অক্সফোর্ড- ইতিহাসের পরিক্রমায় প্রযুক্তিগত অগ্রগতি বিশাল সম্পদ সৃষ্টি করেছে কিন্তু সাথে সাথে বড় বিপত্তিরও কারণ হয়েছে। উদাহরণস্বরুপ, ১৯৬০ সালের দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টিল ইন্ডাস্ট্রি  একটি বড় ধরণের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গিয়েছিল । তখন বড় বড় স্টিল মিলগুলো ছোটো ছোটো মিলগুলোর কাছে ব্যবসায় মার খেয়েছিল। এর ফলে পিটসবার্গ, পেনসিলভানিয়া এবং ইয়ংস্টাউন, ওহাইও শহরগুলো অর্থনৈতিক ভিত ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু অন্যদিকে,  ছোট মিলগুলো তাদের উৎপাদনশীলতা ব্যাপকমাত্রায় বৃদ্ধি করেছিল এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে নতুন ধরণের কাজ সৃষ্টি করেছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের স্টিল ইন্ডাস্ট্রির এই গল্প গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। অর্থনীতিবিদ যোসেফ সুমপিটার যাকে বলেছেন, ক্রিয়েটিভ ডিসট্রাকশন। এর মানে হল দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শুধু বিদ্যমান কারখানাগুলোর ক্রমবর্ধমান উৎপাদশীলতাই নির্দেশ করে না, কর্মসংস্থানের কাঠামোগত পরিবর্তনও করে।

বর্তমানে তথ্য ও যোগাযাগ প্রযুক্তি আধুনিক কর্মপরিবেশের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত । এমনকি কম্পিউটার প্রোগ্রামিং এবং সফটওয়ার প্রকৌশলের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট নয় এমন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে । তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লবের এ যুগেও আমরা একই ধরনের পরিস্থিতি দেখতে পাই। কম্পিউটার প্রযু্ক্তি নতুন নতুন ব্যবসা সৃষ্টি করছে, এমনকি ব্যবসার ক্লাস্টার তৈরি করছে। এবং একই সাথে এখানে কিছু কিছু পেশার কর্মীকে অপ্রয়োজনীয় করে দিচ্ছে এবং পুরনো শিল্প -শহরগুলোকে পতনমুখী করে তুলছে।

কিন্তু ডেট্রয়েট, লিলি এবং লিডস এর মত শহরগুলোকে শিল্পোউৎপাদন কমার কারণে খুব একটা ভুগতে হয় নি। এমনকি, এই শহরগুলোতে গত দশকগুলোতে উৎপাদন আরো বেড়েছে। উৎপাদন বাড়লেও শহরগুলোর পতন হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি কারণে। সেটি হলো- ভিন্ন ধরণের পেশা সৃষ্টির ব্যর্থতা। বড় পরিসরে দেখলে এটা মূলত পলিসি পর্যায়ের ব্যর্থতা। সরকারি কর্মকর্তাদের  পুরনো শিল্পগুলোকে সংরক্ষণের চেষ্টা না করে  নতুন ধরণের পেশা বা কাজ সৃষ্টির বিষয়টি ম্যানেজ করার দিকে মনোযোগ দেয়া উচিত ছিল। এজন্য অবশ্য নতুন নতুন প্রযুক্তি সম্পন্ধে ভালো জানাশোনা থাকতে হয় । যার জায়গা দখল করে নেবে -নতুন প্রযুক্তিগুলো সেগুলোর থেকে কতটুকু আলাদা সে সম্পর্কেও থাকতে হবে সম্যক ধারণা।

শিল্প বিপ্লবের প্রথমদিকের শিল্প প্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল।  তা হলো প্রযুক্তিগুলো তুলনামূলকভাবে দক্ষ কারিগরদের জায়গাটি দখল করে নিয়েছিল। এর কারণে অদক্ষ কারখানা শ্রমিকের চাহিদা বেড়ে যায়। একইভাবে কার উৎপাদনের জন্য ১৯১৩ সালে হেনরি ফোর্ড এর অ্যাসেম্বলি লাইন- এর উদ্ভব হয়। এটি যন্ত্রপাতি পরিচালনার জন্য অদক্ষ শ্রমিকদের জন্যই ডিজাইন করা হয়েছিল। এর ফলে কোম্পানির সেই জনপ্রিয় টি মডেল কার উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছিল । এই টি মডেলই প্রথম কার যা আমেরিকার মধ্যবিত্তদের কেনার সামর্থ্য ছিল।

গত শতাব্দীতেও শিল্পবিপ্লবের মত অনেক গল্প তৈরি হয়েছে। সেখানে ক্রমবর্ধমান শিক্ষিত কর্মীবাহিনী এবং তাদের দক্ষতা প্রতিস্থাপনকারী প্রযুক্তির মধ্যে প্রতিযোগিতা হয়েছে। আমরা এর পরিণাম ও দেখেছি। শুধু কার ইন্ডাস্ট্রিতে নয়। আমরা দেখেছি রোবট কিছু রুটিন কাজ খুব ভালো ভাবেই সম্পন্ন করছে । এই কাজগুলো আগে হাজার হাজার মধ্য আয়ের অ্যাসেম্বলি লাইন শ্রমিকরা করত। কর্মপরিবেশে এরচেয়েও বড় আঘাত আসে আরেকটু দেরিতে।

ইতিহাস আমাদেরকে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের গতিপ্রকৃতি বিষয়ে ভবিষ্যৎবাণী করতে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেয়। তবে এসম্পর্কে আমাদের কিছু যুক্তিসংগত ধারণা জন্মেছে। কারণ প্রযু্ক্তিগুলো বিকশিত হওয়ার পর্যায়গুলোর সাথে আমরা ইতিমধ্যেই পরিচিত হয়েছি। যেমন আমরা জানি যে বিভিন্ন ধরণের দক্ষতা সমৃদ্ধ কাজ বিগ ডেটা এবং উন্নতমানের অ্যালগরিদম ব্যবহার করে তুলনামূলকভাবে সহজে করা সম্ভব।

এ বিষয়ে সিমানটেক ক্লিয়ারওয়েল এর উদাহরণ অনেক সময়ই দেয়া হয়। এটি একটি ই-ডিসকভারি প্ল্যাটফর্ম যা ভাষা বিশ্লেষণ করে ডকুমেন্টের সাধারণ কনসেপ্টগুলোকে চিহ্নিত করে এবং মাত্র দুদিনে ৫,৭০,০০০ ডকুমেন্ট বিশ্লেষণ এবং সাজাতে পারে। ক্লিয়ারওয়েল কম্পিউটারের সাহায্যে ট্রায়ালপূর্ব গবেষণা এবং প্যারালিগাল , এমনকি চুক্তি বা প্যাটেন্ট বিষয়ে আইনজ্ঞদের কাজগুলো সুষ্ঠুভা্বে সম্পন্ন করে এই পেশার খোলনলচে বদলে দিচ্ছে।

একইভাবে উন্নত সেন্সরি প্রযুক্তির কারণে পরিবহন এবং লজিস্টিক্স সংক্রান্ত কাজ সম্পূর্ণ অটোমেটেড বা স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাবে। এটি চিন্তা করা অসমীচীন হবে না যে গুগলের সেল্ফ-ড্রাইভিং কারের মত বাস এবং ট্যাক্সির জন্য আর চালকের  প্রয়োজন হবে না। এখন পর্যন্ত নিরাপদ থাকলেও স্বল্প-দক্ষতা প্রয়োজন এমন সেবাধর্মী পেশাগুলো স্বয়ংক্রিয়তার হাত থেকে রক্ষা নাও পেতে পারে।যেমন ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক প্রয়োজনে রোবটের চাহিদা প্রতিবছর ২০ শতাংশ হারে বাড়ছে।

শ্রম বাজার আবারও প্রযুক্তির উত্তাল হাওয়া এবং মজুরি বৈষম্যের মধ্যে প্রবেশ করতে পারে। এটি একটি বড় প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে- নতুন ধরনের কাজগুলো কোথায় এবং কিভাবে সৃষ্টি হবে? ভবিষ্যতে কি হবে তার কিছু চিহ্ন আমরা অবশ্য দেখতে পাচ্ছি। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন বিগডেটা আর্কিটেক্ট  অ্যানালিস্ট, ক্লাউড সার্ভিস বিশেষজ্ঞ, সফটওয়্যার ডেভেলপার এবং ডিজিটাল মার্কেটিং পেশাজীবীদের মত কিছু পেশার চাহিদা সৃষ্টি করছে। পাঁচ বছর পূ্র্বে এই পেশাগেুলোর তেমন কোনো অস্তিত্বই ছিল না।

একটি শহর বা দেশকে প্রযুক্তির বিকাশের সাথে কিভাবে খাপ খাইয়ে নিতে হয় তার একটি মূল্যবান শিক্ষা ফিনল্যান্ড এর নিকট থেকে পাওয়া যায়। সেদেশের সবচেয়ে বড় কোম্পানি নকিয়া স্মার্টফোন প্রযুক্তির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে ব্যর্থ হচ্ছিল। ফলে সেদেশের অর্থনীতিতেও এর বিরূপ প্রভাব পরে। তবে বেশকিছু ফিনিশ স্টার্টআপ স্মার্টফোন প্ল্যাটফর্ম ভিত্তিক ব্যবসা শুরু করে। ২০১১ সালের মধ্যে প্রাক্তন নোকিয়া কর্মকর্তারা এমন ২২০ টি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছিল। যেমন ফিনল্যান্ডের প্রতিষ্ঠান ‘রভিও’  তার স্মার্টফোন ভিত্তিক ভিডিও গেম ‘অ্যাংরি বার্ড’ ১ কোটি ২০ লক্ষ কপি বিক্রি করে। রভিও’র বেশিরভাগ কর্মকর্তাই পূর্বে নকিয়ায় কাজ করতেন।

এই পরিবর্তন কোন কাকতালীয় ঘটনা নয়। ফিনল্যান্ড শিক্ষা খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। এর ফলে তাদের নিবিড় শ্রম শক্তি তৈরি হয়েছে। তারা কোনো নির্দিষ্ট ব্যবসা বা ইন্ডাস্ট্রিতে সীমাবদ্ধ নয় বা কম্পিটারাইজেশনের ফলে অস্তিত্বের হুমকির মধ্যে পড়বে না এমন স্থানান্তরযোগ্য দক্ষতাসমূহের মধ্যে বিনিয়োগ করেছে। ফিনল্যান্ড এভাবেই প্রযুক্তির এই অভ্যুত্থানের সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার নীলনকশা সারাবিশ্বের সামনে উপস্থাপন করেছে।

 

গবেষণা জানাচ্ছে বিগডেটা প্রভাবিত প্রযুক্তির উৎকর্ষের এ যুগেও শ্রম সামাজিক দক্ষতা এবং সৃজনশীল খাতে তুলনামূলকভাবে উৎকৃষ্ট অবস্থানে থাকবে। তাই রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন কৌশলে এইসব দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য মনোযোগ দিতে হবে যাতে তারা কম্পিউটার প্রযুক্তির সাথে প্রতিযোগিতা না করে সম্পূরক শক্তি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারে।

অননূদিত প্রবন্ধটি পড়তে ক্লিক করুন :www.project-syndicate.org/commentary/carl-b–frey-assesses-how-technological-change-is-transforming-the-structure-of-employment