কোপেনহেগেন- আগামী ১৫ বছরের মধ্যে বিশ্বনেতৃত্বকে কোন বিষয়ের প্রতি মনোযোগ দেওয়া উচিত? এ-প্রশ্নের উত্তরে সবার আগে আসতে পারে স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও শিক্ষার মত বিষয়; তবে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো – ব্রডব্যান্ডের সংযোগ সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পেতে পারে। এর পেছনে শক্ত যুক্তিও রয়েছে।

শুধু এই সহজ বিষয়টি ভাবুন, আগামী ১৫ বছরের মধ্যে মোবাইল ইন্টারনেট সংযোগ যদি তিনগুন করা যায় তবে উন্নয়নশীল দেশগুলো আরও ২২ ট্রিলিয়ন ডলার পরিমাণ সম্পদ অর্জনে সক্ষম হবে। দরিদ্র জনসাধারণের জীবনমান এবং আয়ের ক্ষেত্রে এ-ধরনের উন্নয়ন অন্যান্য চ্যালেঞ্জগুলো পরোক্ষভাবে মোকাবেলা করতে সাহায্য করবে। এটা তো জানা কথা, ধনী মানুষেরা তুলনামূলকভাবে অধিকতর স্বাস্থ্যবান, উদ্যমী এবং উচ্চ শিক্ষিত হবে।

এ-মুহূর্তে ব্রডব্যান্ডের বিষয়টি প্রাসঙ্গিক । কারণ আগামী সেপ্টেম্বর মাসে ১৯৩টি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিগণ জাতিসংঘে একত্রিত হবেন। তাঁরা ২০৩০ সালের মধ্যে পূরণ করতে হবে- এমন কিছু উন্নয়ন লক্ষ্যের একটি তালিকা প্রস্তুত করবেন। আমার চিন্তাশালা, কোপেনহেগেন কনসেনসাস-এর গবেষকরা অর্থনীতিবিদদের ৬০টি দলের (যাঁদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত) সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন। কোন খাতে বিনিয়োগ করলে ডলার প্রতি কল্যাণ সবচেয়ে বেশি হবে তা জানতে এবং জাতিসংঘের এই সম্মেলনকে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট লক্ষ্য বাছাইয়ে সহায়তা করতেই এই সাক্ষাৎকার নেয়া হয়।

নতুন একটি গবেষণায় দেখা যায় যে, টাওলূউস স্কুল অব ইকোনমিকস্ এর ইমানুয়েল অ্যরিয়্যাল ও অ্যালিক্সিয়া লী গনজালেজ ফ্যানফ্যালনি -এর মতে, ব্রডব্যান্ড ভবিষ্যতের জন্য সর্বোৎকৃষ্ট বিনিয়োগের ক্ষেত্রগুলোর একটি হতে পারে। এটা সুস্পষ্ট যে,দ্রুত ব্রডব্যান্ডের সেবা শিল্পায়িত বিশ্বের মানুষের জীবনকে বদলে দিয়েছে ব্যাপকভাবে। ব্রডব্যান্ডের এই সুযোগ-সুবিধা উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও পরিবর্তন নিয়ে আসবে। অনেক কারণেই আমরা এমন আশা করতে পারি।

বাজার বিষয়ক তথ্য পেলে কৃষক তার উদ্বৃত্ত পণ্য বিক্রি করতে গিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীর কাছে প্রতারিত হবেন না; জেলে তার আহরিত মাছ র্সবোচ্চ দামে বন্দরে বিক্রি করতে পারবেন। ম্যাকিনজি একটি গবেষণায় দেখিয়েছে , উন্নত দেশগুলোর মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও মোবাইল ব্রডব্যান্ড সুবিধা প্রদান করলে বছরে বৈশ্বিক জিডিপি-তে আরও ৪০০ বিলিয়ন ডলার যোগ হবে এবং ১ কোটির বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

একইভাবে, বিশ্ব ব্যাংক একটি পরিসংখ্যানে দেখিয়েছে, ব্রডব্যান্ড সংযোগ ১০ শতাংশ বৃদ্ধির ফলে নিম্ন- মধ্য আয়ের দেশগুলোর জিডিপি ১.৪ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই তথ্য ইঙ্গিত দেয় যে, উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের মধ্যকার ডিজিটিাল বৈষম্য নিরসন করতে পারলে বিশ্বের উন্নয়নের গতি ব্যাপকভাবে ত্বরান্বিত হবে । যেমন- মোবাইল ব্রডব্যান্ড সংযোগের হার উন্নত দেশে যেখানে ৮৩ শতাংশ সেখানে উন্নয়নশীল দেশে তা মাত্র ২১ শতাংশ।

ইউরোপ ও অন্যান্য দেশের সরকারগুলো দ্রুততর এবং উন্নততর ব্রডব্যান্ড সংযোগে নিয়মিত বিনিয়োগ করছে। ইন্টারনেট থেকে সবচেয়ে বেশি উপকার পাওয়া যাবে যদি তা সেইসব মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া যায় যারা পূর্বে ইন্টারনেট ব্যবহার করে নি। এরা অধিকাংশই উন্নয়নশীল ও উদীয়মান দেশের বাসিন্দা । এভাবেই উন্নয়নশীল দেশগুলো ব্যয়বহুল ফাইবার-অপটিক ক্যাবলস ও নেটওয়ার্ক এর অ্যাকসেস পয়েন্ট এড়িয়ে  সরাসরি মোবাইল ব্রডব্যান্ডের সুযোগ গ্রহণ করে উন্নত দেশগুলোকেও পেছনে ফেলতে পারে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ইতোমধ্যে মোবাইল ফোন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, অপ্রয়োজনীয় করে দিচ্ছে পুরনো আমলের স্থির অবকাঠামোকে। ডেটা সার্ভিসের ক্ষেত্রে একই সিস্টেম ব্যবহার করা যায়। চীনে তিন-চতুর্থাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী মোবাইলের মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহার করছে, যেখানে ইথোপিয়া ও উগান্ডায় করছে পাঁচভাগের চারভাগ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। মোবাইল ফোনের দ্রুত প্রসার ও মোবাইল নেটওয়ার্কের সাম্প্রতিক প্রযুক্তিগত উন্নতির ফলে মোবাইল ব্রডব্যান্ড সংযোগ স্বল্প ব্যয়-সাপেক্ষ সেবায় পরিণত হয়েছে।

অ্যরিয়্যাল ও ফ্যানফালনির গবেষণা দেখিয়েছে , উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মোবাইল ব্রডব্যান্ড সংযোগের হার ২১ শতাংশ থেকে ৬০ শতাংশে, এই তিনগুণ বৃদ্ধির জন্য ব্যয় হবে প্রায় ১.৩ ট্রিলিয়ন ডলার। এই অর্থ ব্যয় হবে আরো তিন বিলিয়ন ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে । তবে এই ব্যয়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধিও বেড়ে যাবে। ইন্টারনেট সংযোগের অবকাঠামো গড়তে এই পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হলে ২০২০ সালের মধ্যে বছরে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার পরিমাণ উপকার পাওয়া যাবে এবং এর মাত্রা প্রতি বছর বৃদ্ধি পেতে থাকবে। আগামী দশকে মোট উপকার পাওয়া যাবে প্রায় ২২ ট্রিলিয়ন ডলার এর সমান । এর ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মোবাইল ব্রডব্যান্ডে প্রতি ডলার খরচে আয় হবে ১৭ ডলার, যা অত্যন্ত লাভজনক বিনিয়োগ বলেই মনে হয়।

ব্রডব্যান্ড এত গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবশালী প্রযুক্তি যে অর্থনীতিতে এর অবদান কেমন হবে তা পুরোপুরি অনুমান করা দুষ্কর। স্থানীয় বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রেক্ষিতে এর অবদানও ভিন্ন হবে। অ্যরিয়্যাল ও ফ্যানফালনি-এর গবেষণা দেখিয়েছে, ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপনে ব্যয় হওয়া অর্থ ভালোভাবেই ব্যয় হচ্ছে। নেটওয়ার্ক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রত্যক্ষভাবে এবং এর সাপ্লাই চইেনে পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে । ব্রডব্যান্ড অর্থনীতির বৃহৎ পরিসরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সহায়তা করে। এর ফলে কোম্পানিগুলো অধিকতর দক্ষ ও উদ্ভাবনী ক্ষমতাসম্পন্ন হয়ে ওঠে। এইসব বিষয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি বাড়িয়ে দেয়।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রত্যক্ষ অবদান ছাড়াও ব্রডব্যান্ড স্বল্পন্নোত দেশগুলোতে কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপকার সাধন করতে পারে। লন্ডনের ইমপেরিয়্যাল কলেজ-এর প্যানটেলিস কৌটরোমপিস দেখিয়েছেন যে, স্বল্পন্নোত দেশগুলোতে নয় হাজার মিলিয়ন মানুষ বাস করে এবং এই দেশগুলোতে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হার মাত্র ৬.৭ শতাংশ । অন্যদিকে, এসব দেশে ৬০ শতাংশ মানুষ মোবাইল ব্যবহার করে। এই মোবাইল ব্যবহারকারীরা স্মার্টফোনে কিছু সাধারণ এপ্লিকেশন ব্যবহার করে হরেক রকম স্বাস্থ্য পরীক্ষা (কার্ডিওভাসকিউলার রোগ, এইচআইভি, প্যাথোজেন্স অথবা ম্যালেরিয়া) করতে পারেন। স্মার্টফোন ব্যবহার করে তারা এই টেস্টগুলোর ফলাফল দ্রুত হাসপাতালে প্রেরণ করতে পারেন। এভাবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে দ্রুততম সময়ে সেবা নিতে পারেন।

স্বল্পন্নোত দেশগুলোতে মোবাইল ব্রডব্যান্ডের সুবিধা আরো প্রসারিত করা যায় । ইন্টারনেট সংযোগ শিক্ষাসংক্রান্ত বিষয়গুলোকে সহজলভ্য করে স্কুলিং এর মান উন্নত করতে পারে । ব্রডব্যান্ড দূরবর্তী যে কোনো জায়গায় রিয়েল টাইমে পরিবহন সেবা সরবরাহে সহায়তা করবে।

আধুনিক বিশ্বে ইন্টারনেট এবং ব্রডব্যান্ড অতীব গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিতে পরিণত হয়েছে যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য দূরীকরণ, সুস্বাস্থ্য রক্ষায়, পুষ্টি সাধন এবং শিক্ষার উন্নয়নের অপরিহার্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই সরকারগুলো যখন পরবর্তী বৈশ্বিক উন্নয়ন লক্ষ্য নির্ধারণ করবেন তখন ব্রডব্যান্ডের সংযোগের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা উচিত।

অননূদিত প্রবন্ধটি পড়তে ক্লিক করুন : http://www.project-syndicate.org/commentary/broadband-access-lower-poverty-by-bj-rn-lomborg-2015-01

Bjorn Lomborg

Bjorn Lomborg is director of the Copenhagen Consensus Center and visiting professor at Copenhagen Business School. He researches the smartest ways to do good, for which he was named one of TIME magazine's 100 most influential people in the world. He is a visiting professor at Copenhagen Business School and regularly works with many of the world’s top economists, including 7 Nobel Laureates. His think tank, the Copenhagen Consensus Center, was ranked by the University of Pennsylvania as one of the world’s "Top 20 Advocacy Campaigns". He has been honored as One of the 100 Top Global Thinkers - Foreign Policy, 2011, 2010 and Thought Leader - Bloomberg Summit 2011.