ওয়াশিংটন, ডিসি- মার্কিন  প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সম্প্রতি তার স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন বক্তৃতায় ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (ইউএস এবং ১১ টি প্যাসিফিক দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক চুক্তি) সম্পন্ন করার কথা পূনর্ব্যক্ত করেছেন। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং চীন ,এশিয়া ও অন্যান্য জায়গায় তাদের নিজেদের চুক্তি থেকে অব্যাহতি নিতে চাচ্ছে। যদি ক্রমবর্ধমান এই চুক্তিগুলো দ্বারা উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হয় তাহলে দেশগুলোকে শুধু বাণিজ্য বাঁধা প্রশমন করলে চলবে না। তাদের একটি আধুনিক অর্থনীতির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোও তৈরি করতে হবে। এবং এর মধ্যে থাকবে মেধাস্বত্ব রক্ষার বিষয়টিও।

কিছু অ্যাকটিভিস্ট এবং সরকারি কর্মকর্তা মেধাস্বত্ব রক্ষণব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক অনুন্নয়নের মধ্যে একটি সম্পর্ক খুঁজে পান। তারা দাবী করেন মেধাস্বত্ব অধিকার উন্নয়নের জন্য একটি বাঁধা, কোন দেশ উচ্চ আয় সম্পন্ন না হওয়া  পর্যন্ত এটি কার্যকর করা উচিত নয়। বিশেষ করে এই দৃষ্টিভঙ্গি ভারতের ক্ষেত্রে দেখা যায়। এ কারণেই ইইউ এর সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি থেমে গেছে। বৈশ্বিক বাণিজ্য সম্মেলন এর দোহা রাউন্ড ব্যর্থ হওয়ার পেছনে এটিই ছিল মূল কারণ। ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রী আনন্দ শর্মা বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অবশ্যই স্বাভাবিক নমনীয়তা (মেধাস্বত্বের বিষয়ে) থাকা দরকার‌।

কিন্তু আসল কথা হলো মেধাস্বত্ব অধিকারের মাধ্যমে রক্ষিত আইডিয়াগুলো উন্নত এবং উন্নয়নশীল উভয় ধরনের দেশের জন্য অর্থনৈতিক উন্নয়নের চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। মেধাস্বত্ব অধিকারকে খর্ব করার পরিবর্তে ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর বোঝা উচিত মেধা স্বত্ব অধিকার শক্তিশালীকরণ বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের একটি পূর্বশর্ত। অর্থনৈতিক অগ্রগতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নাগরিকদের ভোগের সামর্থ্য বাড়াতে বিদেশি বিনিয়োগ তাদের একান্ত প্রয়োজন।

আজকের এই যুগে বড় কোম্পানিগুলোতে মেধাস্বত্ব খুব মূল্যবান জায়গা করে নিয়েছে। ২০০৯ সালের একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, এউএস এর বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রিতে মেধাস্বত্ব- প্যাটেন্ট, কপিরাইট, ডেটাবেজ, ব্র্যান্ড এবং সংগঠনের অভ্যন্তরীণ জ্ঞান ফার্মের মোট বাজারমূল্যের ৪৪ শতাংশ অধিকার করে থাকে। এ ধরনের কোম্পানি কোনভাবেই  তাদের মেধাস্বত্বকে অপচয় বা সম্পূর্ণ চুরির ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে চাইবে না। তারা এমন জায়গায় ব্যবসা করতে চায় যেখানে তাদের মেধাস্বত্ব নিরাপদে থাকবে।

বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে আকর্ষণ করার মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলো অনেক লাভবান হতে পারে। এ ধরণের কোম্পানিগুলো উচ্চ প্রযুক্তি সম্পন্ন সামগ্রি আমদানি করে এবং নতুন ম্যানেজমেন্ট কৌশল নিয়ে আসে যা দেশের শিল্পের আধুনিকায়নে ভূমিকা রাখে এবং দেশীয় ফার্মগুলোর উন্নয়ন ত্বরান্বিত করে। এর ফলে স্থানীয়ভাবে অনেক নতুন কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয় যেগুলো এই সব বহুজাতিক কোম্পানির সাপ্লায়ার হিসেবে থাকে। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, কর্মীদের দক্ষতা বাড়ে, উৎপাদনশীলতা বাড়ে এবং সর্বোপরি সরকারি আয় বৃদ্ধি পায়।

বর্তমানে, বৈশ্বিক গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যয়ের মাত্র ২.৭ শতাংশ ভারতে বিনিয়োগ হয়। চীনে মেধাস্বত্ব অধিকার রক্ষার কঠোর ব্যবস্থা থাকায় সেখানে বিনিয়োগ হয় ১৮ শতাংশ; আমেরিকায় বিনিয়োগ হয় ৩১ শতাংশ। জাতিসংঘের তথ্য বলছে, ২০১০-২০১২ সালে ভারতের ফরেন ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট (এফডিআই) এর পরিমাণ ছিল জিডিপির ১১.৮ শতাংশের সমান – যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর গড় ৩০ শতাংশের চেয়ে অনেক কম।

অর্থনীতিবিদ রবার্ট সাপিরো এবং অপর্ণা মাথুর-এর এক নতুন গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, যদি ভারত চীনের মত মেধাস্বত্ব রক্ষণব্যবস্থা জারি রাখে তবে বার্ষিক এফডিআই ৩৩ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাবে। ফার্মাসিউটিক্যাল খাতে বিশেষ করে মেধাস্বত্ব খর্ব হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। আরও শক্তিশালী মেধাস্বত্ব রক্ষণব্যবস্থা নির্মাণ করা সম্ভব হলে এই খাতে এ বছর এফডিআই ১.৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ৮.৩ ডলারে পৌঁছাত। একই সময়ে এই খাতে গবেষণা এবং উন্নয়ন বিনিয়োগ দ্বিগুণ হয়ে ১.৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাত। বর্ধিত এই এফডিআই ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিতে নতুন ১৮,০০০ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করত।

যদি ভারত তার মেধাস্বত্ব রক্ষণব্যবস্থা এউএস এর মানে (যা চীনের চেয়েও শকিশালী) করতে পারত তাহলে এর লাভ আরও অনেক বেশি হত। ২০২০ সালের মধ্যে এফডিআই প্রবাহ ৮৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেত; শুধু ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পেই এফডিআই আসত ৭৭ বিলিয়ন ডলারের মত, গবেষণা ও উন্নয়ন বিনিয়োগ ৪.২ বিলিয়ন ডলারে উপনীত হত এবং ৪৪,০০০ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হত। ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিতে মেধাস্বত্বের বিষয়টিতে ভারত সরকারে সিদ্ধান্ত এই গবেষণাগুলোকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। গত দু বছরে ভারত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ১৫ টি ঔষধের মেধাস্বত্বকে আক্রমণ করেছে। দেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য জায়গা করে দিতেই ভারত এই কাজ করেছে । তাদের দাবী, একচেটিয়া ব্যবসা (মনোপলি) কোম্পানিগুলোকে বেশি দাম নির্ধারণ করতে উদ্বুদ্ধ করে যা ভোক্তাদের জন্য ক্ষতিকর। সরকার স্থানীয় উৎপাদনকারীদের প্যাটেন্ট করা ঔষধ নকল করার অনুমতি দিয়েছে। কর্মকর্তারা বলছে এতে ঔষধের দাম কমবে এবং আরও বেশি সংখ্যক মানুষ এই ঔষধ কিনতে পারবে।

কিন্তু ভারতে রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের পথে ঔষধের প্যাটেন্ট প্রধান কিংবা বড় কোনো বাঁধা নয়। আইএমএস কনসালটেন্সি নামের একটি প্রতিষ্ঠান দেখিয়েছে প্রধান ইস্যু হলো ডাক্তার, ক্লিনিক এবং হাসপাতালের অভাব, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলগুলোতে। সরকারি ক্লিনিক এবং হাসপাতালগুলো অব্যবহৃত হয়ে পড়ে থাকে ডাক্তারদের উচ্চহারে অনুপস্থিতির কারণে। যদি প্রেসক্রিপশন দেয়ার মত মানুষ না থাকে তাহলে ঔষধের কোন মূল্য থাকে না। এমনকি তা ক্রয়সীমার মধ্যে থাকলেও।

অধিকন্তু, ভারতে বীমা ব্যবস্থারও অভাব রয়েছে বিশেষ করে বহির্বিভাগের রোগীদের জন্য। বীমাহীনতা এবং নিরাপত্তা বেষ্টনীর অভাব স্বাস্থ্যসমস্যাকে একটি বড় অর্থনৈতিক সমস্যায় পরিণত করেছে। এমনকি মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর ক্ষেত্রেও এটি সত্য। এমনিতেই নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার বিষয়টিতে তেমন কোন উন্নতি পরিলক্ষিত হচ্ছে না, অন্যদিকে দূর্বল মেধাস্বত্ব রক্ষণব্যবস্থা ভারতের স্বাস্থ্যসেবা খাতের চ্যালেঞ্জগুলোকে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ভারতীয় নেতাদের স্বীকার করার সময় এসেছে যে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং নাগরিকদের কল্যাণের জন্য মেধাস্বত্ব ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে । বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যিক চুক্তি যারা করছে তাদেরও এই মতামত প্রত্যাখ্যান করার সময় এসেছে যে মেধাস্বত্ব রক্ষা একটি বিলাসিতা যা শুধু ধনী দেশগুলোই রক্ষা করতে পারে। বাস্তবতা হলো যে মেধাস্বত্ব রক্ষা একটি অর্থনৈতিক ইঞ্জিন যা উন্নয়শীল দেশের নাগরিকদের উপেক্ষা করা উচিত নয়।

অননূদিত প্রবন্ধটি পড়তে ক্লিক করুন :www.project-syndicate.org/commentary/rod-hunter-emphasizes-the-importance-of-strong-ip-protections-for-sustained-gdp-growth-and-job-creation