের দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থরক্ষা এবং দামেস্কে নিজেদের মিত্রকে রক্ষা করা। দুটি স্বার্থই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার উপরে নির্ভরশীল এবং যুক্তরাষ্ট্র যদি সিরিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে নমনীয় আচরণ দেখায় তবে রাশিয়া সামরিক হস্তক্ষেপ গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতে রাজি আছে। হেগ সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডি এর বিশ্লেষক সিজব্রেন ডি জং বলেন, আসাদ থাকবে কি থাকবে না সে বিষয়ে রাশিয়ার কোন মাথাব্যাথা নেই। তারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে চায় এবং ভূমধ্যসাগরে তাদের নিয়ন্ত্রণ চায়।

ইরান আসাদ ইস্যুতে রাশিয়ার চেয়ে বেশি আগ্রহী। কারণ মিত্রতার পাশাপাশি সিরিয়া ইরান ও হিজবুল্লাহ’র অন্যতম স্থলপথ এবং এই অঞ্চলে সৌদি আরবের সাথে দ্বন্দ্বে আসাদ বাহিনী ইরানের সহচর। কিন্তু ২০১১ সালের পর থেকে আসাদকে সহায়তা করার মূল্য ক্রমশ বেড়ে চলেছে এবং ইরান এর থেকে একটু হলেও মুক্তির প্রস্তাবকে স্বাগত জানাবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি সৌদি আরবকে সফলভাবে নিজেদের অস্ত্র কমানো ও সুন্নি বিদ্রোহীদের সহায়তা প্রদান করা থেকে বিরত রাখতে পারে, ইরানও সিরিয়া বিষয়ে নিজেদের সম্পৃক্ততা কমাতে রাজি হবে।

তৃতীয়ত, যেকোনো আলোচনার মূল বিষয় মানবিক বিবেচনার দিক থেকে দেখতে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত হবে সিরিয়ার উত্তরপশ্চিমে তুরস্ক সীমান্তে একটি নিরাপদ এলাকা  তৈরি করা। এই নিরাপদ এলাকা বা “সেফজোন” বেসামরিক জনগণের জন্য মানবিক করিডর হিসেবে ব্যবহৃত হবে এবং এটাকে সফল করার জন্য স্থল ও আকাশ নিরাপত্তা বাহিনী, মানবিক সাহায্যকারী সংস্থা এবং বিবাদমান দেশগুলোর সহায়তা দরকার। এই উদ্যোগ তখনি নেয়া সম্ভব হবে যখন সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিহতকরণে কূটনৈতিক আলোচনা কার্যকরী ভূমিকা রাখবে। এই নিরাপদ এলাকায় সিরিয়া কিংবা রাশিয়ার বিমান চলাচল বন্ধ থাকবে, যাতে করে সাধারণ বেসামরিক জনগণ শুধু বিমান হামলা থেকেই নয়, স্থলবাহিনীর আক্রমণ, রকেট কিংবা মিসাইল হামলা থেকে নিরাপদ থাকে এবং তাদের মানবিক সহায়তা প্রদান করা যায়।

একটি সেফ জোনের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হল বিভিন্ন পক্ষের সম্মতিপ্রদান। এই প্রক্রিয়া তখনি সফল হবে যখন পর্যাপ্ত মানবিক সাহায্য এবং স্থল বাহিনীর সাহায্য পাওয়া যাবে। ১৯৯২ সালের ঘটনা থেকে আমরা দেখি, সার্বরা যখন  স্রেব্রেনিকাতে জাতিসংঘের নিয়ন্ত্রণাধীন সেফহেভেন দখল করে, সামরিক সহায়তার অভাবে বেসামরিক জনগণকে রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। একটি নিরাপদ এলাকা ( সেফ জোন) গঠনে ফ্রান্স ও তুরস্ক  ইতিমধ্যে সামরিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কারণ সিরিয়ার শরণার্থী সমস্যার জন্য ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এবং তুরস্কই সবচেয়ে বেশি ভুগছে। বহুজাতিক সম্মতিক্রমে গঠিত একটি নিরাপদ এলাকা তথা সেফজোনের ভিতরে কিংবা আশে পাশে কোন সংঘাতময় ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে বিতর্কের ঝড় তুলবে এবং এতে করে ইরান ও রাশিয়ার দায়ভার আরও বেড়ে যাবে।

সিরিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠা করার জন্য  মার্কিন কৌশলকে বর্তমান লক্ষ্য থেকে সরে আসতে হবে। কারণ এর জন্য যে সম্পদ ও সামরিক সক্ষমতা প্রয়োজন তা বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সম্ভব নয়। ফলে বিদ্রোহী গ্রুপগুলোকে সহায়তা প্রদান বন্ধ করতে হবে, রাজনৈতিক সংলাপ চালিয়ে যেতে হবে এবং শরণার্থীদের মানবিক আবেদনে  সবগুলো দেশকে সাড়া দিতে হবে। সিরিয়ার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিরূপণে এছাড়া কোন বাস্তবসম্মত উপায় নেই। সিজারের সৈন্যবাহিনী দুটি কারণে রুবিকন অতিক্রম করেছিল, পরাজয়ের আশংকা এবং রোমান সাম্রাজ্য দখলের স্বপ্ন। সিরিয়াতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এর কোনটিই অপেক্ষা করছে না।

অননূদিত প্রবন্ধটি পড়তে ক্লিক করুন : blogs.cfr.org/zenko/2015/11/20/guest-post-obama-dont-cross-the-rubicon-in-syria/

Micah Zenko

Micah Zenko is a senior fellow in the Center for Preventive Action (CPA) at the Council on Foreign Relations (CFR). Previously, he worked for five years at Harvard University's Kennedy School of Government, and in Washington, DC, at the Brookings Institution, Congressional Research Service, and State Department's Office of Policy Planning. Zenko has published on a range of national security issues. He writes the blog Politics, Power and Preventive Action, which covers U.S. national security policy, international security, and conflict prevention, and also has a column on ForeignPolicy.org.