বেইনা জু এবং এলিনর আলবার্ট, অনলাইন লেখক

ভূমিকাঃ

চীনা কমিউনিস্টঃ পার্টি আধুনিক চীনের প্রতিষ্ঠাতা এবং ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল যার সদস্যসংখ্যা ছিয়াশি মিলিয়ন বা আট কোটি ষাট লক্ষ। দলটি এক দশক অন্তর অন্তর তার নেতৃত্বে পরিবর্তন আনে এবং ২০১২ সালে এর পঞ্চম প্রজন্মের নেতৃবৃন্দ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশটির জন্য ভবিষ্যৎ দিক নির্দেশনা নির্ধারণের দায়িত্ব গ্রহণ করে। চীনের সূচনালগ্ন থেকেই এই দল দেশটির রাজনীতিতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে আসছে। দ্রুত অর্থনৈতিক অগ্রগতির ফলস্বরূপ বর্তমানে দেশটিতে সামাজিক অস্থিরতা এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সৃষ্টি হয়েছে যা বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে চীনের জন্য হুমকিস্বরূপ। রাজনৈতিকভাবে অস্বচ্ছ দলটিতে বিভিন্ন স্ক্যান্ডাল তীব্র ক্ষমতা দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করেছে।

 

সূচনা এবং ক্ষমতা কাঠামোঃ

রাশিয়ান বিপ্লবে উদ্বুদ্ধ হয়ে, ১৯২১ সালে মার্ক্সিজম ও লেনিনিজম কে ভিত্তি করে বিরোধী ক্যুমিন্টাং এর সাথে দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের শেষে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির (সিসিপি)জন্ম হয়। যদিও ১৯৭০ এর শেষে এসে চীন তার বাজার ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনে; আধুনিক চীন এখন কিউবা, উত্তর কোরিয়া এবং লাউসের মতো লেনিনিস্ট ধারণা মেনে চলে। ক্ষমতার উপরে দলটির আধিপত্য তিনটি মূলদণ্ডের উপরে ভিত্তি করেঃ ১/ সদস্যদের উপরে নিয়ন্ত্রণ ২/ প্রোপাগান্ডা ৩/ পিপলস লিবারেশন আর্মি, যার ৭৭% সদস্যই পুরুষ এবং কৃষকেরা যার এক তৃতীয়াংশ সদস্যপদ পূরণ করে।

সিসিপি পাঁচ বছর পরপর ন্যাশনাল কংগ্রেস আহ্বান করার মাধ্যমে দেশ পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ নীতি গ্রহণ এবং কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করে। এই কমিটির সদস্যসংখ্যা ৩৭০, যার মধ্যে আছেন মন্ত্রী, উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকর্তা, আঞ্চলিক নেতা এবং সামরিক অফিসার। কেন্দ্রীয় কমিটি মূলত সিসিপি এর জন্য পরিচালনা পরিষদ হিসেবে কাজ করে। এই কমিটির প্রধান কাজ হল পঁচিশ সদস্যের পলিটব্যুরো নির্বাচন।

এর পরের ধাপে পলিটব্যুরো আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সাত সদস্যের স্থায়ী কমিটি নির্বাচন করে যেটিই সিসিপির ক্ষমতা ও নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করে। ক্ষমতার সর্বোচ্চ পর্যায়ে বর্তমানে আছেন শি জিনপিং যিনি ২০১২ সালে হু জিনতাও এর পরে দলের মহাসচিব হিসেবে অভিষিক্ত হন। প্রেসিডেন্ট এবং সেনাবাহিনীর প্রধাণ হিসেবে তিনি সরকারের কর্ম পরিকল্পনা নিরূপণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।  বর্তমান প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং স্টেট কাউন্সিল বা মন্ত্রী পরিষদের প্রধান হিসেবে দায়িত্বপালন করেন। শি জিনপিং ক্ষমতায় আসার পালাবদলে তাঁর পূর্বসূরির তুলনায় অধিক ক্ষমতাশালী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।  একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দলের একমাত্র নেতা হিসেবে তাঁর সিদ্ধান্ত দলের অন্যদের মতামতের ভিত্তিতে নেয়া সিদ্ধান্তের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

 

অষ্টম জাতীয় কংগ্রেসঃ

২০১২ সালে অষ্টম জাতীয় কংগ্রেসের সবচেয়ে দৃশ্যমান সিদ্ধান্ত হল এতে নতুন স্থায়ী কমিটির সদস্য সংখ্যা নয় থেকে সাত এ কমিয়ে আনা হয়েছে। এতে চীনের পরবর্তী প্রজন্মের নেতৃবৃন্দের নাম ঘোষণা করা হয়। তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, প্রেসিডেন্ট হু জিনতাও এর পদে অভিষিক্ত হোন এবং উপ প্রধানমন্ত্রি লি কেকিয়াং, প্রধানমন্ত্রী ওয়েন জিয়াবাও এর পদে আসীন হোন। নেতৃত্বের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ- স্থায়ী কমিটি, স্টেট কাউন্সিল তথা মন্ত্রি পরিষদ এবং কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশন- এর ৭০% আসনে নতুন সদস্যদের নিয়োগ দেয়া হয়। এটি গত তিন দশকে দলটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পালাবদল।

ক্ষমতার পালাবদল একটি জটিল প্রক্রিয়া, যেখানে গোপন আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সকল শীর্ষ নেতা সবগুলো স্থান নির্ধারণ করেন। কোন কোন বিশেষজ্ঞ সিসিপি’র ক্ষমতার গঠনকে দুটি ভাগে ভাগ করেন, যার এক ভাগে থাকে প্রিন্সলিং- শীর্ষ নেতৃবৃন্দের সন্তানেরা এবং অপরভাগে থাকে টুয়ানপাই- হু জিনতাও এর মতো যারা সাধারণ পরিবেশ থেকে কমিউনিস্ট ইয়ুথ লিগের মাধ্যমে উঠে আসেন। আবার কোন কোন বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিগত আনুগত্য এবং মিত্রতার ভিত্তিতে সৃষ্ট আরও জটিল একটি প্রবাহের কথা বলেন, যে চক্রে তিনটি দলের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই চলে। প্রথম দলে আছেন অবসরপ্রাপ্ত নেতারা, যেমন ডেং জিয়াওপিং যিনি হু জিনতাও কে সমর্থন দিয়েছেন। দ্বিতীয় দলে চীনের শীর্ষ সরকারী কর্মকর্তা এবং তৃতীয় দলে আছেন অর্থ আয়কারী ধনী সমাজ।  মিনক্সিন পেই, ক্লেরমন্ট ম্যাকানা কলেজের একজন চীন বিশেষজ্ঞের মতে সিসিপির সকল নেতারই কিছু না কিছু ব্যক্তিস্বার্থ আছে এবং প্রায়শ সেগুলোর মাঝে সংঘর্ষ বাঁধে। ত্রিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদল সম্পন্ন করা যায়।

ক্ষমতার পালাবদল প্রক্রিয়ায় বিশৃঙ্খলা এবং শি জিনপিং এর দুর্নীতি বিরোধী অভিযান এর মাধ্যমে এরূপ জটিল ঘটনা প্রবাহের পর্যবেক্ষণ করা যায়। এই অভিযানের ফলাফল অভূতপূর্ব।  ২০১৩ সাল থেকে এই অভিযান একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যক্তিত্বকে আইনের আওতায় এনেছে, এদের মধ্যে আছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট হু জিনতাও এর উপদেষ্টা লিং জিহুয়া, তার ভাই চোংকিং পার্টির প্রধান বো জিলাই এবং তার স্ত্রী, সামরিক বাহিনীর সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা শু চাইহোউ , গো বশিওং-যিনি পলিটব্যুরো স্থায়ী কমিটির সাবেক সদস্য এবং সিসিপির আইন ও রাজনীতি বিষয়ক কমিটির প্রধান।

দল থেকে বোকে বহিষ্কার এবং পরবর্তীকালে তার বিচার পার্টির মধ্যে তীব্র ক্ষমতার লড়াই এর বহিঃপ্রকাশ। অভিজাত রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গকে লক্ষ্য করে চালানো দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শি জিনপিঙের রাজনৈতিক অভিসন্দির অংশ বলে অনেকে মনে করেন। এটা তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীদের নির্মূল করার একটি ব্যাপক উদ্দেশ্য বলে মন্তব্য করেন প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যারন ফ্রিডবার্গ। তিনি এও মন্তব্য করেন, এই ঘটনা এটারই জানান দেয় যে উঁচু মহলের দুর্নীতি দেশটিতে আর সহ্য করা হবে না।

 

সুশাসনের পথে অন্তরায়সমূহঃ

গত কয়েক দশকজুড়ে সংঘটিত বৈশ্বিক ঘটনাপ্রবাহ এবং দলের মধ্যে অন্তর্কলহ বেশ কয়েকবারই সিসিপির সামনে শক্তিশালী বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৯৮৯ সালে গণতন্ত্রের দাবিতে তিয়েনআনমেন স্কয়ারে বিক্ষোভ এবং ১৯৯০ এর সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙ্গন দলটির মধ্যে অস্তিত্বের সঙ্কট সৃষ্টি করে। এর ফলে সিসিপি বাধ্য হয় তার ম্যান্ডেট পুনর্বিবেচনা করে দেখতে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের কারণ খুঁজে বের করতে দলটি পর্যায়ক্রমিক অনুসন্ধান চালায় এবং নিজেদের পুনর্গঠিত করে। তারা এটা বুঝতে পারে যে একটি গৎ বাঁধা পার্টিকেন্দ্রিক রাষ্ট্র, প্রাচীন ধ্যান ধারণা, একগুঁয়ে অভিজাত সমাজ, সুপ্ত রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং স্থবির অর্থনীতি দেশটিতে ধ্বংসের সূচনা ঘটাবে। সুত্রঃ  চীনা কমিউনিস্ট পার্টি, ডেভিড শাম্বাউ, ২০০৮।

সেসময় থেকেই সিসিপি দেশটির চোখধাঁধানো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে সামাজিক অগ্রগতির সামঞ্জস্য রাখতে বিভিন্ন টেকনোক্রেটিক পদ্ধতি অবলম্বন করে আসছে। আজকে দলের মূল উদ্দেশ্য হল, বিশ্বায়নের পথে অগ্রসর হওয়া, যা বিনিময়ে দেশটিতে দেবে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, অধিক মুনাফা এবং রাজনৈতিক নিরাপত্তা, এমনটি রিচার্ড ম্যাকগ্রেগর ২০১০ সালে তাঁর বই দ্যা পার্টিতে লিখেন।

১৯৮০ সালে ডেং জিয়াওপিং  যে দূরদর্শিতা দেখিয়েছেন, আজও চীনের প্রথম সারির রাজনৈতিক নেতারা তার অভাবে ভুগেন। সিসিপির এই সাবেক মহাসচিব দলটিতে স্বচ্ছতার প্রণয়ন করেন এবং চীনকে মুক্ত বাজার অর্থনীতির সাথে যুক্ত করেন।

চীনা সরকারের প্রতিনিধি পেই বলেন, তারা (বর্তমান রাজনীতিবিদেরা) মূলত প্রতিক্রিয়াশীল। সিসিপি আজ পর্যন্ত টিকে আছে শুধুমাত্র ৩০ বছর পূর্বের নেতাদের জন্য। আজকের নেতারা শুধু তাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবেন।

দলটিতে সামাজিক অরাজকতার ভয় সদা বিরাজমান। ২০১৩ এর বসন্তে ডকুমেন্ট নম্বর ৯ নামে একটি প্রচারপত্র সিসিপির মাঝে বিতরণ করা হয় যেখানে পার্টির জন্য বিপদজনক এরকম সাতটি  উপাদানকে চিহ্নিত করা হয়, যার মধ্যে আছে পশ্চিমা ধারণার গণতন্ত্র, মানবাধিকার, মার্কেটমুখী নিওলিবারিলিজম, পশ্চিমা মদদপুষ্ট প্রচারমাধ্যম এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতা। এই ডকুমেন্ট পার্টির মধ্যেকার ভয়ের বিষয়গুলোকে তুলে ধরে, যেমন অর্থনৈতিক মন্দা এবং দুর্নীতির মতো গণরোষ সৃষ্টিকারী উপাদান।

পেই বলেন, চীনের শাসনব্যবস্থা প্রকৃতপক্ষে যথেষ্ট বিকেন্দ্রীভূত হতে পারে। পলিটব্যুরোর সদস্যদের মূল দায়িত্ব শুধু পলিসি নির্ধারণ এবং মন্ত্রিদের নিয়োগ প্রদান। তারা মন্ত্রিসভার সদস্যদের মতো দৈনিক কাজের হিসাব রাখেন না। চীনের প্রদেশগুলো সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন পায় এবং কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত উপপ্রাদেশিক নেতৃবৃন্দ শাসন ব্যবস্থার সম্পূর্ণটাই নিয়ন্ত্রণ করেন। এরূপ আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পলিটব্যুরো কমিটির মাঝে, উপদেষ্টামণ্ডলী এবং চিন্তাবিদদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্নভাবে নীতিমালার উদ্ভব হতে পারে।

জবাবদিহিতার অভাবে সমাজে আয় বৈষম্য, ভোক্তাঅধিকারে বাঁধা, ভুমি দখল এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো অপরাধের সৃষ্টি হয়েছে।  এর অনেকগুলোই ইন্টারনেটের বদৌলতে সবার কাছে প্রকাশ পেয়ে গেছে এবং এর ফলে সিসিপি রাজনৈতিক যোগাযোগের উপরে তাদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। ঋণগ্রস্ত স্থানীয় সরকার কর্তৃক ডেভেলপারদের কাছে জমি বেঁচে মূলধন উঠানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। চেন গুয়াংচেং, একজন অন্ধ আইনজীবী যিনি জোরপূর্বক বন্ধ্যাকরণ এর অপরাধ ফাঁস করে দিয়েছেন। তিনি স্থানীয় সরকারের দুর্নীতি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো বিষয়গুলোর প্রতিবাদে নাগরিক পতাকা উত্তলনের ডাক দিয়েছেন। ভোক্তারা যখন নষ্ট হয়ে যাওয়া দুধ ও মাংস নিয়ে তাদের ক্ষোভের প্রকাশ ঘটালেন, কেন্দ্রীয় সরকার তখন চীনা খাদ্য পণ্যের ব্যাপারে তাদের দীর্ঘদিনের নীতিমালাপ্রয়োগে বাধ্য হল।

 

স্বরাষ্ট্র এবং পররাষ্ট্রনীতিঃ

দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট ব্যাপক আয়বৈষম্য সমাধানে  সিসিপির ভূমিকাকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়। ২০১২ সালের মাঝামাঝি আয় বৈষম্য কমিয়ে আনতে দলটি একটি নতুন আয়বণ্টন পরিকল্পনা প্রণয়ন করে। অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভাবের ফলে চীনে একটি বিস্তৃত মধ্যবিত্ত সমাজের সৃষ্টি হয়েছে, এর ফলে সুশাসনের পথে দৃশ্যমান বাঁধাগুলো  সরকারের সামনে এখন পরিষ্কার। পিউ রিসার্চ সেন্টারের মতে, দ্রুত প্রবৃদ্ধির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে দেশটিতে ধনী দরিদ্রের ব্যবধান, দ্রব্যমূল্য ,পরিবেশ দূষণ ইত্যাদি বেড়েছে, পশ্চিমা সংস্কৃতির আগ্রাসনে সাংস্কৃতিক অবনমন হচ্ছে এবং রাজনৈতিক দুর্নীতি বিষয়ে জনরোষ বাড়ছে।

২০০০ সালের শুরুতে দেশটির প্রবৃদ্ধি ছিল দুই অঙ্কের যা বর্তমানে কমে এক অংকের ঘরে এসে দাঁড়িয়েছে। নীতিমালা প্রণয়নকারীদের জন্য চীনের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সংকোচন অনেক বড় একটি মাথাব্যাথা। দেশের মানুষকে ব্যয় বৃদ্ধিতে উদ্বুদ্ধ করতে এবং প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর জন্য আমদানি নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে তারা নীতিমালা পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।  ২০১৩ সালে কমিউনিস্ট পার্টির গুরুত্বপূর্ণ একটি মিটিঙে (থার্ড প্লেনাম) রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে বাজারব্যবস্থায় প্রভাব ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কিন্তু একাধিক বিশ্লেষকের মত হচ্ছে, বাস্তবে চীনের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা খাত হুমকির সম্মুখীন। ২০১৫ সালের গ্রীষ্মে চীনা স্টক মার্কেটে ব্যাপক দরপতন, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে দলটির সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। স্টক বিক্রি বন্ধে সরকারের হস্তক্ষেপ এবং একই বছরে দ্বিতীয়বারের  মতো মুদ্রামানের অবনমন সত্ত্বেও চীনের বাজারে অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে।

অর্থনীতিতে চাঙ্গাভাব জাগাতে বেশ কিছু ক্ষুদ্র প্রকল্প হাতে নিলেও,২০১৪ সালে চীন তার ৭.৫% প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে শতাংশের দশ ভাগের এক ভাগ পর্যন্ত ব্যর্থ হয় যা দেশটির চব্বিশ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ধীর অর্জন। প্রবৃদ্ধির নিম্নমুখী আচরণ হিসাব করে, ২০১৫ সালে বেইজিং ৭% প্রবৃদ্ধি অর্জনের সাধারণ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

দলটি স্বাস্থ্যখাতেও ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, কারণ তার সামনে বিশাল একটি বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য ইনস্যুরেন্স সুবিধা প্রদান করার পরিকল্পনা রয়েছে। কন্সাল্টিং সংস্থা ম্যাকিন্সি এন্ড কোম্পানির হিসাবে, স্বাস্থ্য খাতে দেশটির ব্যয় ২০১১ সালের $৩৫৭ বিলিয়ন থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২০ সালে $১ ট্রিলিয়ন হতে পারে।

আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ কমাতে চীন তার প্রণীত নীতিমালা নিয়ে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করেছে। এতে ক্লিন এনার্জি বিষয়ে দেশটির পরিকল্পনা বিবৃত আছে। চীনের আকাশে ভারী ধোঁয়া (স্মগ) এর স্তর দেশটিকে বায়ুর মান বাড়াতে এবং দূষণমুক্ত শক্তির উৎস খুঁজতে বাধ্য করেছে। ২০১৩ সালের জুনে দেশটির সরকার বায়ুমান বৃদ্ধিতে আগামী পাঁচ বছরের জন্য $ ২৭৫ বিলিয়ন বিনিয়োগের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে যার মধ্যে আছে দেশটির প্রথম কার্বন মার্কেট নির্মাণের পরিকল্পনা। বায়ু মান বিষয়ে স্থানীয় জনগণের মাঝে সচেতনতা বাড়াতে এবং পরিবেশ দূষণ বিষয়ক মামলাগুলোর বিচার দ্রুত নিষ্পন্ন করতে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং শক্তি সঞ্চয় নিশ্চিত করতে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে বেইজিং কয়লার মানের পরিবর্তে দামের উপরে কর নির্ধারনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এর মধ্যে চীনের ক্রমবর্ধমান ক্ষমতা বিশ্বজুড়ে দেশটিকে একটি আগ্রাসী, প্রভাববিস্তারকারী শক্তির তকমা জুটিয়ে দিচ্ছে। বেইজিং, পীতসাগরে যুক্তরাষ্ট্র এবং দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়ার পরিকল্পনা এবং যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রয়ের ঘোর প্রতিবাদ জানিয়েছে। পূর্ব এবং দক্ষিণ চীন সাগরের অনেক দ্বীপে দেশটি তার মালিকানা দাবি করেছে, যার ফলে ঐ এলাকায় জাপান এবং এর পার্শ্ববর্তী চারটি দেশের সাথে চীনের কূটনৈতিক দ্বন্দ্বের অবতারণা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং তার এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় মিত্রদেশ জাপান, ফিলিপাইন এবং ভিয়েতনামের মধ্যে সামরিক সম্পর্ক জোরদারের জবাবে চীনও এই এলাকায় তার নৌশক্তি বৃদ্ধি করেছে।

নভেম্বর ২০১৩ সালে চীন, পূর্বচীন সাগরে আকাশ প্রতিরক্ষা চিহ্নিতকরণ অঞ্চল ঘোষণা করেছে, ঐ এলাকায় তেল এবং গ্যাস অনুসন্ধান চালিয়েছে এবং অমীমাংসিত জলসীমায় অনেকগুলো দ্বীপের মালিকানা দাবী করেছে। অন্যদিকে চীন তার প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। ২০১৪ আসিয়ান সামিটে চীন একটি মিত্রতা চুক্তির প্রস্তাবনা এনেছে এবং দক্ষিণপূর্ব এশিয়ান দেশগুলোর জন্য  $২০ বিলিয়নের একটি ঋণ প্রস্তাব পেশ করেছে। ২০১৪ সালের অর্থনৈতিক কর্পোরেশন সামিটে চীন এবং জাপানের নেতৃবৃন্দ বিগত দুই বছরের মধ্যে প্রথমবার কূটনৈতিক আলোচনায় অংশ নিয়েছেন, এরফলে নতুন করে চীন-জাপান সম্পর্ক উন্নয়নের একটি সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

কোন কোন বিশেষজ্ঞের মত হল অর্থনৈতিক প্রগতির সাথে সাথে চীনের বহুবিধ ক্ষমতার বৃদ্ধি হলেও এর পররাষ্ট্রনীতি মূলত এখন রক্ষণশীলঃ বাহ্যিক প্রভাব থেকে দেশকে মুক্ত রাখা, স্থলসীমা সুরক্ষিত রাখা এবং অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা চালু রাখা। ফরেন অ্যাফেয়ার্সের অ্যান্ড্রু জে নাথান এবং অ্যান্ড্রু স্কোবেল বলেন, পূর্বের তুলনায় বর্তমানে চীন বিশ্বঅর্থনৈতিক প্রক্রিয়ার সাথে আরও উতোপ্রোতভাবে জড়িত। একারণে এর আঞ্চলিক এবং প্রাদেশিক চাহিদাগুলো এখন বেশি করে দেশটির বৃহত্তর লক্ষ্য অর্জনের সাথে সম্পর্কিত।এই বৃহত্তর লক্ষ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এমন একটি বৈশ্বিক ভূমিকা পালনের স্বপ্ন যা একি সাথে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে এবং অন্যান্য পরাশক্তির সমর্থন আদায়ে সফল হয়।

সাদা চোখে বলতে গেলে চীনের নতুন নেতৃত্বের লক্ষ্য হওয়া উচিত যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি বিদ্বেষপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি থেকে বিরত থাকা। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের অভিমত, চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক ততদিন পর্যন্ত শীতল থেকে যাবে যতদিন চীনের পররাষ্ট্র ও রাজনীতিতে আমূল  পরিবর্তন না আসবে এবং এর সূচনা হবে প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে তার সম্পর্ক উন্নয়নের দ্বারা।

ফরেন অ্যাফেয়ার্সের মতে, এরপরেও যুক্তরাষ্ট্রের উচিত চীনের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্পর্ক তৈরি হতে বিরত থাকা। কারন এতে শি জিনপিং এর পশ্চিমা বিরোধী মতই জোরালো সমর্থন পাবে, অথচ এতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এবং যারা চীনকে নিরন্তর মধ্যপন্থা অবলম্বনের পথে ঠেলছে তাদের কোন লাভ হবে না।

 

অননূদিত প্রবন্ধটি পড়তে ক্লিক করুন : http://www.cfr.org/china/chinese-communist-party/p29443

Beina Xu

Beina Xu received a Bachelor of Arts in Comparative Literature at New York University. She has worked as a Writer, Editor and Producer for the Council on Foreign Relations in New York; as a Reporter and a Photographer for the Wall Street Journal/Dow Jones, New York and Elan Magazine, New York. She is the Co-Founder of Brownstone Magazine at New York University and a News Assistant for the Financial Times in Beijing, China.